তা বটে। এ যুক্তি নির্ভুল। কালাবদরের বুকে খ্যাপা বাতাস ক্রমশ ঝড়ের রূপ নিচ্ছে। এই ঝড়ের মুখে পাল তুলে দিলে দেখতে দেখতে কোথায় উড়িয়ে নিয়ে যাবে কে জানে? সমুদ্রে না হোক অন্তত তার মোহনার মুখে নিয়ে গিয়েও যদি ফেলে দেয়, তা হলে আর আশা নেই। কালাবদর যদি-বা ক্ষমা করতে রাজি থাকে, কিন্তু ভয়ংকর বিপুল সমুদ্রের ক্ষমা নেই। কালাবদরের চাইতেও ঢের বেশি নিবিড় তার কালো রং, তার জলের মাতামাতি আরও উদ্দাম। কালাবদরে তবু কূল মিলতে পারে, কিন্তু সমুদ্র অকূল, আদি অন্তহীন।
হেইলে উপায়?
খোদা ভরসা।
খোদা ভরসা। তাই বটে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে পুরুষটি চুপ করে গেল। আর জলের ক্ষিপ্ত কলধ্বনির মধ্যেও কফিলদ্দি শুনতে পেল মেয়েটির চাপা কান্নার শব্দ। ওরা ভয় পেয়েছে, অত্যন্ত ভয় পেয়েছে।
জলের সঙ্গে লড়াই করতে করতে হাতের পেশিগুলো যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে কফিলদ্দির। দাঁতের ওপর দাঁত চেপে বসেছে, শরীরের সর্বাঙ্গে বয়ে যাচ্ছে ঘামের স্রোত। এতদিনের পরিচিত অভ্যস্ত নৌকোটাও যেন আজ বাগ মানছে না। কী কুক্ষণেই আজ সে কেরায়া ধরেছিল।
হু-হু হু-হু বাতাসের অশ্রান্ত আর্তনাদ। অন্ধকার জলের ওপরে থেকে থেকে রক্তাক্ত চমকানি। উঃ, বাতাসটা কি আজ আর কিছুতেই থামবে না? চারদিকে প্রেতাত্মাদের গোঙানি চলেছে সমানে। ঢেউয়ের মাথায় মাথায় তেমনি চিকচিক করে ঝিকিয়ে উঠছে কাদের বিষাক্ত কুটিল চোখ, ফেনাগুলো উছলে উছলে পড়ছে চারিদিকে—যেন কাদের পৈশাচিক কঙ্কাল মুষ্টিগুলো ওদের নিষ্পিষ্ট করবার জন্যে বারে বারে খুলছে আর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। অপরিসীম ভয়ে আবার চোখ মুদে ফেলল কফিলদ্দি, শক্ত করে চেপে ধরলে চোখের পাতা দুটো, জলের দিকে আর সে তাকাতে পারছে না।
কফিলদ্দি ভয় পেয়েছে, ওদের চাইতেও বেশি ভয় পেয়েছে। নদীর ভয়? না, তার চাইতেও ভয়ানক, ভয়ানক পিশাচের ভয়, অপদেবতার ভয়। এর চাইতেও অনেক কঠিন দুর্যোগের ভেতরে তার শালতি নির্ভয়ে পথ কেটে এগিয়ে গিয়েছে, মৃত্যুর রাক্ষসরূপ কালাবদর তাকে দেখিয়েছে অনেক বার। কিন্তু পাকা মাঝির বুক তাতে এমন করে আতঙ্কে ভরে যায়নি, এমন করে তার স্নায়ুকে শিথিল নিস্তেজ করে দিতে পারেনি। বরং দুলে উঠেছে রক্ত, কলিজার ভেতর বয়ে গেছে উত্তেজনার উত্তপ্ত জোয়ার। দাঙ্গার সময় বিরুদ্ধ দলের মধ্যে লাঠি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে গেলে শিরায় শিরায় রক্ত যেমন টগবগ করে ফুটতে থাকে, তেমনি একটা কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংকল্পে সতেজ আর সজাগ হয়ে উঠেছে চেতনা। কিন্তু আজ এমন হল কেন? যেন মন হচ্ছে আজ তার নদীর সঙ্গে সংগ্রাম নয়, এ যুদ্ধ কতকগুলো ভয়ংকর অশরীরীর সঙ্গে, কতকগুলো অপঘাতে মরা হিংস্র প্রেতাত্মার সঙ্গে। কেন হল! এমন কেন হল
বইঠা ছেড়ে দাঁড় ধরেছে কফিলদ্দি। তেমনি চোখ বুজে দাঁড় টেনে চলেছে, শরীরের সমস্ত শক্তিকে সঞ্চারিত করে নিয়েছে দুটো বাহুর মধ্যে। টানের সঙ্গে সঙ্গে শরীরটা গলুয়ের ওপর দিয়ে ঝুঁকে পড়ছে নীচের দিকে। বুকের ভেতরে কী যেন চড়চড় করে উঠছে, হৃৎপিন্ডটা হঠাৎ করে ছিঁড়ে যাবে নাকি?
কেন এমন হল? কেন? সেও কি আজ পাগল হয়ে যাবে? তার চোখ দিয়ে অমনি করে ফেটে পড়বে রক্ত? আধ হাত জিভ বার করে দিয়ে সেও হাঁপাবে একটা ক্লান্ত কুকুরের মতো, আর থেকে থেকে আকাশ-ফাটানো এক-একটা অর্থহীন ভয়ংকর আর্তনাদ করে উঠবে?
লা ইল্লাহা, রসুলাল্লা
জিন জেগে উঠেছে, প্রেতমূৰ্তিরা মাথা তুলেছে চারদিকে। এ বাতাসের শব্দ নয়, তাদের আর্তনাদ; এ জলের গর্জন নয়, ফেনায় ফেনায় তাদেরই কঙ্কাল মুঠিগুলো মানুষের গলা টিপবার একটা লোলুপ উল্লাসে প্রসারিত হয়ে উঠেছে।
কালাবদরকে ভূতে পেয়েছে, পালাতে হবে এর কাছ থেকে! এ প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ নয়, অলৌকিক সত্তার সঙ্গে। রহমান-রহিমতুল্লা! দাঁড়ের ঝাঁকিতে ঝাঁকিতে হোঁচট-খাওয়া মাতালের মতো অসংলগ্ন গতিতে চলেছে নৌকা। কফিলদ্দির হৃৎপিন্ডটা কখন বুঝি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।
হু-হু হু-হু বাতাসের বিরাম নেই। উন্মত্ত কালোজলে মুহুর্মুহু ভেসে উঠছে রক্তাক্ত অক্টোপাসটা। নৌকোর যাত্রী দুজন পরস্পরকে জড়িয়ে পড়ে আছে মূৰ্ছিতের মতো, আর অশরীরীদের সঙ্গে লড়াই করে অমানুষিক শক্তিতে দাঁড়ে ঝাঁকি মারছে কফিলদ্দি। আল্লা, আল্লা, নবি।
আকাশের মেঘের পর্দাটা আরও যেন ঘন হয়ে চেপে বসছে। অন্ধকার—দুর্ভেদ্য, আদি অন্তহীন।
সওয়ারি নামিয়ে দিয়ে কফিলদি ময়লা গামছা পেতে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ল। বেশ বেলা হয়েছে, মিষ্টি নরম রোদে ধুয়ে যাচ্ছে পৃথিবী, সোনা মেখে ঝলমলিয়ে উঠেছে কালাবদরের জল! দুর্যোগের চিহ্নমাত্র নেই কোনোখানে।
এমন কিছু অসম্ভব দুর্যোগ নয়, তবু কাল রাত্রে কেন এত ভয় পেল কফিলদ্দি?
আর আশ্চর্য! তখন একটা কথা বিদ্যুৎচমকের মতো মনের মধ্যে সাড়া দিয়ে উঠল। সোজা হয়ে কফিলদ্দি উঠে বসল, সরিয়ে ফেললে পাটাতনের তক্তা একখানা। চোখে পড়ল শানানো মস্ত রামদাখানা সেখানে ঝকমক করছে।
আরও মনে পড়ল মহাজনের দেনায় জ্বালাতন হয়ে কাল সে খেপে গিয়েছিল। কাল সে চেয়েছিল প্রথম ডাকাতি করতে, প্রথম মানুষ খুন করে রক্তের আস্বাদ নিতে। কিন্তু কথাটা সে ভুলে গেল কেন? কাল রাত্রে কালাবদরের জলে যারা তাকে ভয় দেখিয়েছিল তারা কি প্রেতাত্মা? নাকি আল্লার ক্রোধ সহস্র সহস্র তর্জনী তুলে শাসন করেছিল তার পাপকে, তার মনের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ইবলিশকে? বিমূঢ়ের মতো রামদাখানার দিকে তাকিয়ে রইল কফিলদ্দি! কী আশ্চর্য, কথাটাকে এমন করে ভুলে গেল কেমন করে?
