পায়ের থেকে মাথা পর্যন্ত শিউরে উঠল কফিলদ্দির। পাকা মাঝি, কালাবদরের কালো জলের সঙ্গে তার পরিচয় সুদীর্ঘ এবং ঘনিষ্ঠ। আর এই কারণেই নদীকে তার বিশ্বাস নেই। উন্মাদ কালাবদরের কাছে বড়ো বড়ো জাহাজও যা, একমাল্লাই শালতিরও সেই একই অবস্থা।
ঢেউয়ের বেগটা প্রবল হচ্ছে ক্রমশ, বাতাস এখন চোখে-মুখে যেন ঝাপটার মতো ঘা দিতে শুরু করেছে। লাল বিদ্যুতের আকস্মিক উদ্ভাসে সামনে যতদূর চোখ যাচ্ছে শুধু ঢেউয়ের ফেনা উপচে উপচে পড়ছে। ভূতগ্রস্ত মানুষ যেমন বিশৃঙ্খলভাবে মাতামাতি করতে থাকে, গ্যাঁজলা ভাঙে তার মুখ দিয়ে, তেমনি অসংবৃত উচ্ছঙ্খল হয়ে গেছে নদী, তেমনি করে ফেনা গড়াচ্ছে তার লক্ষ লক্ষ মুখে। কালাবদরকে ভূতে পেয়েছে।
হৃৎপিন্ড থেকে একঝলক রক্ত যেন উছলে উঠে কফিলদ্দির মাথার মধ্যে গিয়ে পড়ল। বইঠাতে প্রবলভাবে টান দিলে সে, নৌকোটা আকস্মিকভাবে যেন মস্ত একটা লাফ দিয়ে হাত তিনেক এগিয়ে গেল। নৌকোর ভেতরে ভয়ার্ত যাত্রী দুজন প্রায় হাহাকার করে উঠল।
কী হইল, ও মাঝিভাই, হইল কী?
চুপ করেন কইলাম-না? কফিলদ্দি গর্জে উঠল, অ্যাক্কালে চুপ!
যাত্রীরা চুপ করল। কোনো উপায় নেই, কিছু বলবার নেই। অসহায়, বিব্রত, মাঝির করুণার কাছে একান্তভাবেই আত্মসমর্পিত। কফিলদ্দি ইচ্ছা করলে ওদের খুন করতে পারে, রাত্রির অন্ধকারে পুঁতে দিতে পারে কালাবদরের যেকোনো একটা বালুচরের হোগলাবনের মধ্যে, কেউ টের পাবে না; একটা রক্তের বিন্দু দূরে থাক, এক টুকরো হাড়ও খুঁজে পাবে না কোনোদিন। নইলে একটা পাক দিয়ে চোখের পলকে ডুবিয়ে দিতে পারে নৌকো, মুহূর্তে তলিয়ে দিতে পারে ক্ষিপ্ত কালোজলের ভেতরে। কালাবদরের মাঝি—ওর আর কী, কিছুতেই ডুববে না, একটা খড়ের আঁটির মতো অবলীলাক্রমে ভাসতে ভাসতে ডাঙায় গিয়ে পোঁছোবেই শেষপর্যন্ত।
কিন্তু কফিলদ্দির আত্মবিশ্বাস নেই অতটা। কালাবদরকে সে চেনে, কালাবদরকে সে বিশ্বাস করে না। ঠিক কথা; এ সাধারণ নদী নয়, এ ভূতুড়ে। এর জলের ভেতরে শয়তান লুকিয়ে আছে। এর ঢেউয়ে ঢেউয়ে হাজার হাজার প্রেতাত্মা নেচে বেড়ায়। কত মানুষ যে এই নদীতে ডুবে মরেছে তার কি হিসেব আছে কিছু! এর অদৃশ্য অতলতায় বালির মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে আছে শ্যাওলা-ধরা অসংখ্য কঙ্কাল, অসংখ্য নরমুন্ডের শূন্য খোলের ভেতরে ডিম পাড়ছে গভীরচারী পাঙাস মাছের দল। ডোবা নৌকোর পচা-ভাঙা কাঠের ভেতরে কিলবিল করে বেড়ায় রাক্ষুসে কামটের ছানা। আর… আর আছে প্রেতাত্মা। দুর্যোগের রাত্রে, ঝড়ের রাত্রে তারা উঠে আসে, উদ্দাম জলের দোলায় দোলায় তান্ডব নাচে, অসহায় মানুষ পেলেই হিমশীতল কঙ্কাল বাহু বাড়িয়ে টেনে নেয় তাদের। সদ্য নোনা-কাটা চরের হোগলা আর শণঘাসের বনে ডাকাতের হাতে অপঘাতে যারা প্রাণ দিয়েছে, জলের গর্জনে গর্জনে তাদেরও বিকট অট্টহাসি বেজে ওঠে, তারাও…।
গজরাচ্ছে কালাবদর, মেতে উঠেছে ফেনায় ফেনায়। লোহার চ্যাপটা পাতটার ভেতরে বজ্র ঝলকাচ্ছে, জলের মধ্যে লিকলিক করে উঠছে রক্তাক্ত অক্টোপাস। কফিলদ্দির সারা গা দিয়ে ঘাম ছুটতে লাগল। নৌকো এগোচ্ছে না, প্রতিকূল জল ক্রমাগত বাধা দিচ্ছে। ক্রমাগত প্রেতাত্মাদের কঙ্কাল হাতগুলো যেন তাদের টেনে নিয়ে যাচ্ছে। হু-হু করে বাতাস বয়ে যাচ্ছে, কোথাও যেন যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছে কেউ। মাঝে মাঝে ঢেউয়ের মাথায় কী চিকচিক করছে, যেন সেই তাদের চোখ, সেই যারা…
পাঁচ পির বদর বদর…
হঠাৎ আর্তনাদের মতো শব্দ করে বিকটভাবে চেঁচিয়ে উঠল কফিলদ্দি। তার ভয় করছে, ভয় ধরেছে তার। জলের ভয় নয়, এইসব প্রেতাত্মাদের ভয়। মাঝে মাঝে এইরকম এক একটা আকস্মিক ভয়ে কালাবদরের মাঝিদেরও মন আচ্ছন্ন হয়ে ওঠে। কিন্তু কফিলদ্দি জানে এ খারাপ লক্ষণ; ভারি খারাপ, ভারি খারাপ লক্ষণ। দুর্যোগের রাত্রে যখন মরণ ঘনিয়ে আসে, তখনই এই ধরনের ভয় পায় মাঝিরা। কেউ ডুবে মরে, কেউ পাগল হয়ে যায়, কারো কারো জবাফুলের মতো রাঙা চোখ দুটোর ভেতর দিয়ে যেন রক্ত ফেটে পড়বার উপক্রম করে মুখ দিয়ে এমনি করেই ফেনা গড়াতে থাকে।
লা ইল্লাহা, রসুলাল্লা।
না না, এ ভয় চলবে না কফিলদ্দির। এ ইচ্ছে করে নিজের মৃত্যু ডেকে আনা ছাড়া আর কিছু নয়। মানুষে ভয় পেলেই তার দুর্বল স্নায়ুর ওপরে ইবলিশ তার প্রভাব বিস্তার করে, মানুষের অসতর্কতার সুযোগ নেবার জন্যেই তৈরি হয়ে থাকে জিন-পরি-প্রেতাত্মার দল! চোখ বুজে আবার প্রবল বেগে দাঁড়ে টান দিলে কফিলদ্দি। এ অন্ধকারে চোখ বুজে আর চোখ চেয়ে থাকা একই কথা।
নৌকোর পুরুষ যাত্রীটি আবার স্তব্ধতা ভঙ্গ করলে।
ও মাঝি ভাই, হোনছ নি?
কী কইথে আছেন?
নায়ের পাল উড়াইয়া দ্যাও-না? বায়ে (বাতাসে) লইয়া যাউক।
হ, এতক্ষুণে অ্যাট্টা পন্ডিতের মতো কথা কইছেন। অত্যন্ত তিক্ত শোনাল কফিলদ্দির স্বর।
অপরাধীর গলায় পুরুষটি আবার বললে, ক্যান, অন্যে কইছি নাকি? জোর কাইতান মারতে আছে, নাও ডুবাইয়া দে (ডুবিয়ে দেয়) কি না বোঝতে আছি না। হেয়ার থিয়া (তার চেয়ে) বায়ে যেদিক লইয়া যায়…
যা বোঝেন না, হেয়ার উপার কথা কইয়েন না কত্তা। দ্যাখতে আছেন না গাঙের চেহারাডা? বায়ে যদি সুমুদুরে টানিয়া লইয়া যায়, হ্যাশে (শেষে) কী হরবেন (করবেন)? লোনা সুমুদুরে ডুবিয়া মরণের সাধ হইছে নি?
