কমু আর কী? পাঁচ-ছয় টাহার কাম না কত্তা, দউশগার কোমে কথা নাই।
ওরেঃ, ডাহাইত (ডাকাত)! মাথায় বাড়ি দিতে চাওনি?
অবজ্ঞাভরে খালের জলে থুথু ফেললে কফিলদ্দি, চাউলের মন হইছে কুড়ি টাহা, হেয়া দ্যাহেন না?
লও ভাই, আর অ্যাট্টা (একটা) টাহা ধরো। আর বগড় বগড় দিয়া কাম নাই।
এতক্ষণে যেন চমক ভাঙল কফিলদ্দির। এতক্ষণে সে এদের দিকে তাকাল। মধ্যবয়সি একটি পুরুষ, গায়ে ময়লা একটা ছিটের শার্ট, পায়ে এক জোড়া মলিন জুতো। রোগা চেহারা, গলার হাড়টা থুতনির নীচ দিয়ে অনেকখানি এগিয়ে এসেছে। হাতে একটা ছোটো পুঁটলি। তার পেছনে ঘোমটা-দেওয়া একটি বউ, একখানি ডুরে শাড়ির নীচে তার রোগা রোগা দুখানি পা দেখা যাচ্ছে। মুখোনি ঘোমটায় ঢাকা কিন্তু পায়ের দিকে তাকিয়েই কফিলদ্দি বুঝতে পেরেছে ওই মেয়েটির মুখে পুরুষটির মতোই ক্লান্তির কালো ছাপ আঁকা রয়েছে। মধ্যবিত্তের পরিচিত ক্লান্তি আর অবসন্নতা।
শেষপর্যন্ত রফা হল সাত টাকায়।
আলাইপুরা থেকে জাউলার হাট কোনাকুনি পাড়ি, প্রায় বারো মাইল পথ। মাঝখানে হাসানদির আধজাগা লম্বা চড়াটা ছাড়া আর ডাঙা নেই কোনোখানে। রাত্রির ছায়ায় কালাবদরের কালো জল হয়ে গেল নিকষ কালো, তারপর কখন একফালি মেঘ এসে চিকচিকে তারাগুলোর ওপর দিয়ে ঘন একটা পর্দা টেনে দিয়ে গেল।
তখন ঝিরঝির করে বাতাস বইছিল নদীতে। আস্তে আস্তে বাড়তে লাগল বাতাসের বেগ। কালাবদরের কালো ঢেউয়ের মাতন শুরু হয়ে গেল। অন্ধকার জলের ওপরে উজলে উজলে উঠতে লাগল ফেনার রাশি। একটা ঢেউয়ের মাথা থেকে নৌকোটা প্রবল বেগে আর একটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
বিরক্ত কুটি ফুটে উঠল কফিলদ্দির কপালে। কালাবদরের এমন মাতামাতি কিছু অস্বাভাবিক নয়। তার এক-কাঠের শালতি ঢেউয়ের ওপর দিয়ে ঘোড়ার মতো জোরকদমে ঝাঁপিয়ে ঝাঁপিয়ে চলে যাবে তাও সে জানে। হাজার ঝাপটা লাগলেও তার নৌকোর তলার জোড় খুলবে না। কিন্তু ছুটন্ত তেজিয়ান ঘোড়াকে যেমন রাশ টেনে সামলে সামলে রাখতে হয়, তেমনি তাকেও আজ সারারাত নৌকো সামলাতে হবে। পালের মুখে ছেড়ে দিয়ে গলুইয়ের ওপরে একটুখানি কাত হয়ে নেবার আশা আজ বিড়ম্বনা। নদী আজ সারারাত ভোগাবে বলে বোধ হচ্ছে।
চারদিকে জলের গর্জন উঠছে। আকাশে জোরালো মেঘ নেই, মাঝে মাঝে পাতলা পর্দাটা ছিঁড়ে ছিঁড়ে গিয়ে উঁকি দিচ্ছে তারা। কিন্তু বাতাসের বিরাম নেই, ঢেউ উঠছে সমানভাবে। হাতের পেশিগুলোকে দৃঢ় করে কফিলদ্দি নৌকোটাকে আর একটা বড় ঢেউয়ের ওপর দিয়ে বার করে নিয়ে গেল।
ভেতরে স্বামী-স্ত্রী বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ চমকে উঠল তারা।
ও মাঝি ভাই, মাঝি ভাই? পুরুষটির গলা।
জলের দিকে স্থির চোখ রেখে কফিলদ্দি বললে, কী কন? কন কী?
গাং দেহি কেমন কেমন ঠ্যাকে। কাইতান (কার্তিকী তুফান) ওঠল নাকি?
চিন্তিত স্বরে কফিলদ্দি বললে, মনে তো লয়।
খাইছে! পুরুষটির স্বরে ভয়ার্ত কাতরতা ফুটে বেরুল, নাও কোনহানে (কোন খানে)?
মদ্য গাঙে (মাঝ নদীতে)।
হাসানদির চর?
ঠাহর পাইতে আছি না।
অ্যাহন কর কী? কফিলদ্দি মেয়েটির একটা অস্ফুট আর্তনাদও যেন শুনতে পেল।
ডরাইবেন না, চুপ মারিয়া শুইয়া থাহেন। আমার নাও ডোববে না।
কইবে কেডা? যে রাইকোসা (রাক্ষুসে) গাং, মানুষ খাউনের লইগ্যা জেব্বা (জিহ্বা) বাড়াইয়া রইছে।
নাও ফালাইতে (ডোবাতে) এয়ার আর দোসর নাই।
মেয়েটির আর্তনাদ এবার স্পষ্টই শুনতে পেল কফিলদ্দি। আর সঙ্গে সঙ্গেই কেমন একটা বিশ্রী বিরক্তিতে তার মনটা আচ্ছন্ন হয়ে উঠল। রূঢ় গলায় বললে, ফ্যাগড়া প্যাচাল পাড়েন ক্যান কত্তা? (বাজে বকছেন কেন?) চুপ মারিয়া শুইয়া থাহেন কইলাম। আমার নাও গেলনের আগে নদীরে পিরের শিন্নি খাইয়া আইথে লাগবে। (আমার নৌকো গিলবার আগে নদীকে পিরের শিন্নি খেয়ে আসতে হবে।)
বাচাইলে তুমি বাচাইবা, মরলে তোমার হাতেই মরুম। পুরুষটি মূঢ় অসহায় গলায় জবাব দিলে।
মরণের অ্যাহন হইছে কী? খামাকখা (খামোকা) হাবিজাবি কইয়া মাঠারইনরে ডরাইতে আছেন, চোপাহান (মুখোনা) একটু খ্যামা দিয়া থোয়ন।
চুপ করে গেল পুরুষটি। কফিলদ্দির কণ্ঠস্বরের রূঢ়তাটা তাকে নিরুৎসাহ করে দিয়েছে। বিপদে পড়লে খানিকটা প্রগলভ হয়ে ওঠে মানুষ, কথার ভেতর দিয়ে মনের থেকে নামিয়ে দিতে চায় পুঞ্জিত ভয়ের বোঝাটা। কিন্তু সে-অবস্থা নয় কফিলদ্দির। হাতের পেশিকে লোহার মতো শক্ত করে যখন খ্যাপা ঘোড়ার মতো উচ্ছঙ্খল ঢেউকে একটার পর একটা টপকে যেতে হচ্ছে, যখন চোখের দৃষ্টিকে রাত্রিচর পাখির মতো তীক্ষ্ণ তীব্র করে রাখতে হচ্ছে নিকষ কালো অন্ধকারে ঢাকা চক্রবালের দিকে, এবং যখন জানা আছে কালাবদরের এই মাঝগাঙে দুশো হাত লগিরও থই মিলবে না, তখন উৎসাহের অভাবটা কফিলদ্দির তরফ থেকে একান্ত স্বাভাবিক এবং সঙ্গত।
আকাশে হালকা হালকা মেঘ বটে, কিন্তু এককোণে পেটা লোহার এক টুকরো পাতের মতো খানিকটা ঘন কৃষ্ণতা লেপটে আছে আকাশের গায়ে। ঝড়াং ঝড়াং করে লাল বিদ্যুতের এক-একটা শিখা সেখানে কতগুলো আগ্নেয় বাহু এদিক-ওদিক বাড়িয়ে দিয়েই ফিরে যাচ্ছে আবার। কালাবদরের কালো জলটা অদ্ভুতভাবে কুটিল হয়ে উঠছে সে-আলোয়, যেন জলের তলা থেকে একটা অতিকায় অক্টোপাস তার রক্তাক্ত বহুভুজগুলি নিয়ে মুহূর্তের জন্যে ভেসে উঠেই আবার হারিয়ে যাচ্ছে ভয়ংকর গভীর অতলতায়। আর ওদিকে মাঝে মাঝে শঙ্কিতভাবে তাকাচ্ছে কফিলদ্দি। ওই ইস্পাতের পাতটা যদি ক্রমশ নিজেকে ছড়াতে আরম্ভ করে, যদি একসময় একটা দমকা হাওয়ায় আচ্ছন্ন করে ফেলে সমস্ত আকাশটাকে, তাহলে? তাহলে?
