সেইজন্যে বলেছিলুম প্যালা, ব্যথা থেকেই কবিতার জন্ম হয়। আর কবিতা কী যে মহৎ জিনিস
বলতে বলতেই একটা নিমফল কুড়িয়ে নিয়ে চিবিয়ে ফেলল বল্টুদা, আর থুথু করে ফেলে দিলে সেটাকে। বিচ্ছিরি স্বাদে-গন্ধে তার মুখখানা ঠিক মোচাঘণ্টের মতো হয়ে গেল।
আমি নিমগাছতলা থেকে উঠে পড়লুম। যাওয়ার সময় উপদেশ দিয়ে বলে গেলুম, বসে-বসে আরও নিমের ফল চিবোও গোটাকয়েক, তোমারও মুখ দিয়ে গড়গড়িয়ে কবিতা বেরুতে থাকবে।
কালাবদর
উত্তরে বলে মেঘনা। তারও উত্তরে ব্রহ্মপুত্র, আরও উত্তরে যেখানে হিমালয়ের বুকের ভেতর থেকে ফেনায় ফেনায় গর্জে বেরিয়ে আসছে সেখানকার ইতিহাস কেউ বলতে পারে না।
মেঘের মতো জলের রং বলে নদীর নাম দিয়েছিল মেঘনা। এখানে এসে নাম হল কালাবদর। শুধু মেঘবরণ জল নয়, অদূর সমুদ্রের ঘন নীলিমাও যেন এর ভেতরে এসে সঞ্চারিত হয়ে গেছে। দিনে রাতে দু-বার মাতলা হাতির ঝাঁকের মতো ছুটে আসে জোয়ারের জল, এদেশে বলে শর এল। সে তো আসা নয়, বলতে হয় আবির্ভাব। পাহাড়প্রমাণ উঁচু হয়ে ঝড়ের বেগে এগিয়ে আসে খ্যাপা জলোল্লাস, রাশি রাশি মল্লিকা ফুলের মালার মতো ফেনার ঝালর দুলতে থাকে তার সর্বাঙ্গে, জলকণার একটা ছোটো কুয়াশা ঘুরতে থাকে তার মাথার ওপর; আর দু-দিকের তটের গায়ে প্রবল শব্দে আছড়ে পড়ে তার পাশব-মত্ততা। একখানা ছোটো নৌকোও যদি তখন কূলে বাঁধা থাকে, মুহূর্তে হাজারখানা হয়ে কুটোর মতো মিলিয়ে যায়, কখনো আর তার সন্ধান মেলে না।
কালাবদর। পাঁচ পির বদর বদর করে পাড়ি ধরে মাঝিরা। উৎসুক আকুল চোখে। আকাশটাকে তন্নতন্ন করে খুঁজে দেখে কোথাও লুকিয়ে আছে কি না একফালি সোনামুখী মেঘ। বিশ্বাস নেই এই সর্বনাশা নদীকে। মেঘ দেখলেই কালো ময়ূরের মতো আনন্দে পেখম মেলে দেয়, নাচতে শুরু করে ভৈরবী উল্লাসে। তখন ছোটো নৌকো তো দূরের কথা, জাহাজে পর্যন্ত সামাল সামাল ওঠে।
বিশাল ভয়ংকর নদী কালাবদর। কালকেউটের মতো তার জ্বলের রং। তার গর্জনে কোটি কোটি বিষাক্ত কেউটের ফোঁসফোঁসানি। ঝড় ওঠে, নৌকো ডোবে, মানুষ মরে। শরের ঘা লেগে উঁচু ডাঙাসুদ্ধ নারকেল-সুপারির গাছ ভেঙে পড়ে করাল স্রোতে। কালীদহ ছেড়ে কালীয়নাগ কালাবদরে এসে বাসা বেঁধেছে।
আলাইপুরের খালটা যেখানে মানুষের প্রসারিত একটা মুঠির মতো হঠাৎ চওড়া হয়ে কালাবদরে এসে পড়েছে, ওইখানেই কেরায়া নৌকোগুলোর আড্ডা। পাগলা শরের ভয়ে মাঝিরা পারতপক্ষে নৌকো নদীর ওপরে রাখে না, খালের এই মুখটুকুর ভেতরে ঢুকেই লগি পোঁতে। বিশ্বাস নেই কালাবদরকে। হয়তো একটুখানি বাজার করতে গেছে কিংবা সংগ্রহ করতে গেছে দুটো-একটা মাছ, এমন সময় এল নদীর মাতলামি। ফিরে এসে মাঝি দেখলে নৌকো তো দূরের কথা, তার কাছিটির চিহ্ন অবধি নেই। খাল এদিক থেকে নিরাপদ। জলের ঝাপটা ভেতরে যতটুকু আসে তা নৌকোকে একটুখানি নাগরদোলায় দুলিয়ে যায় মাত্র, তার বেশি আর কিছুই করে না।
খালে আজ বেশি নৌকো ছিল না। কফিলদ্দি মাঝি সবে পেঁয়াজকলি দিয়ে ইলিশ মাছের ঝোলটা চাপিয়ে দিয়েছে, এমন সময় এল সওয়ারি!
ও মাঝি ভাই, কেরায়া যাবা?
যাইবেন কই?
জাউলা!
জাউলা? জাউলার হাট?
হ।
কন কী? হারা (সারা রাত্তির পাড়ি দেওনের কাম।
করুম কী কও? বিয়া আছে, যাইতেই অইবে।
হঃ, বুঝছি।
এতক্ষণ অন্যমনস্কভাবে অভ্যস্ত রীতিতে কথা বলছিল কফিলদ্দি, হুঁকোয় অল্প অল্প টান দিচ্ছিল নিরাসক্তভাবে। এইবার ধীরেসুস্থে মুখ থেকে হুঁকোটা নামালে, কলকের আগুনটা ঝেড়ে দিলে খালের ঘোলাজলে। জলস্রোতের মধ্যে ছ্যাঁক ছ্যাঁক করে পোড়া টিকের টুকরোগুলো পড়তে লাগল, কালো ছাইয়ের একটা সরল রেখা লগিটার চারদিকে পাক খেয়ে তীব্র বেগে নদীর দিকে চলে গেল।
ক্যারায়া দিবেন কত?
বুইজঝা-সুইজঝা লও ভাই, তোমাগো আর কমু কী?
তমো কয়েন? (তবু বলুন?)
পাউচগা টাহা দিমু (পাঁচটা টাকা দেব), এয়ার বেশি না।
হেইলে হাতর দিয়ে যায়েন (তা হলে সাঁতার দিয়া যান), নায়ে নায়ে চড়নের কাম নাই।
এটাও অভ্যস্ত জবাব কিন্তু এ অভ্যাস বেশিদিনের নয়, যুদ্ধ বাঁধবার পর থেকে। আগে মাঝিরাই সওয়ারির তোয়াজ করত, চার আনা ভাড়া বেশি দেওয়ার জন্যে আল্লার দোহাই পাড়ত। দু-হাত জোড় করে বলত, আইচ্ছা আইচ্ছা, বেশি না দ্যান, কুদঘাটের (সরকারি কর সংগ্রহের ঘাট) পয়সা আর এক বেলার জলপান দিবেন।
কোথায় গেল সেসব। আশ্চর্যভাবে ঘুরল পৃথিবীর চাকা, সময়ের চাকা। যুদ্ধ গেল, মন্বন্তর গেল, মরল হাজারে হাজারে মানুষ। কালাবদরের কালো জলে যারা ডুবে মরে, তারপর ভেসে ওঠে প্রকান্ড একটা জয়টাকের মতো, তাদের মতো করে নয়। বরং শুকিয়ে মরল, এত বেশি শুকিয়ে মরল যে ফুলবার মতো শরীরে আর কিছু রইল না, শুকনো হাড়ের থেকে চিমসে চামড়া গলে গলে মিলিয়ে গেল মাটিতে। হাড়ের ওপরে ঠোকা মেরে ঠোঁট ঘুরিয়ে অবজ্ঞায় উড়ে চলে গেল শকুনের পাল। পৃথিবী বদলাল। যারা বাঁচল তাদের এক টাকা কেরায়া উঠল পাঁচ টাকায়, তাদের মেজাজ হল হাজার বিঘে ধানজমির মালিক তালুকদারের মতো। সুতরাং হুকো নামিয়ে নিবিষ্টভাবে আবার ঝোলের কড়াইয়ের দিকে মনোযোগ নিবন্ধ করলে কফিলদ্দি।
লও, আর আষ্ট আনা দিমু, হোনজু (শুনছ)? কথা কও না দেহি?
