জননী গো, কাটিয়ো না ওল,
হাত যদি করে চিড়বিড়
প্রাণ তব হইবে অস্থির
লেগে যাবে ঘোর গণ্ডগোল।
শেষ পর্যন্ত সবাই হাল ছেড়ে দিলে। যদি নিতান্তই কবি হওয়া পোকনের কপালে থাকে, তাহলে খণ্ডাবে কে। তাও আবার সব সময় কবিত্ব ওর মগজে চাগিয়ে উঠত না। দাঁতের ব্যথা শুরু হলেই পোকন আর কান্নাকাটি করে না–তার বদলে কবিতা ছুটতে থাকে ওর মুখ দিয়ে :
আজ যে হইল কবিতার বেগ হবে তাহা দুর্দমনীয়।
দাঁতের ব্যথা যখন নেই, তখন কিন্তু পোকন বেশ আছে। তোর আমার মতো খাচ্ছে-দাচ্ছে, কাঁসি বাজাচ্ছে, পড়া না পেরে ক্লাসে নিল-ডাউন হচ্ছে, ফুটবল খেলতে গিয়ে গোবরে আছাড় খাচ্ছে মানে, একদম স্বাভাবিক। কিন্তু যেই একবার দাঁতে কনকনানি আরম্ভ হল, অমনি হা-রে-রে-রে-রে করে ছুটে বেরুল ওর কবিতা। একেবারে দুর্দমনীয়!
সবাই জিজ্ঞেস করত : দাঁতের ব্যথা হলে তুই কবিতা বানাস কী করে?
পোকন বলত : আমি জানি না কেমন যেন পেটের ভেতর থেকে আপনিই ঝাঁপ দিয়ে বেরিয়ে আসে।
দাঁতের ব্যথা নিয়ে বকবক করতে তোর ভালো লাগে?
–ভালোমন্দ জানি না। কবিতা না আউড়ে আমি থাকতেই পারি না।
এমনি চলছিল, হয়তো পোকন বড় হয়ে দুর্দান্ত কবি হত। দন্তশূল আরও আরও বাড়ত, আর তার ঠেলায় কী বলে ওই যে, নভেল প্রাইজ না উপন্যাস প্রাইজ কী একটা আছে, টপাস করে সেটাও পেয়ে যেতে পারত একদিন। সব হত, যদিনা একদিন ছোটমামা শুক্তিগাছায় আসতেন।
আমার ছোটমামা মানে পোকনেরও ছোটমামা–মানে মাসিমা তো আমারই মায়ের বোন কিনা! ছোটমামা আবার কড়া লোক, তায় দাঁতের ডাক্তার। এদিকে তো ছোটমামাকে আসতে দেখে পোকন বেশ হাসি হাসি মুখে সামনে এসেছে, হয়তো ভেবেছে, নিশ্চয় ভালো খাবার-দাবার আছে তাঁর সঙ্গে। কিন্তু পোকনের সেই হাসি-হাসি দাঁতের দিকে একবার তাকিয়েই ছোটমামা আর্তনাদ করে উঠলেন :হরিবোল-হরিবোল।
আমি বললুম, হরিবোল কেন? বোধ হয় হরিবল? মানে কী ভয়ানক?
বল্টুদা বললে, তা হতে পারে। তবে পোকারা সেসব নীলচে নীলচে কালো কালো নোংরা দাঁত দেখলে শুধু হরি নয়, কালী-দুগ-ছিন্নমস্তা বাবা বৈদ্যনাথ, সকলকে মনে পড়ে যায়। তারপর ছোটমামা কী করলেন, জানিস? বাক্সে সব যন্তর-টন্তর তাঁর ছিলই, পোকনকে সন্দেশ খাওয়ানো দূরে থাক, পরদিনই তাকে একটা টেবিলের ওপর চিত করে ফেলে কটাং কটাং করে তিনটে পোকা-দাঁত উপড়ে দিলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলুম, তারপর?
তারপর আর কী? সর্বনাশ হয়ে গেল পোকনের। দাঁতও গেল, কবিত্বও গেল। দাঁতে আর ব্যথা হয় না, কবিতাও আর গজগজিয়ে বেরিয়ে আসে না। এমনকি মাসিমা যখন সামনে বঁটি ফেলে কচকচ করে চালকুমড়ো, মানকচু কিংবা পালং শাক কাটতে থাকেন, তখনও পোকন চুপ। এতদিন যে ঝিঁঝি-পোকার মতন ঝিঁঝি করত, সে এখন শুয়োপোকার মতো নীরব।
মেসোমশাই যে কী খুশি হলেন প্যালা, সে আর তোকে কী বলব। ছোটমামাকে, মানে নিজের ছোট শালাকে খুব ভালো একটা সুট বানিয়ে দিলেন। আর বাড়িতে তিন দিন ঘটা করে হরির লুট হল। তোকে তো আগেই বলেছি, কবিতার ওপরে হাড়ে হাড়ে চটা ছিলেন মেসোমশাই।
কিন্তু জানিস তো, ভগবান আছেন। আর ভগবানই বা বলব কেন, সেই-যে, যিনি পোকনের ঘাড়ে চড়াও হয়েছিলেন আর ছোটমামার পাল্লায় পড়ে নেমে গেলেন? তিনিও তো ছিলেনই।
তার ফলে এই হল যে, মাসখানেক বাদে একদিন ঘোড়া ছুটিয়ে কোথায় যেতে-যেতে উলটে পড়লেন মেলোমশাই। আর কোথাও কিছু হল না, কিন্তু দারুণ রকমের চোট পেলেন। ডান দিকের হাঁটুতে। কোমরেও খুব লাগল।
হাঁটু ভাঙল-টাঙল না, কোমরের ব্যথাও সারল, কিন্তু কিছুদিন যেতে না-যেতেই বাত দেখা দিল হাঁটুতে আর কোমরে। জানিস তো–বাতের সঙ্গে কোনও চালাকির বাত চলে না–মেসোমশাইয়ের মত দুঁদে লোকও জব্দ হয়ে গেলেন।
বাতের ব্যথা উঠলে আরও দশজন সাধারণ মানুষের মতো তিনি নিয়মমাফিক উঃ-আঃ কুঁই কাঁই করতেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন কী যে হল, ঘর কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি
এ কী হেরি অকস্মাৎ
বিনামেঘে বজ্রপাত,
ঘোড়া হতে চিতপাত
কোমরে গজালো বাত
আমারে করিল কাত
আছি খিচাইয়া দাঁত ব্যস—
শুরু হল মেলোমশাইয়ের কাব্যচর্চা। দাঁত তোলবার পরে পোকন তো ভালো মানুষের মতো অঙ্ক-টঙ্ক কষতে লাগল, কবিতার ধার দিয়েও আর যায় না, কিন্তু জানিস তো বাত একবার হলে আর ছাড়ে না? চানস পেয়ে মেলোমশাই সত্যি-সত্যিই কবি হয়ে গেলেন। মানে পোকনের মতো লাউ-কুমড়ো-কচু নিয়ে মুখে-মুখে পদ্য না বানিয়ে খাতায় কাগজে লিখতে লাগলেন। সেই-যে, কালিদাস মেঘদূতকে বধ করায় বাল্মীকি বাল্মীকি বলে কাঁদতে কাঁদতে নিষাদ যেমন করে পদ্য বানিয়েছিল, তেমনি করে বাতের চোটে কাত হয়ে মেসোমশাই কবিতা লিখে দিতে-দিস্তে কাগজ ভরে ফেললেন।
কবিতা লিখলেই ছাপতে হয়। মেলোমশাইও একটা বই ছেপে ফেললেন, নাম দিলেন এ যে মোর ব্যথার কাকলি। আর বেরুবার সঙ্গে সঙ্গে লোকে কী ভীষণ ভালো বলতে লাগল! ক্রিটিকেরা সবাই বললে, রামচরণবাবু সত্যিকারের কবি। যথার্থ বেদনা বোধ করিলেই এইরূপ মহৎ কাব্য লেখা যায়।
আরে, যথার্থ বেদনা না তো কী। বাতের ব্যথার সঙ্গে চালাকি। যখন ওঠে, তখন টের পাইয়ে দেয় কত ধানে কত চাল হয়।
পোকন তো নভেল-প্রাইজ পেল না, কিন্তু, শোনা যাচ্ছে, শিগগিরই মেলোমশাই দিল্লি-টিল্লি থেকে কী-যেন পুরস্কার পাবেন। তাই আর-একখানা বই ছাপা হচ্ছে তাঁর–তার নাম বাতায়ন। মানে, জানলা-টানলার কারবার নয়, বাতের ব্যথা থেকে লেখা বলেই বাতায়ন।
