–অত ঘাবড়াচ্ছেন কেন?-ডিমটাকে ম্যানেজ করে শিবুমামা বললেন : কেন ভয় পাচ্ছেন এমন করে? আমার মতো নিরীহ একটা ভালো লোককে দেখে গুণ্ডা বলে ভ্রম হচ্ছে আপনার? দুটোর জায়গায় চারটে চোখ নিয়েছেন, তবু মানুষ চিনতে পারেন না?
বলেই ধাঁ শিবুমামা ছোরার নাকের ওপর থেকে চশমাটা তুলে নিলেন।
–আহা করছেন কী? চশমা দিন মশাই।
কী হবে চশমা দিয়ে? যে-চশমা পরে ভদ্রলোককে গুণ্ডা বলে মনে হয়, সে চশমা থাকলেই কী, আর গেলেই কী?–বলেই শিবুমামা জানলা দিয়ে হাত গলিয়ে দিলেন বার করে আনলেন খালি হাত।
ছোকরা আর্তনাদ করে উঠল।
–অ্যাাঁ! করলেন কী? ফেলে দিলেন চশমাটা?
–দিলাম বই কি! চুকিয়ে দিলাম আপদ।
-সোনার ফ্রেমের চশমা মশাই, বাইফোকাল লেন্স। কমসে কম দুশো টাকা দাম। জানলা দিয়ে ফেলে দিলেন–আপনি তো বদ্ধ পাগল!
ছোকরা আবার চেঁচিয়ে উঠল : এইবার আমায় কামড়ে দেবেন দেখছি! আর পাগলে কামড়ালেই জলাতঙ্ক! আমি চেন টানব-নির্ঘাত চেন টানব
বলেই এক লাফে চেন ধরে ঝুলে পড়তে গেল। কিন্তু তার আগেই তাকে ধরে ঝুলে পড়লেন শিবুমামা। একেবারে চিত করে ফেললেন মেজের ওপর।
ছোকরা গ্যাঙাতে গ্যাঙাতে বলল : হেলপ হেলপ–মার্ডার! মার্ডার।
–কিসের মার্ডার? কে কাকে মার্ডার করে?–শিবুমামা ছোকরার ঘাড় ধরে বার্থের ওপর তুলে নিলেন : আমি থাকতে কে মার্ডার করবে আপনাকে?
আমার দুশো টাকা দামের চশমা–
চশমা চশমা করে খেপে গেলেন যে। ওই তো আপনার বুক পকেটে চশমা। রয়েছে বলেই ঝাঁ করে তার পকেট থেকে চশমা বের করে আনলেন শিবুমামা।
অ্যাঁ।
–অ্যাঁ কী মশাই। নিজের পকেটে চশমা রেখে চেন টানতে যাচ্ছিলেন। এক্ষুনি পঞ্চাশ টাকা ফাইন হত, খেয়াল আছে!
–আপনি–আপনি ভেলকি জানেন মশাই।–ছোকড়া বিড়বিড় করে বললে।
–ভেলকি! ভেলকি-টেলকির কোনও ধার ধারি না আমি। একরাশ ডিম খেয়ে আপনার পেট গরম হয়েছে, তাই ও-সব খেয়াল দেখছেন।
খবরদার বলছি, ডিম ডিম করবেন না।–এত দুঃখের মধ্যেও খেঁকিয়ে উঠল লোকটা : জানেন বাবার কানে গেলে কী অবস্থা হবে আমার? স্রেফ কান ধরে রাস্তায় নামিয়ে দেবেন। আমাকে!
ভয় নেই মশাই–আশ্বাস দিয়ে শিবুমামা খ্যাঁক-খ্যাঁক করে হাসলেন : আমি কাউকে বলতে যাচ্ছি না। বলেই বা আমার লাভ কী? আপনাকে ত্যাজ্যপুত্র করে আপনার বাবা তো আর আমাকে সম্পত্তি তুলে দেবেন না। সে-ভরসা থাকলে না হয় দেখা যেত চেষ্টা করে। আমি বলছিলাম, ভবিষ্যতে অমন করে আর রাত জেগে ডিম খাবেন না। মাথা গোলমাল হয় ওসব খেলে।
শিবুমামা উঠে পড়লেন।
–নিন, ঘুমুন এবার।
নিজের সিটে ফিরে এলেন শিবুমামা, একটা সিগারেট ধরিয়ে নিশ্চিন্তে টানতে লাগলেন। ছোকরা কিছুক্ষণ হাঁ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে বসে রইল। অনেকগুলো কথা তার গলার ভেতর গজগজ করে উঠছিল, কিন্তু বলবার মতো সাহসই খুঁজে পেল না সে।
তারপর সত্যিই মাথা গরম হয়ে গেছে মনে করে নিজের ব্রহ্মতালুতে টক-টক করে টোকা দিলে গোটা তিনেক। দুবার পেটে থাবড়া দিয়ে বুঝতে চাইল সত্যি সত্যিই পেট গরম হয়েছে কি না। শেষ পর্যন্ত হাল ছেড়ে দিয়ে আবার চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়ল–পাঁচ মিনিটের মধ্যে নাক ডাকতে শুরু করল তার।
শিবুমামা চুপচাপ বসে সিগারেট টানতে লাগলেন।
ঝটাং ঝট–ঝটাং ঝট
দিল্লি মেল অন্ধকারের মধ্য দিয়ে সমানে ছুটছে। রাত প্রায় দুটো, গভীর ঘুমের মধ্যে তলিয়ে আছে ছোকরা।
-খুন-খুন বাঁচাও
বিকট বিকৃত চিৎকার উঠল একটা। সে-চিৎকারে, ধড়মড় করে লাফিয়ে উঠতে গেল ছোকরা, তারপর চাদরে পা জড়িয়ে হুড়মুড় করে পড়ে গেল মেজের ওপর।
কিন্তু উঠে দাঁড়াতেই যে-দৃশ্য তার চোখে পড়ল, তাতে চোখ ঠিকরে বেরিয়ে এল তার। এর মুহূর্তে সারা শরীর হিম হয়ে গেল, গলা দিয়ে বেরিয়ে এল একটা ভয়ঙ্কর আর্তনাদ।
নিজের বার্থে হাত-পা ছড়িয়ে চিত হয়ে পড়ে আছেন শিবুমামা। একটা ধারালো চকচকে ছোরা তাঁর গলায় বসানো। একরাশ রক্ত জমেছে তাঁর বুকের ওপর। চোখ দুটো বিস্ফারিত–ট্রেনের তালে-তালে শুধু তার ভুড়িটাই দোল খাচ্ছে।
আর একটা আর্তনাদ তুলেই সে পেছন ফিরে চেনের দিকে লাফ মারল। এবার আর তাকে বাধা দিলে না কেউ। চেন ধরে সটান ঝুলে পড়ল সে।
ঘটাং ঘট–ঘ্যাস-ঘ্যাস-ঘ্যাস–দিল্লি মেল থেমে গেল।
বাইরে কোলাহল উঠল। ট্রেন থেকে নেমে পড়ল লোকজন। খানিক পরেই ঘটাং করে খুলে গেল কামরার দরজা। লণ্ঠন হাতে ঢুকলেন গার্ড, তার পেছনে আরও পাঁচ-সাতজন। ছোকরা তখনও চেন ধরে ঝুলছে চোখ বুজেই।
ব্যাপার কী? অমন করে ঝুলছেন কেন চেন ধরে?–হেঁড়ে গলায় জানতে চাইলেন গার্ড।
–খুন হয়েছে তেমনি চোখ বুজে জবাব দিলে ছোকরা।
–খুন? কোথায় খুন? হকচকিয়ে গার্ড উঠে এলেন ভেতরে।-কে খুন হল? লাশ কই?
পাশের বার্থে।
পাশের বার্থে!–গার্ডের বিস্ময় সীমাহীন : পাশের বার্থে তো কেউ নেই মশাই। একটা বিছানা আছে বটে, কিন্তু লাশফাশ তো দেখছি না।
–আছে–আছে, ভালো করে দেখুন।
ভালো করে দেখব? লাশ কি ছারপোকা মশাই যে বিছানার ভেতর ফস করে লুকিয়ে যাবে?–গার্ড বার্থের নীচে উবু হয়ে উঁকিঝুঁকি মারলেন : কিচ্ছু না–কোথাও কিছু নেই। লাশ গেল কোথায়?–গার্ড বিরক্ত হয়ে ছোকরার জামা ধরে টান মারলেন, নেমে পড়ুন না মশাই! খামকা ছিঁড়ছেন কেন কোম্পানির চেন?
