বাইরে মেঘে থমথম আকাশ থেকে ছুটে এল ঝোড়ো বাতাস। এল বোধহয় সওর মাইল স্পিডে।
আর এতক্ষণে বন্ধ জানালাটা সেই হাওয়ার ধাক্কায় বাজের মতো শব্দ করে খুলে গেল।
ওস্তাদের মার
রেলগাড়ির সঙ্গে কুঁড়ির যে এমন আড়াআড়ি সম্পর্ক, এর আগে কোনওদিন সেটা টেরও পাননি শিবুমামা। ঝটাং ঝট–ঝটাং ঝট দিল্লি মেল ছুটছে। সেই সঙ্গে ছুটছেন শিবুমামাও। নামবেন হাথরাসে–সেখান থেকে বেড়াতে যাবেন মথুরায়। কিন্তু দুলুনির চোটে সন্দেহ হচ্ছে সশরীরে নয়, অশরীরী হয়েই তাঁকে মথুরায় পৌঁছুতে হবে।
চিত হয়ে শুলেন–ভুঁড়িটা অ্যাটলান্টিকের মতো দুলতে লাগল। কাত হয়ে শুলেন–পেটের মধ্যে সোডার বোতলের মতো ঝাঁকাতে লাগল। উপুড় হয়ে শুলেন সারা শরীর বলের মতো লাফাতে লাগল।
নাঃ–অসম্ভব!
টাকার শোকে শিবুমামার হৃদয় হাহাকার করতে লাগল। মিথ্যে মিথ্যিই এতগুলো টাকা খরচ করে সেকেন্ড ক্লাসে বার্থ রিজার্ভ করলেন। ঘুমোনোই যদি না গেল তা হলে ঘুষোঘুষি করে জানালা দিয়ে থার্ড ক্লাস কামরায় চাপলেই বা ক্ষতি ছিল কী? বরং সেইটেই ঢের ভালো হত, শিবুমামা ভেবে দেখলেন। ভিড়ের চাপে নড়াচড়া করা তো দুরের কথা, ট্যাঁ-ফোঁ করার জো থাকত না ভুড়ির। বরং একফাঁকে মোটাসোটা কারও কাঁধের উপর মাথাটাকে চড়িয়ে দিয়ে ঘুমিয়েও নিতে পারতেন খানিকটা।
কিন্তু সেকেন্ড ক্লাসের এই সুখশয্যা শরশয্যা বলে মনে হচ্ছে তাঁর।
কামরায় দুটি মাত্র প্রাণী। ও-পাশের বার্থে রোগাপটকা এক ছোকরা অঘোরে ঘুমুচ্ছে। শিবুমামার হিংসে হতে লাগল। এই রাত বারোটায় তিনি যখন ঠায় জেগে, তখন আর একজন এমন করে সুখনিদ্রা দিচ্ছে। তাঁর নাকে যখন শ্যামা পোকা ঢুকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে, তখন আর-একজন নাক ডাকাচ্ছে। এ কী নির্মম নিষ্ঠুরতা! কী হৃদয়হীন স্বার্থপরতা।
এ কিছুতেই বরদাস্ত করা যাবে না।
শিবুমামা আস্তে আস্তে উঠে এলেন।
মশাই শুনছেন?
সাড়া নেই।
শুনতে পাচ্ছেন, অ মশাই?
–উ?–ঘুমন্ত ছোকরার নাকের ডাক বন্ধ হল।
–শুনুন না একবার
–অ্যাঁ–কী হয়েছে?–বলে ছোকরা ধড়মড় করে উঠে বসল : ব্যাপার কী? এত রাতে এমন করে ডাকাডাকি করছেন কেন?
শিবুমামা টাক চুলকে নিলেন একবার।
না ইয়ে, এই জিজ্ঞেস করছিলুম, আপনি ঘুমোচ্ছেন কি না।
খানিকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে শেষে ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে উঠল ছোকরা।
–আচ্ছা লোক তো মশাই! ঘুমুচ্ছি কি না জানবার জন্যে আমাকে ঘুম থেকে জাগালেন!
শুনে শিবুমামা ফ্যাক-ফ্যাক করে হাসলেন।
–আহা তা নইলে বুঝব কেমন করে যে সত্যিই ঘুমোচ্ছন না চালাকি করে মটকা মেরে পড়ে আছেন।
–এই মাঝরাতে দিল্লি মেলে কোন দুঃখে মটকা মেরে পড়ে থাকব মশাই! চালাকিই বা করতে যাব কার সঙ্গে? আপনি ত ভারি ফেরেব্বাজ লোক! যান যান, কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে বিরক্ত করবেন না। ঘুমুতে দিন।
–চটছেন কেন দাদা?–মুখভরা হাসি টেনে শিবুমামা লোকটির বিছানার পাশে বসে পড়লেন, বসে পড়লেন একেবারে গা ঘেঁষেই! বললেন–সত্যিই তো আর ঘুমুচ্ছিলেন না। দিব্যি নিরিবিলিতে শুয়ে-শুয়ে হাঁসের ডিম খাচ্ছিলেন।
কী যা তা বকছেন মশাই! মাথা খারাপ নাকি আপনার? শান্তিপুরের গোঁসাই বংশের ছেলে আমি। হাঁসের ডিম খাওয়া কী বলছেন, হাঁস দেখলে গঙ্গা স্নান করে ফেলি।
–সেই জন্যেই তো দিল্লি মেলে চাদর মুড়ি দিয়ে চুপিচুপি ডিম খাচ্ছিলেন!
লোকটা এবার তেড়ে উঠল–মিথ্যে বদনাম দেবেন না মশাই, জানেন এর জন্যে আপনার নামে মানহানির মামলা করতে পারি আমি?
না, পারেন না–শিবুমামা আবার ফ্যাক-ফ্যাক করে হাসলেন : হাতে-হাতে ধরা পড়ে গেছেন।–বলেই খপ করে লোকটার চাদরের তলায় হাত দিয়ে একটা ডিম বার করে আনলেন : এটা কী?
–অ্যাঁ–ডিম!–লোকটার চোখ ছানাবড়া হয়ে উঠল।
–হ্যাঁ, ডিম।
–অসম্ভব, হতেই পারে না।
হতেই পারে না! তা হলে বালিশে ডিম পাড়ল বলতে চান? হাঁসে ডিম পাড়ে মশাই, মুরগিতেও পাড়ে, ঘোড়ও পাড়ে কখনও কিন্তু বালিশে ডিম পাড়ে–এ তো কখনও শোনা যায়নি! তাও আবার সেদ্ধ ডিম!
–তা হলে আপনিই চালাকি করে বালিশের নীচে ডিম রেখেছেন। লোকটা চেঁচিয়ে উঠল।
–আমি? আমি কেন রাখতে যাব? কী দায় আমার? পরের বিছানায় সেদ্ধ ডিম রাখার চেয়ে নিজের পেটে রাখাই আমি ঢের বেশি বুদ্ধিমানের কাজ মনে করি।
চক্রান্ত! ভীষণ ভয়ঙ্কর চক্রান্ত।–লোকটা প্রায় কেঁদে ফেলল : আমার সর্বনাশ করবার ফন্দি! জানেন, আমি ডিম খেয়েছি শুনলে বাবা দারোয়ান দিয়ে আমাকে বের করে দেবেন? তিন লাখ টাকার সম্পত্তি একেবারে বরবাদ!
শিবুমামা বললেন : আহা-হা, চুক চুক!
-চুক চুক? চুক চুক করেই চুকিয়ে দিলেন আপনি?–এদিকে যে আমার বুক ধুক ধুক করছে মশাই! উঁহু, এ সব আপনার ষড়যন্ত্র। হীন, কুটিল ষড়যন্ত্র। নিশ্চয়ই কোনও গুণ্ডাদলের লোক আপনি! নির্ঘাত লোকটার গলা কাঁপতে লাগল, চিড়বিড় করে উঠে দাঁড়াল সে : আমি–আমি এখুনি চেন টানব
চেন টানবার আগেই তাকে টেনে বসিয়ে দিলেন শিবুমামা।
–আহা-হা, অত খেপছেন কেন? আমার সামনে ডিমটা খেতে যদি আপনার চক্ষুলজ্জা হয়, তা হলে আমিই খেয়ে নিচ্ছি না হয়। সশব্দে ডিমটাকে মুখে পুরলেন শিবুমামা, চোখ বুজে পরম আরামে চিবুতে লাগলেন : হুঁ, ভালোই ডিমটা। পচা নয়।
রাখুন আপনার ভালো ডিম। ছাড়ুন আমাকে আমি চেন টানব।
