টয়েলেটের দরজা খুলে শিবুমামা বেরিয়ে এলেন।
ব্যাপার কী, এত চেঁচামেচি কিসের? আবার গাড়িতে গার্ড সাহেব যে। কী হল?
শিবুমামার গলা শুনে ছোকরা চেন ছেড়ে দিয়ে ধপ করে পড়ে গেল মাটিতে।
–আপনি-আপনি!
–হাঁ আমি। আমি বই কি। অত ঘাবড়ে গেলেন কেন? চেন ধরেই বা ঝুলছেন কী জন্য?
–আপনি, আপনি খুন হননি?–ছোকরার গলা দিয়ে অদ্ভুত আওয়াজ বেরুল একটা।
-আমি খুন হব? কেন, কোন দুঃখে? খুন হওয়ার কী দায় আমার? এখনও খেয়াল দেখছেন বুঝি?–শিবুমামার স্বরে ভর্ৎসনা : বললাম রাত্তিরে অত ডিম খাবেন না–পেট গরম হবে…।
থামুন–গার্ড হেঁড়ে গলায় বাধা দিলেন, এগিয়ে গেলেন ছোকরার দিকে : ইনিই খুন হয়েছিলেন বলছেন আপনি?
মুখ দিয়ে আর কথা বেরল না ছোকরার। শুধু ঘাড় নাড়ল বোকার মতো।
কতটা সিদ্ধি খেয়েছিলেন?
ছোকরা ফ্যাঁচ করে উঠল : সিদ্ধি খাই না আমি।
শিবুমামা মাথা নাড়লেন : ঠিক সিদ্ধি উনি খান না। কয়েকটা ডিম খেয়েছিলেন খালি। তাইতেই পেট গরম হয়ে এই কাণ্ড।
খবরদার, ডিম-ডিম করবেন না।-ছোকরা চেঁচিয়ে উঠল।
গার্ড বললেন : হুম, চুপ করুন এবার। আপনার নাম?
ঘনশ্যাম গোঁসাই।
যাবেন কোথায়?
–এটাওয়া।
একটা নোটবই বের করে টুকে নিলেন গার্ড : নামবার আগে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে যাবেন কোম্পানিকে।
সদলবলে গার্ড বিদায় নিলেন। আবার গাড়ি ছাড়ল।
ঘনশ্যাম ঝিম মেরে বসেছিল। খানিক পরেই মাথা তুলে বললে : বুঝেছি!
শিবুমামা মিটমিট করে হাসছিলেন, বললেন কী বুঝেছেন?
–আপনি ম্যাজিসিয়ান।
খেলা যথেষ্ট দেখানো হয়েছে মনে করে খুশিতে হা হা করে হেসে উঠলেন শিবুমামা : এতক্ষণে বুঝেছেন দেখছি। বড্ড দেরিতে বোঝেন আপনি।
ঘনশ্যাম বুললে : হুঁ!
শিবুমামা বললেন : মিথ্যে ঘুমিয়েই সময় নষ্ট করতেন। তার চাইতে দিব্যি সারারাত ম্যাজিক দেখলেন। ভালো লাগল না?
ঘনশ্যাম বললে : চমৎকার! কিন্তু আপনার ম্যাজিকের টিকিটের হার বড় বেশি। পঞ্চাশ টাকা।
শিবুমামা আবার হা-হা করে হেসে উঠলেন।
ঘনশ্যাম বললে : আপনার ম্যাজিক খুব এনজয় করলাম মশাই। শুধু মনেপ্রাণে নয়, দেহেও বটে। দু-দুবার যা আছাড় খেয়েছি মেঝের ওপর, সাতদিনে গায়ের ব্যথা সারলে হয়। ঘনশ্যাম একবার ঘড়ির দিকে তাকাল : কিছু যদি মনে না করেন আমিও একটু-আধটু ম্যাজিক জানি।
–আপনিও ম্যাজিক জানেন?–এবার শিবুমামার তাজ্জব লাগবার পালা।
–হাঁ, অল্প-স্বল্প।–ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ঘনশ্যাম মনে-মনে কী একটা হিসেব করল : তবে আপনার মতো অত ভালো নয়। এতক্ষণ পরে এই প্রথম হাসল সে: দশ মিনিটের মধ্যে ট্রেনের এই কামরাটাকে আমি ফুলবাগান বানিয়ে দিতে পারি।
ফুলবাগান!-শিবু মামা হাঁ করলেন।
হাঁ, ফুল রাশি রাশি ফুল–গাছভরা ফুল
বলেন কী মশাই। অনেক ম্যাজিক দেখেছি করেছিও অনেক, কিন্তু দশ মিনিটে রেলের কামরাকে ফুলবাগান বানিয়ে দেওয়া যায়, এমন তো কখনও শুনিনি।
–এটা আফ্রিকান ম্যাজিক! সারা ভারতবর্ষে একমাত্র আমিই জানি।
বটে! তবে তো দেখতে হচ্ছে। শিখেও নিতে পারি। আজকাল ম্যাজিক দেখে কেউ পয়সা দেয় না মশাই, তাই বিনা পয়সায় দেখাতে হয় সব জায়গায়। এরকম একটা ম্যাজিক করতে পারলে তো লাল হয়ে যাব–অন্ন মারা যাবে পি সি সরকারের!–শিবুমামা ছটফট করে উঠলেন : কই দেখান ম্যাজিক।
ঘনশ্যাম এগিয়ে এল শিবুমামার দিকে।
–রেডি?
–রেডি।
শিবুমামার চোখের সামনে হাওয়ায় হাত বুলোত লাগল ঘনশ্যাম : চোখ বুজুন। একদম বুজে থাকুন। ঠিক দশ মিনিট পরে যেই বলব চোখ খুলবেন। দেখবেন।–চারিদিকে ফুল–রাশিরাশি ফুল
বাইরে গাড়ির বেগ একটু একটু করে কমে আসছে। একটা স্টেশন এল বোধ হয়।
শিবুমামা চোখ বুজলেন।
–ভালো করে চোখ বুজুন। দশ মিনিটের আগে খুলবেন না। তারপর চারিদিকে দেখবেন ফুল–শুধু ফুল–অজস্র ফুল
গাড়িটা স্টেশনে ইন করল।
ঠিক দশ মিনিট পরেই চোখ খুললেন শিবুমামা। ট্রেন ততক্ষণে আবার চলতে শুরু করেছে।
ফুল দেখলেন শিবুমামা। অজস্র অপর্যাপ্ত ফুল
কামরায় ঘনশ্যাম নেই। তার অ্যাটাচি নেই, সেই সঙ্গে নেই শিবুমামার স্যুটকেশটাও।
নগদে আর জিনিসপত্রে তাতে সাত-আটশো টাকা ছিল কমসে কম।
মোক্ষম ম্যাজিক দেখিয়েছে ঘনশ্যাম–একেবারে ভ্যানিশিং ম্যাজিক! আর শিবু মামা গাড়ি-ভর্তি অজস্র ঝুল দেখতে লাগলেন! সর্ষে ফুল।
কবিতার জন্ম
বল্টুদা আমাকে বললে, শুক্তিগাছার নাম শুনেছিস কখনও?
আমি বললাম, না।
বল্টুদা খুব উদাস মতন হয়ে, আকাশের দিকে চোখ তুলে, কবির মতন বললে, সে এক আশ্চর্য জায়গা। সেখানে পুকুরভরা কোকিল-দোয়েল-পাপিয়া, গাছভরা রুই-কাতলা-চিংড়ি
আমি চমকে বললুম, কী বললে?
-ও-হো, ভুল হয়েছে। মানে, সেখানে গাছভরা কোকিল-দোয়েল
বল্টুদা সেই আধঘণ্টা ধরে কী রকম কবিকবি মুখ করছে, কাক-টাক দেখলেই কেন যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলছে আমার ভারি বিরক্তি ধরে গেল। আমার পিসতুতো ভাই ফুচুদা একবার কবি হয়ে ধোপার খাতায় পদ্য লিখেছিল আর পিসেমশাই তার কান পাকড়ে ধরে ডন-বৈঠক করিয়েছিলেন। সেই দুঃখে ফুচুদা আর কিছুতেই আই-এ পাশ করতে পারল না। আর তারপর থেকে কারও কবি কবি মুখ দেখলেই ভারি বিচ্ছিরি লাগে আমার।
আমি উঠে পড়লুম। বল্টুদা বললে, কোথাও যাচ্ছিস?
–চাটুজ্যেদের রোয়াকে। ওখানে টেনিদা আছে, হাবুল আছে–
টেনিদার নাম শুনেই বল্টুদা চটে গেল। বললে, ওই জুটেছে তোদের এক মুরুব্বি–ওই টেনি! বাজে গল্পের ডিপো, খালি গাঁ-গাঁ করে চ্যাঁচাতে পারে। ওর চ্যালাগিরি না করলে বুঝি পেটের ভাত হজম হয় না? আমার কাছে একটু বসলে আমি কি তোকে কামড়ে দেব?
