মানুষ থাকত অনেক দূরে। এ তো মৃত্যুর রাজত্ব। শুধু বাঘই নয়। সকালে-সন্ধ্যায়-লক্ষ কোটি আরণ্য মশার বিকট গুঞ্জনে বাঘের ডাক চাপা পড়ে যায়। কাচমণির মতো মনোরম আর সুন্দর ঝরনার জল, কিন্তু এক আঁজলা খেলেই হাড়ের মধ্যে ম্যালেরিয়ার কাঁপুনি ধরে। তারপরে ব্ল্যাক-ওয়াটার ফিভার।
কিন্তু অরণ্যের ধ্যান একদিন ভাঙল। এল দুঃসাহসিক অভিযাত্রীর দল। চায়ের বাগান হিসেবে জায়গাটা আদর্শ। এল শাবল-গাঁইতি আর কুড়ল। পাহাড়ের নীচে বিরাট কলোনি বসে গেল। কাঁটাতারের বেড়া, লোহালক্কড়, টিনের শেড, যন্ত্রপাতি, বাংলো, তিরিশ মাইল দূরে রেল স্টেশন পর্যন্ত কালো পিচের পথ। ম্যালেরিয়া, সাপ আর বন্য জন্তুর মুখে বহু প্রাণ বলি দিয়ে শেষপর্যন্ত মানুষের জয় হল। বুভুক্ষু বাঘেরা বন্দুকের ভয়ে আজ আর নীচে নামতে সাহস করে না। ম্যালেরিয়ার মৃত্যু নিয়ন্ত্রিত হয়েছে কুইনিনে আর ইঞ্জেকশনে।
এ প্রায় চল্লিশ বৎসরের ইতিহাস। আজ এখানে সোনাঝুরি চা-বাগান। যুদ্ধের বাজারে এ বাগান এবার শতকরা তিনশো টাকা ডিভিডেণ্ড দিয়েছে। মোহিনী সরকার এ বাগানের প্রবলপ্রতাপান্বিত ম্যানেজার। এ পর্যন্ত ভূমিকা।
কিন্তু মাঝখানে এমন দিনও গেছে যখন দেনায় দেনায় একেবারে ডুবে যেতে বসেছিল বাগানটা। তখন যুদ্ধ দেখা দেয়নি, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, তিন আনা পাইকারি দরে বিক্রি হত চায়ের পাউণ্ড। তারপরে আগুন জ্বলে উঠল ইউরোপে। তারও পরে রেঙ্গুনে বোমা পড়ল। যাদুকরের হাতে ভেলকি লাগল বনমানুষের হাড়ে। সরকারি প্রচারপত্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঝকঝকে নোট ছাপা হওয়া শুরু করল, সোনাঝুরি চা-বাগানে রাতারাতি দেখা দিল সোনার খনি।
সুযোগটা নিলে গুজরাতি ব্যবসায়ী কানহাইয়ালাল। রেঙ্গুনের বিরাট কারবারের মোহ কাটিয়ে তাকে পালিয়ে আসতে হয়েছিল কোহিমার দুর্গম পথ দিয়ে। কিন্তু একেবারে নিঃস্ব হয়ে আসেনি। পেট কাপড়ে বেঁধে যে পরিমাণ কাঁচা সোনা আর ব্যাঙ্কনোট সে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল, তারই একটা বড়োরকম অংশ জুয়া খেলার মতো ছড়িয়ে দিয়ে কানহাইয়ালাল কিনলে সোনাঝুরি বাগানের বারো আনি শেয়ার।
অনুমানে ভুল হয়নি কানহাইয়ালালের। স্পেকুলেশনে শেয়ার মার্কেটে সে কোনোদিন ঠকেনি, আজও ঠকল না। তিন বছরে সোনাঝুরির চা-বাগান বিপুল গৌরবে ঠেলে উঠেছে। সমস্ত দেনা শোধ করে দিয়ে ঘরে এসেছে প্রচুর ডিভিডেণ্ড। তার বারো আনা গেছে কানহাইয়ালালের পকেটে; আর বাকি চার আনা মিলেছে অন্যান্য ছোটোখাটো শেয়ার হোল্ডারের ভাগে।
টাকা—টাকা—টাকা। যুদ্ধের পরে ভারতবর্ষের শিল্পবাণিজ্য নাকি উৎসারিত হয়ে উঠবে সহস্র ধারায়। দেশের কোটিপতিদের বিস্তৃত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা বেরোয় খবরের কাগজে। তাই নিয়ে আন্দোলন আর আলোড়নের অবধি নেই। ভবিষ্যতের ভারতবর্ষ কবে একদা ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা হয়ে উঠবে, তারই সোনালি স্বপ্ন শিল্পনায়কদের চোখে।
খবরের কাগজ পড়ে হাসি পায় মোহিনী সরকারের। তিনশো টাকা ডিভিডেণ্ডের ব্যাপারে সেও নিতান্ত উপবাসী থাকেনি, চুরির বিরাট সমারোহের মাঝখানে তার অংশটাই বরং সিংহভাগ। তবু খবরের কাগজে এই সুবর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলো তারও বিবেককে যেন আঘাত করে। কত ধানে কত চাল, তার চাইতে সেটা বেশি আর কে জানে।
ডিরেক্টরদের আবির্ভাব প্রায়ই ঘটে বাগানে। উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই সাধু। কিন্তু ইনস্পেকশন ফি র আকর্ষণ না থাকলে এসব মহৎ উদ্দেশ্য শুকিয়ে গিয়ে বহুকাল আগেই খটখটে বালি বেরিয়ে যেত।
কত দৃষ্টান্ত চোখের সামনে। বাংলায় দুর্ভিক্ষ-কাপড় নেই, চাল নেই, সব নাকি যুদ্ধের দাবি মেটাবার জন্যে রাতারাতি ফ্রন্টে চালান হয়ে গেছে। তা যাক, কিন্তু বাগানের জন্যে চাল ডাল-কাপড়-জামার কমতি নেই কিছু। ওয়াগন বোঝাই কয়লা যায়, চিনি যায়, কাপড় যায়। কুলিদের অভাব দূর করো, তাদের গায়ে বস্ত্র এতটুকু কমতি না হয় সেদিকে কড়া নজর দাও–এই হচ্ছে ম্যানেজিং ডিরেক্টরের আদেশ।
অতএব বাগানে কোনো অভাব নেই। কাগজপত্রে সমস্ত হিসেব ঠিক আছে। ডিরেক্টরেরা কাগজ দেখেই খুশি, বেশি না ঘাঁটানোই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেন তাঁরা। তবু তাঁদের একজন কী ভেবে বলে বসলেন, চলুন বাগান দেখা যাক। একটা ঢোঁক গিলে মোহিনী বললে, চলুন।
বাগানের ভেতর কালো কালো কুলি মেয়েরা কাজ করছে। অদ্ভুত ক্ষিপ্রগতিতে হাত চলছে তাদের, পিঠের ঝুড়িটা ভরে উঠছে সবুজ সরস চায়ের পাতায়। কিন্তু ওরা সামনে এগিয়ে আসতেই তারা টুপ টুপ করে চা-গাছের আড়ালে বসে পড়ল। যেন কী মন্ত্রবলে এতগুলো মাথা একসঙ্গে অদৃশ্য।
ডিরেক্টর বললেন, ওরা ওভাবে লুকাল কেন বলুন তো? মোহিনী ঠোঁট দুটো চেটে বললে, ওদের পরনে যে কাপড় আছে তাতে শরীরের সবটা ঢাকে না বলেই…
বিস্মিত ডিরেক্টর বললেন, কেন? এত কাপড় এল বাগানে…!
মানে, ইয়ে, বুঝলেন না? যা ডিম্যাণ্ড তার অর্ধেকও…
ডিরেক্টর এক বার তীক্ষ্ণচোখে মোহিনীর দিকে তাকালেন। চোখাচোখি হল ক্ষণিকের জন্যে এবং তারই মধ্যে প্রচুর ভাববিনিময় হয়ে গেল।
তাই কী? হবে।
খানিকটা এগোতেই কুলি বস্তি। খুব খানিকটা হাউমাউ কান্না শোনা গেল সেখান থেকে। মড়াকান্নার একটানা দীর্ঘস্বর।
কেউ মরেছে নাকি?
