হ্যাঁ, একটা কুলি।
কী হয়েছিল জানেন?
মোহিনী নিরুত্তর। উত্তরটা তার সর্বাঙ্গ ঘিরে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অথচ রাশি রাশি চাল এসেছে বাগানে, এসেছে খাদ্য।
ডাক্তার বলেছে ম্যালনিউট্রিশন।
ডিরেক্টর ঠোঁট কামড়ালেন। বললেন, ওর বউটাকে এক বার ডাকতে পারেন?
ডাকলেও আসবে না।
কেন?
আবার দৃষ্টি বিনিময়। অনাহারে মরবে, তবু লজ্জা ছাড়তে পারবে না। স্বামীর মৃতদেহ আঁকড়ে ধরে কান্না জুড়েছে ভাঙা গলায়, কিন্তু নগ্ন দেহে বেরিয়ে আসবে কেমন করে?
ডিরেক্টর খানিক্ষণ গুম হয়ে রইলেন। তারপর ফেরবার পথে বললেন, কাপড়চোপড় কিছুই নেই একেবারে?
না। গুদামে গিয়ে এক বার দেখুন-না স্যার। গাঁট বাঁধবার কতগুলো ছেঁড়া টুকরো ছাড়া…
বেশ, বেশ। ওই টুকরোগুলোই যা পারেন বিলিয়ে দেবেন ওদের। তবু তো হবে কিছুটা। একটা মহৎ কাজ করতে পারায় ডিরেক্টরের মুখ প্রসন্ন হয়ে উঠল। বিবেককে নিরঙ্কুশ করে ফেলেছেন তিনি।
এইতো সত্যিকারের অবস্থা। মৃদু হেসে মোহিনী খবরের কাগজটা নামিয়ে রাখল। শিল্পপতিদের বোম্বাই পরিকল্পনা! দেশটা সত্যি সত্যিই আমেরিকা হয়ে যাবে!
সামনে প্যাকিং বাক্সের একটা হিসাব। দশ হাজার বাক্স এসেছে বাগানে। সত্যিই কি দশ হাজার! কাগজের অঙ্ক বাদ নিলে গোনাগুনতি দাঁড়াবে সাত হাজারে। বাকি তিন হাজার যে কোথায় যায়, কলকাতায় নানা কাজ কারবারে ব্যস্ত ম্যানেজিং ডিরেক্টর কানহাইয়ালালের সেটা জানবার কথা নয়।
রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ করল মোহিনী সরকারের স্ত্রী অমলা। অজ পাড়াগাঁয়ের মেয়ে, কিছুদিন আগেও নাকে নোলক পরত। হালে তার পদোন্নতি হয়েছে। অমলা আজকাল সারাদিন চা খায়, তেলেভাজা জিলিপির চাইতে পাম কেকে তার রুচি বেশি। কোকো ভালোবাসে, তবে কফির কেমন একটা পোড়াগন্ধ তেমন পছন্দ করতে পারে না। পুরু পাউডারের প্রলেপে নাকের ছিদ্রটা প্রায় অদৃশ্য হতে বসেছে।
খট খট শব্দ করতে করতে এল অমলা। একটা উদ্ধত ভঙ্গিকে আবিৰ্তত করে তোলবার চেষ্টা করলে সর্বাঙ্গে।
সারাদিন কী একরাশ রাবিশ নিয়ে বসে আছ। একটু বেড়াতে বেরোবে না? চোখ তুলে মোহিনী এক বার তাকাল অমলার দিকে। বেশ তৈরি হয়ে উঠেছে, আর দু বছরের মধ্যে কোথাও একটু ফাঁক খুঁজে পাওয়া যাবে না। রঙিন কাপড় দিয়ে পুতুল সাজিয়ে ছেলে-মেয়েরা যেমন সৃষ্টির আনন্দ অনুভব করে, অমলা সম্বন্ধে মোহিনীর মনোভাবটাও সেই-জাতীয়।
নাঃ, আজ আর বেরোনো চলবে না। এরোড্রোমের ওরা সন্ধ্যায় চা খেতে আসবে, সব ঠিক করে রাখতে বলো গে।
মাই গড! অমলা বললে, এতক্ষণ বলনি! দ্রুত পদক্ষেপে হিলের জুতো প্রস্থান করলে।
আরও খানিকক্ষণ কাজকর্ম করবার পরে মোহিনী কাগজপত্রগুলোকে রাখল সরিয়ে। বেলা পড়ে আসছে। সোনাঝুরি চা-বাগানের দেবদারু গাছগুলোর মাথা রাঙিয়ে দিয়ে সোনার রং পিছলে পড়ছে সবুজ পাতার সমুদ্রে। সেই রঙের দীপ্তি দেখা যাচ্ছে কালো কালো কুলি মেয়েদের মুখে। চায়ের পাতাগুলো যেখানে পেষা হচ্ছে ওখান থেকে আসছে নিরবচ্ছিন্ন লোহার কলরব। পাহাড় আর অরণ্য দিনান্তের সোনা মেখে রাত্রির জন্য প্রতীক্ষা করছে, অন্ধকার নেমে এলেই জেগে উঠবে ওখানকার হিংস্র জীবন। ঝরনার জলে সোনা, সোনাঝুরি চা-বাগানে সোনা ফলছে।
মাথার ওপরে এরোপ্লেনের পাখার শব্দ। মাইল তিনেক দূরে মাঝারি গোছের একটা এরোডস্লাম বসেছে, পূর্ব সীমান্তে প্রতিরোধ ব্যবস্থা। শাল গাছের উদ্ধত মাথাগুলোর ওপরে যেন পাখার ঝাপটা দিয়ে গেল।
মন দিয়ে মোহিনী অপস্রিয়মাণ যন্ত্র ইগলটাকে লক্ষ করতে লাগল। পাখার গায়ে তিনটে নানা রঙের সমুজ্জ্বল বৃত্ত। উদীয়মান সূর্যকে ডুবিয়ে দেবার জন্যে অভিযান করেছে। চলুক, চলুক, যুদ্ধ চলুক। শুধু বোমারই বুম নয়, ব্যবসায় বুম, চায়ের বাজারে বুম। যুদ্ধ-দেবতার কুঠার মানুষকে হত্যা করে, কিন্তু তার ফলাটা সোনায় তৈরি।
ঝাড়নের একটা শব্দ অত্যন্ত প্রকট হয়ে কানে এল। যতটুকু প্রয়োজন তার চাইতে অনেক বেশি, যেন মোহিনীর মনোযোগটা আকর্ষণ করতে চায়। বারান্দা ঝাঁট দিতে ঝি এসে উপস্থিত হয়েছে। অমলা সংশোধন করে বলে, আয়া।
চোখ-কান তীক্ষ্ণকরে আয়া অনুভব করে নিলে অমলা কোথায় এবং কতদূরে। তারপর মোহিনীর টেবিলের সামনে এসে স্থির হয়ে দাঁড়াল।
আরার চুল থেকে সৌখীন তেলের গন্ধ মুহূর্তে জাগিয়ে দিলে মোহিনীকে। মোহিনী সোজা ওর দিকে তাকাল, চোখের দৃষ্টি উঠল ঘন আর গভীর হয়ে। কে বলে সাঁওতাল মেয়েরা কালো এবং কুশ্রী? প্রসাধনের মায়াস্পর্শে আয়াকে এখন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বলে মনে হয়।
স্বপ্নাবিষ্টের মতো মোহিনী হাসল, কী চাই?
কিছু না। একটা আকস্মিক ঝাপটা দিয়ে সরে গেল মেয়েটা। এ শুধু খেলা—তপস্বীর ধ্যান ভঙ্গ করবার জন্যে একটুখানি লঘু কৌতুক।
নিরাপদ সীমানায় দাঁড়িয়ে আয়া মারাত্মক একটা ভঙ্গি করলে। চমক লাগল মোহিনীর চেতনায়। কিন্তু এখন সময় নয়। বাইরে দিনের আলো, সোনাঝুরি চা-বাগানের ওপর অস্ত যাচ্ছে সোনার সূর্য। যখন-তখন এসে পড়তে পারে অমলা।
আমাকে একটা গাউন কিনে দিতে হবে বাবু।
গাউন?
হুঁ। ওই যে মেম সায়েবেরা পরে।
বটে! মোহিনী বিস্ময় বোধ করলে, মেমসায়েব হওয়ার ইচ্ছে হয়েছে নাকি?
হুঁ। আয়া সশব্দ হাসি হাসল। সঙ্গে সঙ্গে আর একটা তির্ষক দৃষ্টি। এটা অধিকন্তু অনুরোধটা জোরালো হবে এতে।
