হেসে উঠতে গিয়েও চিন্তা হাসে না। তার বদলে জিজ্ঞেস করে, ইদ এলে বুঝি খুব খাওয়া-দাওয়া করবি?
হুঁ, কচুঘণ্ট।
তবে যে গান জুড়েছিস বড়ো?
খাওয়া-দাওয়ার কথা ভাবতেও ভালো লাগে। মনে কর ভালো গোস্ত, পোলাও-বিরিয়ানি, তিন রকমের কাবাব…
ইস-ইস! ঘরে একেবারে নবাবের বাবুর্চিখানা!
মিটমিট করে তাকায় চিন্তা, ভাত খেয়েছিস কবে?
মঙ্গলবার।
এই ক-দিন?
গম-টম।
টম কাকে বলে?
কিচ্ছু জানিসনে না? তুই আমি দুজনেই তো খেতমজুর। টম বুঝতে পারিসনে?
বিলক্ষণ। আজই তো এক বোঝা কলমি শাক তুলেছিল বউ। ক-টা কুচো চিংড়ি ছিল তার ভেতরে আর একমুঠো গুগলি। দিব্যি খাওয়া হয়ে গেল।
দু-দিন পরে আর কলমিও থাকবে না।
তা থাকবে না।
তখন কী খাবি?
এই গোরুটা যা খাচ্ছে এখন। খাবি।
নিজের রসিকতায় হাসতে যায় চিন্তা, কিন্তু আবার তাকে ধমক দেয় মোনা। গোরুটার কথা আর বলবিনে, খবরদার।
আচ্ছা বলব না।
দুজনের চোখ আবার দূরে সরে যায়। বিকেলের রোদ আরও কালচে হয়ে এসেছে। খানিকটা সামনে দু-তিনটে বাবলা গাছ জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে। নীচের গুঁড়িপানার ওপর ঝুরঝুর করে ফুল ঝরছে তাদের, যেন সবুজ চাদরের ওপর হলুদের নকশা কাটছে। আর একটু এগিয়ে জলে-ভরা ধানের খেত। ছায়া নুয়ে পড়েছে তার ওপর, তবু দেখা যায়। সাদা জলের সঙ্গে কী বাহারই দিয়েছে নতুন ধানের! কোথাও ফিকে হলুদের রং-মাখা নতুন শীষের সার, কোথাও আর একটু বড়ো হয়ে চমৎকার শ্যামলা, কোথাও চোখ-জুড়োনো ঘন সবুজ। তাকিয়ে থাকলে আর পলক পড়ে না। জল আর সেই ধানের ওপর এখন শেষ বেলার রাঙা মেঘের একখানা অদ্ভুত আভা পড়েছে, চেয়ে থাকতে থাকতে বুকের ভেতরটা কেমন করে ওঠে।
একটু পরে ধরা গলায় চিন্তা বলে, খুব ভালো ধান হবে এবার।
হুঁ।
গত দু-বছর এমন ফলন হয়নি।
হুঁ।
দেখে প্রাণ ঠাণ্ডা হয়।
ওই প্রাণই ঠাণ্ডা হোক। পেটে পড়বে ক-দানা?
চিন্তার একটা মস্তবড়ো দীর্ঘনিশ্বাস পড়ে।
আচ্ছা, কোথায় ধানগুলো যায় বল দিকিনি?
কিচ্ছু জানিসনে, ন্যাকা একেবারে!
পেছনের পথটা দিয়ে আওয়াজ আর ধুলোর ঘূর্ণি তুলে জিপগাড়ি বেরিয়ে যায় একটা। নেমে আসা হালকা সন্ধ্যায় একটা লাল আলো অনেকটা দূর পর্যন্ত দপ দপ করে। সেই আলোটা থেকে চোখ সরিয়ে এনে ওরা দেখে সামনে সন্ধ্যার তারাটা উঁকি দিয়েছে।
কী ঝপ করে বেলাটা ডুবে গেল!
আর বেলা ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধানের খেতটাও যেন সুদূর হয়ে যায়। রাঙা মেঘটাকে কে যেন হাত বাড়িয়ে মুছে নেয়, তখন মনে হয় ওই ফিকে হলুদ, ওই শ্যামলা, ওই ঘন সবুজ রঙের ধানগুলো সামনের এই জলের ওপারে নয়, একটা প্রকান্ড নদীর ওধারে সরিয়ে দিয়েছে কেউ। গুঁড়িপানার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বাবলা গাছগুলোকে কয়েকটা ভূতুড়ে মূর্তির মতো মনে হয় তখন।
একটা অর্থহীন অকারণ বিদ্বেষে দাঁতে দাঁতে কসকস করে চিন্তা।
ভোটের সময় অনেক জিপগাড়ি এসেছিল এ তল্লাটে।
মোনা বলে, হু এসেছিল। কেন আসবে না? পাকা সড়ক হয়েছে কীজন্যে? গাড়ি আসবে। বলেই তো।
তখন অনেক কথা শুনেছিলুম।
কান আছে, শুনবি বই কী।
চেঁচিয়েছিলুম।
শোর তোলবার জন্যেই আল্লা গলা দিয়েছেন। বোবা হয়ে কী লাভ?
ছায়া কালো হয় চারিদিকে। মোনার ভয় করে এখন। পেটের গম-টমগুলো কখন নিশ্চিহ্ন। একটা যন্ত্রণা পাক দেয় সেখানে। হঠাৎ একটা-কিছু আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে করে তার, এই রাত্রির স্রোতে নিরুপায় হয়ে ভেসে যাবার সময় আলোর মতো, ডালের মতো একটা-কিছু।
কে যেন বলছিল পাঁচ কাঠা করে জমি দেবে আমাদের।
পেয়ে নে।
আবার চুপচাপ। দুজনের ভেতরে যেন সন্ধ্যার একটা আড়াল নামে এখন। নিতান্ত বলবার জন্যেই মোনা বিড়বিড় করে যায়, আমার মেয়েটা বোধ হয় মরেই যাবে, বুঝলি।
আমার বউটাও। বিকৃতভাবে চিন্তা বলে, কিছু ভাবিসনি।
না, ভাবনার কিছু নেই। মোনা নির্ভাবনা হতে চেষ্টা করে। চিন্তার হিংস্রভাবে মনে হয়, দূরের ওই ধানখেতটার ওপর অমন করে সন্ধ্যার আলোটা না পড়লেও পারত। তা না হলে সে বেশ ছিল, এত খারাপ তার লাগত না।
গোরুটার শ্বাসের শব্দ শোনা যায়। এখনও মরতে পারেনি। আবছা অন্ধকারে তার শরীরের রেখাটা অন্যরকম দেখায় এখন। আচমকা ওটাকে মানুষ বলে ভুল হয়ে যেতে পারে।
মোনা আস্তে আস্তে বলে, একটু পরে শেয়াল এসে ছিঁড়ে খাবে ওটাকে।
চিন্তা মাথা তোলে। তার চোখ জ্বলে।
কী করতে চাস?
ইচ্ছে করছে একটা লাঠি হাতে নিয়ে সারা রাত…
সারা রাত শেয়াল তাড়াবি? ক-টা শেয়াল তাড়াবি রে? হা-হা করে খানিটা বেয়াড়া রকম হাসি শুরু করে চিন্তা। আরও ভয় পায় মোনা। বাদাম গাছের ছায়ায় চারদিকটা তাদের অস্বাভাবিক কালো। কালভার্টের জলে খলাৎ করে একটা ব্যাং লাফ দেয়, সেই শব্দটা চিন্তার হাসির সঙ্গে মিশে গিয়ে তাকে চমকে দেয়, খিদের যন্ত্রণাভরা পেটের ভেতরটা কেমন গুরগুর করে ওঠে।
হাসি থামিয়ে মোনার কাঁধে গাঁট-বের-করা শক্ত আঙুলে একটা চাপ দেয় চিন্তা।
আর পাগলামি করতে হবে না, বাড়ি চল এখন।
জোলো-ঘাসে-ছাওয়া ছোটো ডাঙাটার ওপরে লাল-সাদা গোরুটা শ্বাস টানে। মরতে মরতেও মরতে চায় না। হয়তো শেয়ালে এসে ছিঁড়ে খাওয়ার জন্যেই অপেক্ষা করে।
সোনালি বাঘ
আগে ছিল শুধু কালো পাহাড় আর সবুজ জঙ্গল। বাঘের ডাকে নিস্তব্ধ রাত্রির আকাশ গমগম করে উঠত। ঝরনার পাশে হরিণের পায়ের দাগ, ভালুকের থাবা আর এখানে-ওখানে মরকত মণির ছিটের মতো টকটকে তাজা রক্তের বিন্দু। চেরাপুঞ্জির পাহাড়ে যখন ঘন নীল মেঘে বর্ষণ নামত, তখন এখানকার অরণ্যও তৃষ্ণার্ত ঊর্ধ্বমুখে আকাশের দিকে অঞ্জলি বাড়িয়ে দিত। ঝরনার জল ঘোলা হয়ে যেত, পাথরের চাঙড় নামত, বন্যার প্রচন্ড তোড়ে উপড়ে পড়া শালের গাছ আছড়ে পড়ত নীচের উপত্যকায়।
