না খেয়ে মরে না! চিন্তার স্বর ঝাঁ করে ওঠে, ভারি পন্ডিত এলেন উনি। খরা হয়ে মাঠের সব ঘাসপাতা শুকিয়ে গেলে তখন? তোর যদি খোল-জাবনা কেনার পয়সা না থাকে তখন?
এই গোরুটা কিন্তুক বুড়ো হয়ে মরেছে।
বলেছে তোকে।
চিন্তা শব্দ করে একরাশ থুতু ছুড়ে দেয় ব্যাংগুলোর দিকে। খাবার ভেবে দুটো ব্যাং একটু এগিয়ে আসে, তারপর বোধ হয় বিরক্ত হয়েই চিন্তার দিকে তাকিয়ে থমকে যায়।
চিন্তা আবার হেসে ওঠে। মোনা চোখ তোলে।
হাসলি যে?
একটা মজার কথা মনে পড়ে গেল।
কথাটা কী?
গোরুর গলায় দড়ি থাকে, কিন্তু না খেয়ে মরলেও গোরু কখনো গলায় দড়ি দিতে পারে না। হি-হি।
বকিসনি।
কিছুক্ষণ চুপ। বাদাম গাছের পাতায় হাওয়ার শব্দ হয়। একটা ফিঙে লাফাতে লাফাতে গোরুটার পাশে গিয়ে বসে, তারপরেই আবার কোথায় উড়ে চলে যায়। দুটো বোলতা মারামারি-জড়াজড়ি করতে করতে জলের কাছ পর্যন্ত গিয়ে আলাদা হয়ে যায়। একটা পালায়, আর একটা তাকে তাড়া করে। বিকেলের রাঙা আলোয় খুশি হয়ে এদিকে-ওদিকে গোটা কয়েক পোকা কিটকিট কিরকির করে ডাকে।
ঝুনঝুন ঠিঠিন করে আওয়াজ ভেসে আসতে থাকে দূর থেকে। একটুক্ষণের জন্যে গোরুটাকে ভুলে গিয়ে সেদিকে চোখ তোলে দুজন।
তিন জন লোক আসছে আধছোটার ভঙ্গিতে। মালকোঁচা করে পরা ধুতি, কোমরে লাল গামছা বাঁধা, কাঁধে ঘুঙুর-লাগানো ভারে দু-তিনটে করে ছোটো ছোটো তামা-পেতলের ঘটি। সেই আধছোটার ভঙ্গিতে তারা এগিয়ে আসে, চিন্তা আর মোনাকে ছাড়িয়ে চলে যায়— ফিরেও তাকায় না তাদের দিকে। অনেকক্ষণ পর্যন্ত তাদের ভার থেকে ঘুঙুরের আওয়াজ শোনা যায়, চোখে পড়ে তাদের কোমরে বাঁধা লাল গামছা, তাদের পিঠের ছোটো ছটো পুটলি দোল খায়, তামা-পেতলের ছোটো ঘটিগুলো বিকেলের রোদে ঝিকমিক করে।
মোনা বলে, চিনিস? চিন্তা জবাব দেয়, না।
ভিনগাঁয়ের লোক।
সে তো দেখাই যাচ্ছে।
তারকনাথের মাথায় জল ঢালতে চলল, না?
হুঁ।
কী হবে তাতে?
পুণ্যি।
ধ্যাত্তোর পুণ্যি!
মোনা নাক কোঁচকায়, পুণ্যিতে পেট ভরে নাকি? বাবা তারকনাথ চালের কিলো নামিয়ে দিতে পারে বারো আনায়? ছ-টা বিড়ি দিতে পারে পয়সায়?
অ্যাই, অ্যাই।
রাগ করার ভঙ্গিতে চিন্তা শাসায়, হিদুর ধম্মকম্ম নিয়ে কথা বলিসনি।
ঘোড়াড্ডিম ধম্মকম্ম। আমি কাউকে ডরাইনে। পির-নবি-আল্লা সকলকে হক কথা শুনিয়ে দিতে পারি। জমিরুদ্দিন মোল্লা তো জমি বলদ বেচে হাজি হয়ে ফিরে এসেছিল, কী হল শেষটায়? পোকামারা বিষ খেয়ে মরে বাঁচল।
চুপ কর মোনা, ভালো লাগে না।
মোনা একবার ঠোঁট কামড়ায়, ভালো কি আমারই লাগে নাকি? কিন্তুক এইসব দেখলে…
ওরা বিশ্বাস করে যদি সুখ পায় তাতে তোর-আমার ক্ষেতিটা কী বল দিকি?
তা যা বলেছিস। বিশ্বেস করতে পারলে আমরাও বেঁচে যেতুম।
আবার চুপচাপ। মাঠের বাতাসটা যেন থেমে যায় হঠাৎ। রাঙা আলোর বিকেলটাকে আশ্চর্যরকম শান্ত আর নিঝুম মনে হয়। এতক্ষণে ওদের কানে ফোঁসানির মতো একটা আওয়াজ উঠে আসে। গোরুটার শ্বাস উঠছে, ঢেউ খেলে যাচ্ছে পাঁজরাসার শরীরের ওপর দিয়ে। ছাই ছাই চোখের সামনে ওনকির ঝাঁক আরও কালো হয়ে উঠেছে। কয়েকটা ডাঁশ উড়ছে—ওরা শেষ খাওয়া খেয়ে নিতে চায় বোধ হয়।
গোরুটা বেশ সুলক্ষণে ছিল রে। মোনা-ই কথা শুরু করে আবার।
কী করে জানলি?
কপালে কেমন চাঁদ রয়েছে দেখছিস না!
চিন্তা হাসে। বাদামের পাতার মতো শুকনো হাসিটা খস খস করে।
আমি যখন জন্মেছিলুম, তখন আমার ঠাকুরমা কী বলেছিল, জানিস?
কী বলেছিল?
বলেছিল, আমি খুব ভাগ্যিমানী হব। নিজের হাল-গোরু হবে, দশ-বিশ বিঘে জমি হবে।
হয়নি? মোনা মুখ টিপে হাসে।
জ্বালাসনি।
চিন্তা নিজেও একটু হাসতে চেষ্টা করে, আসলে বুড়ি বোধ হয় নাতিকে ঠাট্টা করেছিল একটুখানি। কিন্তু বাবা ছিল ভারি ক্যাবলাটে ভালো মানুষ, সেই কথায় পেত্যয় করে আমার হাতে দু-তিনটে তাবিজ-কবচ বেঁধে দিয়েছিল—হি-হি-হি!
গোরুটার কিন্তু কপালে…
ওটা ভগবানের ঠাট্টা, বুঝলি? কী করে রাস্তার ধারে বেঘোরে মারা যাচ্ছে দ্যাখ। একটু পরে রাত হবে, তখনও হয়তো মহাপ্রাণটা বেরিয়ে যাবে না—আর সেই সময়ে শেয়ালেরা এসে জ্যান্ত ছিঁড়ে খাবে। গোরুটা নিজের গলায় দড়ি দিতে পারলে বেশ হত, না রে?
মোনা জবাব দেয় না। বিকেলের রোদে ছায়া পড়েছে—এতক্ষণ একমুঠো সোনার মতো জ্বলছিল, এখন পুরোনো তামার মতো রং ধরেছে। সেই ছায়া মোনার মনের ভেতরেও একটু একটু করে ছড়াতে থাকে। দিনের আলোটা বেশ ভালো—তবু কোথায় একটা ভরসা থাকে, মনে হয় যাহোক করে চলে যাবে, চালিয়ে যাব। কিন্তু সন্ধে হলেই…
চিন্তা শুরু করে, আমার মামারবাড়ির দেশে আর একটা গলায় দড়ি দেখেছিলুম। ফুটফুটে একটা অল্পবয়সি বউ…
তুই থাম দিকিনি। মোনা এবার সত্যি সত্যিই ধমক দেয় চিন্তাকে, কী আরম্ভ করলি তখন থেকে? একটা ভালো কথাও মনে আসছে না?
আসছে না রে। চোখের সামনে গোরুটাকে মরতে দেখে…
তবে উঠে যা এখান থেকে, উঠে যা তুই। মোনার স্বর কড়া হয়ে ওঠে, এখানে বসে থাকবার জন্যে তোকে দিব্যি দিয়েছে কে?
চিন্তা চুপ করে। মোনা বিকেলের তামাটে রোদের ভেতর অনেক দূরে চোখ মেলে দেয়।
রমজানেরই রোজার শেষে এল খুশির ইদ হঠাৎ গুনগুনিয়ে বেসুরো গলায় গান শুরু করে মোনা।
