সেইটে লক্ষ করে মোনা বলে, জানিস, সায়েবেরা ব্যাং খায়!
হুঁ, তোর কানে কানে বলে গেছে।
মাইরি, বানিয়ে বলছি না। রজ্জবচাচার এক ছেলে কলকাতার হোটেলে চাকরি করে, সে…
বাধা দিয়ে চিন্তা জিজ্ঞেস করে, সেও ব্যাং খায় বুঝি?
তোবা তোবা! মোসলমানের ব্যাটা না?
রেখে দে, বারফট্টাই করিসনি।
চিন্তা ঠোঁট বাঁকায়। আধখানা খেয়ে তার বিড়িটা নিবে গিয়েছিল, সেটাকে সাবধানে কানের ওপর খুঁজতে খুঁজতে বলে, কলকাতায় গেলে হিন্দু-মোসলমান কিছু থাকে না।
তা যা বলেছিস। মোনা আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে।
ঠিক তখন চিন্তার চোখ পড়ে, নীচে বাঁ-দিকে কালভার্টের জলের কোল ঘেঁষে জোলো ঘাসে-ছাওয়া এক টুকরো ছোটো জমির ওপর পা ছড়িয়ে পড়ে আছে লাল-সাদা গোরুটা।
ওটা কী রে?
মোনাও তাকিয়ে দেখে। একটু চুপ করে যায়। থেকে থেকে এক-একটা ঢেউয়ের মতো শ্বাস দুলে যাচ্ছে গোরুটার পাঁজরাসার শরীরের ওপর দিয়ে। এখান থেকেও ছাই ছাই রঙের একটা চোখ দেখা যায়, জলের মতো একটা রেখা নেমেছে তা থেকে, বিনবিন করে ওনকি উড়ছে একরাশ। কালো লম্বা জিভটা বেঁকে বেরিয়ে এসেছে, মুখে ময়লা ফেনা জমেছে, ল্যাজের দিকটা গোবরে একাকার।
মোনা প্রায় চুপি চুপি বলে, মরে যাচ্ছে গোরুটা।
কার গোরু রে?
কে জানে?
এখানে মরতে এল কেন?
কোথায় মরবে, বল? একটা জায়গা তো চাই।
ইস, একেবারে চোখের সামনে।
চোখটা কোথায় সরাবি চিন্তা? মরণ কোথায় নেই?
তা বটে। মাথার ওপর বাদাম গাছটায় একটা কাক ডেকে ওঠে। অদ্ভুত শোনায় তার আওয়াজটা। মোনার শরীরটা শিউরে যায় এক বার।
কীরকম বিচ্ছিরি করে ডাকল রে কাগটা।
ওরা নানারকম করে ডাকতে পারে। ওদের সব ডাকের একটা মানে থাকে।
মোনা ঘাড় বাঁকিয়ে এক বার চেয়ে দেখে চিন্তার দিকে, তুই আবার কাগ-চরিত্তির শিখলি কোত্থেকে?
আমি শিখব কেন? লোকে বলে।
আবার সেইভাবে ডেকে ওঠে কাকটা। ডাল-পাতা নড়বার শব্দ পাওয়া যায়, এক ডাল থেকে আর এক ডালে উড়ে বসল বোধ হয়। একটা শুকনো পাতা হাওয়ায় পাক খেতে খেতে নীচের ঘোলাজলের মধ্যে গিয়ে পড়ে সবচেয়ে বড়ো ব্যাংটার নাকের সামনে। ব্যাংটা নড়ে না, ড্যাবডেবে চোখ মেলে পাতাটার দিকে চেয়ে থাকে কেবল।
মোনা মাথা নাড়ে, হুঁ, নিশ্চয় কিছু বলছে কাগটা।
কী বলছে বল তো?
আমি জানব কী করে? তুই কাগ-চরিত্তির জানিস, তুই-ই বল।
চিন্তার দৃষ্টি গোরুটার ওপর আটকে থাকে। ছাই ছাই রঙের চোখের পাশ দিয়ে একটা জলের রেখার মতো দেখা যাচ্ছে। মরবার আগে গোরুটা কেঁদেছে। কে কাঁদে না?
আবার কর্কশ রব তোলে কাকটা। কেমন আধো আধো আহ্লাদে ভঙ্গিতে বলে, গ-গ-গ। হঠাৎ বিশ্রী রাগ হয়ে যায় চিন্তার। পিছন দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে একটা নুড়ি কুড়িয়ে নিয়ে ছুড়ে দেয় মাথার ওপর।
ভাগ শালা, ভাগ।
ঝটপট করে কাক উড়ে পালায়, দূর থেকে তার আপত্তি শোনা যায়, কা-কা-কা। ঢিলটা আকাশে অনেকখানি ছুটে গিয়ে কালভার্টের জলে ঝপাং করে নেমে আসে। খলাৎ খলাৎ করে ডুব দেয় চমক-খাওয়া ব্যাংগুলো—আবার চার পা ছড়িয়ে ভেসে ওঠে।
বেশ করেছিস। মাথা নেড়ে সায় দেয় মোনা, ভারি জ্বালাচ্ছিল।
চিন্তা আবার আগের মতো সোজা হয়ে বসে। গোরুটার দিকে চেয়ে থাকে একভাবে।
কাগটা কী বলছিল জানিস মোনা?
কী বলছিল?
গোরুটা তো মরছে। এবার গিয়ে ওর চোখ দুটো ঠুকরে খাই। শালা!
গো-মড়কে তো ওদেরই পাব্বন।
আর শেয়ালের।
আর মুচির। এখনও টের পায়নি। পেলেই ছুরি-ছোরা নিয়ে হাজির হবে।
এতক্ষণ পরে চিন্তা হেসে ওঠে। বাদামের পাতার মতো একটা শুকনো খসখসে আওয়াজ ওঠে তার গলায়। ভুরু দুটো একসঙ্গে জুড়ে যায় মোনার।
হাসলি যে?
ভাবছি, মুচি আসবে কোত্থেকে! সেই এক ঘর ছিল না গাঁয়ে? না খেয়েই তো মরল তার সব কটা। শেষে সেই বুড়ো কিষ্টোদাস একদিন গলায় ফাঁস বেঁধে ঝুলে পড়ল চালের আড়া থেকে।
হুঁ, মনে পড়েছে। স্মৃতিটা মোনার অস্বস্তি জাগায়, আমিও দেখতে গিয়েছিলুম। জিভটা আধ হাত ঝুলে গিয়েছিল—ইয়া আল্লা।
একদম ওই গোরুটার মতো।
একদম।
আর নাক-মুখ-কান দিয়ে রক্ত নেমেছিল।
তখনও ওইটুকুই রক্ত ছিল গায়ে। ইচ্ছে করলে বুড়োটা আরও ক-দিন বেঁচে থাকতে পারত।
তা পারত। ঘরেও তখনও খাবার ছিল।
ছিল? মোনা আশ্চর্য হয়, খাবার আবার কোথায় দেখলি তুই?
কেন, একরাশ শুকনো জামের আঁটি পড়ে থাকতে দেখিসনি দাওয়ায়? ওইগুলো সেদ্ধ করে ঘেঁচে নিয়ে—হি-হি-হি।
মোনার বিশ্রী লাগে। বিরক্ত হয়ে বলে, মানুষের মরণ নিয়ে হাসি-মশকরা করিসনে চিন্তা।
ওসব ভালো না।
ভালো না কেন রে? এখন থেকে তৈরি হয়ে নিচ্ছি। দ্যাখ-না আর দু-এক মাস বাদে কী হয়। তোর-আমার বরাতে জামের আঁটিও জুটবে না।
আরও খারাপ লাগে কথাটা, কিন্তু মোনা জবাব খুঁজে পায় না। একটু পরে চিন্তাই আবার বিড়বিড় করে ওঠে।
গোরুটা কিন্তুক না খেয়ে মরেনি। দুজনে আবার গোরুটার দিকে তাকায়। বিকেলের একঝলক লাল আলোয় গোরুটার মৃত্যুকে আরও করুণ, আরও নিষ্ঠুর দেখায়।
না, অসুখ করেছিল।
কী অসুখ করেছিল? আলতোভাবে জানতে চায় চিন্তা।
আমি কী করে জানব? মোনা ব্যাজার হয়, আমি গো-বদ্যি নাকি?
তোর বাপ তো অনেক ঝাড়ফুক জানত।
সে মানষের, গোরুর নয়।
গোরু আর মানুষে ফারাক আছে নাকি? দুই-ই মরে।
কিন্তু গোরু না খেয়ে মরে না।
