আবার বাড়ি ফিরলাম। এবার আর হাওয়ায় উড়ে নয়। চোখ ফেটে আবার কান্না আসছে–পা যে মাটির মধ্যে বসে যাচ্ছে। এইভাবে বিশ্বাসঘাতকতা করল কুঞ্জ! পুরনো শত্রুতার শোধ নিলে এমন করে!
যখন বাড়ি ফিরলাম তখন মাস্টারমশাই এসে বসে আছেন।
–এতক্ষণ কোথায় ছিলে রঞ্জু? শান্ত, গম্ভীর গলায় মাস্টারমশাই জানতে চাইলেন।
মর্নিং-ওয়াক করতে। বিবর্ণ মুখে জবাব দিলাম। পড়ার বই নামিয়ে আনলাম শেলফ থেকে।
কিছুক্ষণ আমার দিকে অদ্ভুত চোখে চেয়ে রইলেন মাস্টারমশাই। তারপর জিজ্ঞাসা করলেন, ইনস্ট্রুমেন্ট বক্স কোথায়?
আমার বুকটা ধক করে উঠল একবার। আস্তে আস্তে বললাম, কাল বিকেলে ভুলে গিয়েছিলাম। আজ কিনে আনব।
ভুলে গিয়েছিলে? মাস্টারমশাইয়ের চোখ আগুন হয়ে উঠল :কুঞ্জর সঙ্গে চায়ের দোকানে আড্ডা দিলে ভুলে যাওয়ারই কথা–কী বলো?
পরক্ষণেই একটি চড় এসে পড়ল আমার গালে। মাস্টারমশাই বজ্রের মতো গর্জে উঠলেন : চায়ের দোকানে ঢুকতে শিখছ। সিগারেট খেতে শিখছ? রাস্কেল বাঁদর
আর-একটা চড় এসে পড়ল গালে। মাথা ঘুরে গেল–একা তীব্র ঝিঁঝির ডাকের মধ্যে যেন মিলিয়ে গেল পৃথিবীখানা।
চমক ভাঙল আমার। কুড়ি বছরের ওপার থেকে ফিরে এসেছি বর্তমানের মধ্যে। গড়ের মাঠে ঠাণ্ডা রাত নেমে এসেছে। কোলের ওপর গহন বনের গল্প একাকার হয়ে গেছে অন্ধকারে।
বইটাকে তেমনি বুকে চেপে ধরে আমি হাঁটতে লাগলাম।
এতদিন পরে ফিরে এসেছে। এ বই এখন আমার। যতবার খুশি পড়তে পারি, ইচ্ছে করলে মুখস্থ করতে পারি–পাড়ার সকলকে ডেকে-ডেকে পড়ে শোনাতে পারি। কিন্তু কিছুই করব না। আমার লাইব্রেরির পাঁচ হাজার বইয়ের ভিতর দিশিবিলিতি অজস্র বইয়ের মাঝখানে ওকে আমি লুকিয়ে রাখব। আমি এ বই পড়ব না। যদি আজ আর ভালো না লাগে! কুড়ি বছর আগেকার মনটা এর মধ্যে যদি বদলে গিয়ে থাকে– তা হলে? তা হলে?
সেই মৃত্যুটা
ছোটো কালভার্টটায় ক-দিন আগেই সাদা রঙের একটা পোঁচড়া লাগিয়েছে পিডব্রুডি। আর সেই সাদা জামাটির ওপর কে যেন পেনসিল দিয়ে খুদে খুদে হরফে কীসব লিখে রেখেছে। শেষ পর্যন্ত যোগ করে লিখেছে, বকেয়া তেইশ টাকা এগারো পয়সা।
দেখে মোনা মিয়ার হঠাৎ খুব মজা লাগে। চিন্তাহরণ ওরফে চিন্তাকে আঙুল দিয়ে একটা খোঁচা মারে সে। আঙুলের নখ বেড়ে গিয়েছিল, চিন্তাহরণের একটা আঁচড়ের মতো লাগে। ভারি বিরক্ত হয় সে।
এঃ, আঁচড়াচ্ছিস কেন বেড়ালের মতো? চামড়া ছড়ে গেল যে।
এতেই চামড়া ছড়ে গেল? এমন ফিনফিনে বাবুয়ানি চামড়া তোর হল কবে থেকে?
মোনা মিয়া আর একটা খোঁচা দেওয়ার উদ্যোগ করতে দু-হাত লাফিয়ে সরে যেতে চায় চিন্তা।
কী আরম্ভ করলি বল তো মোনা? আমি মরছি নিজের জ্বালায়।
আর আমি বুঝি সুখের দরিয়ায় নাও ভাসিয়েছি? মোনারও এবার বিরক্তি লাগে।
তাই বলে হাঁড়িপানা মুখ করে বসে থাকব নাকি রাতদিন? তাকিয়ে দ্যাখ-না এই পুলটার গায়ে।
কী দেখব, দেখবার কী আছে?
হিসেব লিখেছে যে, অনেক ভেবে ভেবে মাথা খাঁটিয়ে হিসেব করেছে। বকেয়া তেইশ টাকা এগারো পয়সা, হি-হি-হি।
চিন্তা ভুরু কুঁচকে তাকায় মোনার দিকে।
লিখেছে বেশ করেছে, তাতে হাসির কী আছে, শুনি?
কীরকম ঝানু লোক দেখছিস, কাগজের খরচ বাঁচিয়েছে। হি-হি।
খামোকা হাসতে তোর ভালোও লাগে?
চিন্তা বিরক্ত হয়ে কালভার্টটায় ওপর বসে পড়ে। তোর পয়সাকড়ি থাকে তুইও হিসেব লেখ-না। বিস্তর জায়গা রয়েছে, বারণ করছে কে?
আরে হিসেব লিখতে পারলে আর এ দশা হয় নাকি? মগজে আঁক-ফাঁক কিছু ঢুকল না বলেই তো মৌলবি রেগেমেগে মাদ্রাসা থেকে বের করে দিলে। ধীরে-সুস্থে চিন্তার পাশে বসতে বসতে মোনা বলে, অবিশ্যি তিন মাসের মাইনেও বাকি পড়েছিল।
হুঁ, সেইটেই বল। চিন্তে গম্ভীর হয়।
বুঝলি, কিচ্ছু ক্ষেতি হয়নি। মৌলবিসাহেবও টের পেয়েছিল—কোনোদিন আমার পয়সাও জুটবে না, হিসেবও লিখতে হবে না। খুব এলেম ছিল লোকটার।
আমি খুব ভালো আঁক জানতুম। চিন্তা তেমনি গম্ভীর হয়ে বলে।
বেশি গুল দিসনি আমার কাছে। মোনা ফাঁস করে ওঠে, আমি কিছু জানিনে না? ভালো আঁকই যদি কষবি তাহলে পাঠশালার সেই শুটকে পন্ডিত তোর দু-হাতে ইট দিয়ে তোকে রোদুরের মধ্যে দাঁড় করিয়ে রাখত কেন রে? আমি দেখিনি?
যেতে দে ওসব। চিন্তা অস্বস্তি বোধ করে, বিড়িটিড়ি আছে নাকি সঙ্গে? দে তাহলে।
দাঁড়া দেখি। হাফ শার্টের পকেট হাতড়ায় মোনা, আছে দু-তিনটে। এই একটা দিলুম, কিন্তু আর চাসনে তা বলে দিচ্ছি।
না, চাইব না। কিন্তু মাইরি, ব্যাপারটা কী বল দিকি? বিড়ির দাম যে সিগ্রেটকে ছাড়িয়ে উঠল।
মোনা একটা মুখভঙ্গি করে, শালার মুড়ির কেজিই চার টাকা উঠল তো বিড়ি।
দুজনে বিড়ি ধরায়। পাশাপাশি চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। মাথার ওপরে একটা কাঠবাদাম গাছের পাতা হাওয়ায় কাঁপে, অথচ খচখচ করে শব্দ ওঠে। একটি নতুন বউ যেন কাপড়ের আওয়াজ তুলে চুপিসাড়ে পালিয়ে যাচ্ছে এমনই মনে হয়। কালভার্টের নীচে একরাশ ঘোলাজল থমকে আছে, কয়েকটা সোনা ব্যাং ড্যাবা-ড্যাবা চোখ তুলে চার-পা ফেলে ভাসছে তার ভেতরে। হাতের বিড়িটায় গোটা কয়েক টান দিয়ে মোনা একটা ব্যাংকে লক্ষ করে ছুড়ে দেয় সেটা। ব্যাংটা খলাৎ শব্দে ডুবে যায়, তারপর আবার হাত তিনেক দূরে চার-পা ছড়িয়ে ভেসে ওঠে।
