খুশির হাসিতে কুঞ্জর চোখ ভরে উঠল। আমার পিঠে জোরে একটা থাবড়া বসিয়ে দিলে সে।
বাঃ, এই তো সত্যিকারের গুড বয়ের মতো কথা!–আমার হাত ধরে টেনে সে একটা লোহার চেয়ারে বসল। তারপর ডেকে বললে, বয়, দুখানা চপ আর দুটো চা।
সভয়ে বললাম, দোকানের চা তো আমি খাই না ভাই! চপও নয়।
–খাস না? তা বেশ। তাহলে দুটো চপই আমি খাই–কী বলিস? অদ্ভুত লোভে কুঞ্জর চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল : কী বলিস-অ্যাঁ?
ইনস্ট্রুমেন্ট বক্সের পরিণামের কথা ভাবতে ভাবতে শুকনো গলায় আমি বললাম, খা।
প্লেটে করে দুখানা ধূমায়িত চপ এনে বয় সামনে রাখল। গন্ধে ভরে গেল চারিদিক।
কুঞ্জ খাবার আগেই খানিকটা লালা গিলে নিলে গলায়। থাবা দিয়ে একটা চপ গরম অবস্থাতেই তুলে নিয়ে কামড় বসাল। তারপর তৃপ্ত মুখে বললে, বেঁচে থাক রঞ্জু! গহন বনের গল্প তোর মারে কে? কিন্তু মাইরি বলছি, দৃষ্টি দিসনি মোদ্দা।
দৃষ্টি নয়-মুখ ফিরিয়ে বসে আমি ভাবতে লাগলাম ইনস্ট্রুমেন্ট বক্সের কথা। নিজের জমানো দু-আনা পয়সা দিয়ে বাকিটা পূরণ করা যাবে, তারপর ইস্কুলে যাওয়ার মুখে কিনে নিলেই হবে ওটা। কিন্তু বাড়ির কেউ যদি দেখতে পায়? যদি শুনতে পায় কেউ?
এখান থেকে তাড়াতাড়ি উঠতে পারলে বাঁচি এখন। কিন্তু উঠবার জো নেই–তারিয়ে-তারিয়ে শব্দ করে করে চপ খাচ্ছে কুঞ্জ। ওই শব্দটা যেন বুকের মধ্যে এসে বিঁধতে লাগল। ভয়ে কাঠ হয়ে আমি বসে রইলাম।
কতক্ষণ পরে কত যুগ পরে কুঞ্জর চা আর চপ খাওয়া শেষ হল জানি না। তারপর বললে, পাঁচ আনা পয়সা দে।
দিলাম।
বয়টাকে পয়সা দিয়ে কুঞ্জ একটা ঢেকুর তুলল।
–বেড়ে খাওয়ালি রঞ্জু। অনেকদিন মনে থাকবে। এবার একটা সিগারেট খাওয়া।–
সিগারেট!–আমার মাথার চুল খাড়া হয়ে উঠল!
–হ্যাঁ হ্যাঁ বাবা, সিগারেট। আরও দুটো পয়সা ছাড়ো দেখি!
আবার পালাতে চাইলাম, কিন্তু পা দুটো যে পাথর দিয়ে বাঁধা। মন্ত্রমুগ্ধের মতোই দুটো পয়সা বের করে দিলাম। বয়টাকে দিয়ে কুঞ্জ সিগারেট আনাল। ধরিয়ে একটা টান দিয়ে বললে, আঃ!
ততক্ষণে আমার বুকের রক্ত জল হয়ে গেছে! প্রাণপণে উঠে দাঁড়ালাম।
সব তো হল ভাই। এবার বই?
কুঞ্জ খানিকটা ধোঁয়া ছেড়ে বললে, নিস কাল সকালে।
কাল সকালে আবার কেন?–আমি প্রায় হাহাকার করে উঠলাম : বললি যে রাত্তিরেই!
কুঞ্জ বাধা দিয়ে বললে, এখন কে বাড়ি ফিরবে? আমার যেতে সেই ন-টা। সিনেমায় যাব কিনা? যা—যা–কাল সকালে আসিস আমাদের বাড়ি। বই নিয়ে যাবি, ইচ্ছে মতো রাখতে পারবি দু-তিন দিন।
–কিন্তু সকালে যে মাস্টারমশাই আসবেন!
–তার আমি কী করব? কুঞ্জ উঠে দাঁড়াল লম্বা একটা শিস টেনে বেরিয়ে এল চায়ের দোকান থেকে। পেছনে-পেছনে আমিও এলাম
–চল না ভাই একবার, পাঁচ মিনিটের জন্য! আমি মিনতি করলাম।
–কেন বিরক্ত করছিস? কুঞ্জ চলে গেল : বললাম না, সকালে আসিস? তারপরই সংক্ষেপে সব শেষ করে দিয়ে অন্য রাস্তায় পা চালিয়ে দিলে।
অস্বস্তি আর অপরাধ-বোধ নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। অতটা না করলেও হত। একখানা বইয়ের জন্যে যে কাণ্ড করেছি, একবার তা জানাজানি হয়ে গেলে কী যে হবে, সে কথা ভাবতেও পারছি না।
তবু অপরাধের লজ্জা বেশিক্ষণ রইল না। চোখের সামনে জ্বলজ্বল করতে লাগল মোটা-মোটা সবুজ অক্ষরগুলো : গহন বনের গল্প। সারা রাত ধরে আফ্রিকার জঙ্গলের স্বপ্ন দেখলাম আমি। বইয়ের পাতায় চকিতের জন্য দেখা ছবিগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠে আমার সমস্ত চেতনাকে আশ্চর্য অপরূপ অ্যাডভেঞ্চার দিয়ে ঘিরে রাখল!
ভোরের আলো ফোটবার আগেই ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠলাম। তারপর জামাটা গায়ে চড়িয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটলাম কালীতলার উদ্দেশে।
মা অবাক হয়ে বললেন, হ্যাঁরে, এত ভোরে কোথায় চললি এভাবে?
মায়ের কাছে কখনও মিথ্যা বলিনি। আজ প্রথম বলতে হল। একটু মর্নিং-ওয়াক করে আসি মা।
উত্তরে মা কী বললেন–সে কথা শোনবার সময় আমার ছিল না। আমি তখন দার্জিলিং মেলের মতো চলেছি কালীতলার দিকে। আমাদের বাড়ি থেকে কুঞ্জদের পাড়া প্রায় এক মাইল। মনে হচ্ছিল, যদি এক লাফে পৌঁছুতে পারতাম!
এখনি পাব! এখনি হাতে আসবে! কালকের সারা বিকেল, সারা সন্ধে, সারা রাত্রি যা নিয়ে স্বপ্নের ঘোরে কেটেছে–যার জন্যে চায়ের দোকানে ঢুকেছি, কুঞ্জকে সিগারেট খাইয়েছি মিথ্যা কথা বলেছি মায়ের কাছে–এখনই সেই মহাসম্পদ এসে যাবে আমার হাতের মুঠোয়। মনে হল, আমার পা চলছে না, হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছি আমি!
ওদের বাড়ির সামনে গিয়ে হাঁপাতে-হাঁপাতে চেঁচাতে লাগলাম : কুঞ্জ কুঞ্জ কুঞ্জ
ঘুম-ভাঙা চোখ কচলাতে কচলাতে বেরিয়ে এল কুঞ্জ। বিরক্তিভরা মুখে বললে, কি রে, কী হল? এই সাত-সকালে অমন চেঁচিয়ে মরছিস কেন?
–সেই বইটা?
–কোন বই কুঞ্জ যেন আকাশ থেকে পড়ল।
–সেই গহন বনের গল্প।
কুঞ্জ বললে, অ। তা, সে বই তো পাবি না!
–পাব না!–আমি যেন বুকফাটা আর্তনাদ করে উঠলাম।
কুঞ্জ নিরাসক্ত স্বরে বললে, বই তো আমার নয়–আমার মামাতো বোন রত্নার। রত্না কাল রাতের ট্রেনে কলকাতায় ফিরে চলে গেছে, বইটাও নিয়ে গেছে।
আর এক মিনিট সামনে থাকলে আমি কুঞ্জর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তাম, আফ্রিকার সিংহের মতোই ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করে ফেলতাম ওকে। তার আগেই ও বাড়ির ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেছে।
