কিন্তু না দেখলেই ভালো হত। মোটা, বড় সাইজের বই–পাতায় পাতায় বুনো জানোয়ারের রোমাঞ্চকর ছবি। ছোট বড় অসংখ্য গল্প–কোনওটা মানুষখেকো সিংহ, কোনওটা গরিলার বিভীষিকা, কোনওটা কুমিরের করাল গ্রাস। পড়বার আগেই গা ছমছম করে ওঠে।
চমক ভাঙল খগেনের চিৎকারে।
বাঃ-দেখবার নাম করে বেশ পড়া শুরু হয়ে গেছে তো। ওসব চালাকি চলবে না, দাও বই। ছোঁ মেরে বইটা কেড়ে নিলে খগেন। বই তো নিলে না–যেন হৃৎপিণ্ড উপড়ে নিলে! তারপরই আর কথা নেই হনহন করে হাঁটতে শুরু করলে বাড়ির দিকে।
আমি তবু সঙ্গ ছাড়ি না খগেনের।
-একদিনের জন্যে দিবি ভাই বইটা? একবেলার জন্যে?
বললাম তো, আমার বই নয়। আমাকে এড়াবার জন্যে খগেন আরও জোরে পা চালালে : অপরের কাছ থেকে এনেছি। সন্ধেবেলায় ফেরত দিতে হবে।
কার বই?
কালীতলার কুঞ্জর। হল তো? ইচ্ছে হয় তার কাছে থেকে চেয়ে নাও। বইটা পাছে আমি কেড়ে নিই, হয়তো এই ভয়েই খগেন একটা চলতি ঘোড়ার গাড়ির পিছনে উঠে বসল।
হতাশ চোখে আমি সেদিকে তাকিয়ে রইলাম।
কিন্তু কালীতলার কুঞ্জ! মনটা ভয়ানক দমে গেল। কুঞ্জকে চিনি–বিলক্ষণ চিনি। গত দোলের সময়ও ওদের পাড়ার সঙ্গে আমাদের পাড়ার ছেলেদের বেশ একচোট মারামারি হয়ে গেছে-আমি নিজেই কয়েক ঘা বসিয়েছিলাম কুঞ্জকে। তা ছাড়া আমাদের সমবয়সী হলেও কুঞ্জ যে-পরিমাণে এঁচোড়ে পেকেছে তার তুলনা হয় না। ক্লাস ফাইভেই একবার ফেল করেছে-শুনেছি, সিগারেট খায়। সেই কুঞ্জর কাছে গিয়ে বই চাইতে হবে!
সম্ভব হলে নিজেই কিনতে পারতাম একখানা। কিন্তু বইয়ের দামটা দেখে নিয়েছি চোখের পলকে তিন টাকা! তিন টাকা। স্বপ্নের চেয়েও অসম্ভব! ইস্কুলের পয়সা বাঁচিয়ে আনা-ছয়েক সঞ্চয় করেছি নিজের কাছে। মার কাছে জমা আছে আট আনা। আরও আনা-আষ্টেক ছোড়দি দিলেও দিতে পারে– বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি থেকে ফিরে এসেছে–মনটা খুশি আছে ছোড়দির। কিন্তু তিন টাকা। সে অনেক দূর, সেখানে পৌঁছুবার কোনও উপায় নেই।
একটা ভারি মন নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।
মা বললেন, মুখ অমন কেন রে? মার খেয়েছিস নাকি ইস্কুলে?
-না।
হাতমুখ ধুয়ে জলখাবারের দুধ-রুটি খেয়েই আবার বেরিয়ে পড়লাম ঊর্ধ্বশ্বাসে। পাড়ার মাঠে ফুটবল খেলা হচ্ছে–ওরা ডাকল, আমি ফিরেও তাকালাম না। যেমন করে হোক, কুঞ্জকে আমার ধরা চাই-ই।
কুঞ্জকে পেতে অবশ্য দেরি হল না। স্টেশনের কাছে বাহাদুর বাজারের এক চায়ের দোকানে নিয়মিত বিকেলে আড্ডা দিতে দেখেছি ওকে। আজও সেইখানে ছিল সে। দুটো মস্ত মস্ত ধেড়ে ছেলের সঙ্গে হাত-পা ছুঁড়ে কী যেন আলোচনা করছিল।
বাবার কড়া হুকুম রাস্তার কোনও চায়ের দোকানে ঢোকা আমাদের বারণ। আরও বিশেষ করে এ-দোকানটা যত পাজি ছেলের আড্ডা। দোকানটার সামনে এসে আমার বুক কাঁপতে লাগল।
কিন্তু ‘গহন বনের গল্প’–পাতায় পাতায় তার ছবি, তার ‘গরিলার বিভীষিকা’ আর ‘মানুষখেকো সিংহ’ একটা অসহ্য তীব্র স্বরের মতো আমার মাথার মধ্যে কাঁপছে। আমি আর থাকতে পারলাম না।
দোকানে ঢুকে ডাকলাম কুঞ্জ!
কুঞ্জ প্রথমটা চমকে গেল। তারপর অদ্ভুত ভঙ্গিতে মুখ ভেংচে বললে, কী হে, গুড বয়, এখানে?
বললাম, তোর সঙ্গে আমার একটা কথা আছে।
কী কথা? আমার কাছে কী দরকার তোর–আমাদের ছায়া মাড়ালেও তো তোদের গুড কন্ডাক্টের প্রাইজ পাওয়া নষ্ট হয়ে যাবে! তেমনি ভ্যাংচানির ভঙ্গিতে কুঞ্জ হেসে উঠল।
-তোর বইটা একবার পড়তে দিবি আমাকে?–অপমানে কান জ্বালা করছিল, তবু না বলে থাকতে পারলাম না।
–আমার বই? কী বই?
‘গহন বনের গল্প।
–ও! খোঁজ পেয়েছ তা হলে! কুঞ্জর চোখ মিটমিট করতে লাগল: সে তো আমার কাছে নেই।
জানি। খগেন নিয়েছে। আজ সন্ধেবেলাতে ফেরত দেবে। আমি মিনতি করলাম; আজ রাত্রিটা আমায় পড়তে দে, কাল সকালেই তোকে দিয়ে যাব।
কুঞ্জ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল আমার দিকে। তারপর নাক কুঁচকে বললে, কেন দেব তোকে?
–ভাই কুঞ্জ
কুঞ্জ আবার ভেংচি কেটে বললে, অত ভাই-ভাই করতে হবে না! মারামারির সময় মনে থাকে না? আমাদের খারাপ ছেলে বলবার সময় মনে থাকে না?
এর পরে চায়ের দোকান থেকে সোজা বেরিয়ে আসা উচিত ছিল। কিন্তু পারলাম না। আমার ভেতরে তখনো জ্বরের মতো নেশাটা কাঁপছে! নিশির ডাকের মতো হাতছানি দিয়ে ডাকছে আমাকে।
বললাম, যা হয়ে গেছে, হয়ে গেছে। আজ থেকে আমরা বন্ধু।
–বন্ধু! কুঞ্জর চোখ আবার মিটমিট করতে লাগল : তাহলে প্রমাণ দেখা।
–কী প্রমাণ দেব?
–চা খাওয়া, চপ খাওয়া।
চা! চপ! চোখের সামনে অন্ধকার দেখলাম। বললাম, ভাই, পয়সা নেই।
–পয়সা নেই? কুঞ্জ আমার শার্টের পকেটটা নাড়া দিলে : ওই তো ঝনঝন্ করে উঠল। নেই মানে? ফাঁকি দিয়ে বন্ধুত্ব পাতিয়ে বই বাগাবার মতলব? সেটি হচ্ছে না চাঁদ।
–কিন্তু এ-পয়সা তো–আমি ঢোক গিললাম :ইনস্ট্রুমেন্ট বক্স কেনবার জন্য এনেছি।
কুঞ্জ খিঁচিয়ে উঠল : তবে তাই কেন গে না। মন দিয়ে লেখাপড় কর গে। গল্পের বই নিয়ে কী হবে? যা–পালা এখান থেকে।
পালাতে পারলে বাঁচতাম, কিন্তু কে যেন পা দুটো পাথর দিয়ে আটকে দিয়েছে আমার। বুকের মধ্যে যেন ঝড় বইছে! এত কষ্ট করেও পাব না বইটা? হাতের কাছে এসেও এমন করে ফসকে যাবে?
শুধু নেশা ধরাই নয়–আমার ঘাড়ে যেন ভূত চেপেছিল। না হলে, যে-দুঃসাহস আমি জীবনে ভাবতে পারিনিতাই করে ফেললাম। ফস করে বলে বসলাম, বেশ খা তুই চা-চপ।
