প্রকাশক তবু বললেন, নিতেই যদি হয়, তা হলে নতুন বই কিছু নিন বরং। ওসব তো পুরনো হয়ে গেছে। আজকালকার ছেলেরা আর পড়ে না।
–তা হোক। এইটেই আমার দরকার। কত দাম?
প্রকাশক বন্ধু লোক। হেসে বললেন, এমনিই নিয়ে যান। ওর আর দাম দিতে হবে না।
বাইরে এসে দাঁড়ালাম ট্রাম-স্টপের পাশে। দুপাশে বাড়িগুলোর মাথায় বেলাশেষের রাঙা আলো ঝিকমিক করছে–ছায়া ঘনিয়ে পড়েছে রাস্তার ওপর। ঠাণ্ডা মিষ্টি হাওয়া বইছে। বইটাকে কাছে আঁকড়ে ধরে ট্রামের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে রইলাম আমি।
নিজে বই লিখি এখন। সাহিত্যিক বন্ধুর অভাব নেই নতুন বই পাওয়ার দুঃখও নেই আর। তবু এই গহন বনের গল্প কোনওদিন এমনি করে হাতে আসবে, তা কল্পনাতেও ছিল না। মনে হত হাতের মুঠোর মধ্যে পেয়েও যে-হীরেটা হারিয়ে ফেলেছিলাম একদিন, আজ অযাচিতভাবে তা আমার কাছে ফিরে এল। এখন এ আমার চিরদিনের মতোই আমার।
ট্রাম এল। চেপে বসে কন্ডাকটারকে বললাম, এসপ্ল্যানেড।
ট্রাম চলল। মনের মধ্যে ছেলেবলার দিনগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই দিনাজপুরের শহর-ষষ্ঠীতলার বটগাছ কাঞ্চন নদীর ধারে, পুরনো সাহেবি গোরস্থানের পাশে পাশে সেই পথ। আম জাম বিলিতি পাকুড়ের ছায়া-লাটা গিলে আর বৈচির বন; সেই শঙ্খচিল, শেয়াল, গোসাপ আর গোখরোর খোলস। তার ভিতর দিয়ে চলেছি। ভিতরে কাঁপছে অ্যাডভেঞ্চারের নেশা–দুরের আকাশে উড়ন্ত মস্ত গগনবেড় পাখিটার মতো কল্পনাও ডানা মেলেছে। এই পথটাও তো হয়ে যেতে পারে আফ্রিকার জঙ্গল,–এসে হাজির হতে পারে। গরিলা, সামনে লাফিয়ে পড়তে পারে সিংহবাইসনের সঙ্গে বাধতে পারে চিতাবাঘের। লড়াই–চারিদিক থরথর করে কেঁপে উঠতে পারে বুনো হাতির গর্জনে। ছেলেবেলার সেই ছুটির দিন–স্বপ্নভরা দুপুর বুকের ভিতর যেন ঝিমঝিম করে বাজতে লাগল।
চমক ভেঙে দেখি, গাড়ি এসপ্ল্যানেডে এসে ঢুকেছে। নেমে পড়লাম। কার্জন পার্কের পাশ কাটিয়ে, মনুমেন্ট ছাড়িয়ে, এগিয়ে গেলাম আরও খানিকটা। তারপর নিরিবিলি দেখে এক জায়গায় ঘাসের ওপর পা ছড়িয়ে বসে পড়লাম।
বুকের কাছে বইটা এখনও ধরা। কোলের ওপর নামিয়ে রাখলাম। সন্ধ্যার আবছায়াতে গাঢ় সবুজ বড় বড় অক্ষরে লেখা গহন বনের গল্প ঝাপসা হয়ে আসছে। কিন্তু ছেলেবেলার হারানো দুপুরের রোদ লেগে ওই লেখাটাই ঝকঝক করে জ্বলতে লাগল বুকের ভিতরে।
সেই দিনটার কথা মনে পড়ছে। একেবারে পরিষ্কার ছবি দেখছি চোখে।
নিঝঝুম দুপুর। গরম হাওয়া বইছে। আমে রঙ ধরতে শুরু হয়েছে। মাঝখানে টার্মিনাল পরীক্ষা, তারপরেই গ্রীষ্মের ছুটি। ইস্কুলে আর মন বসতে চায় না। জানলা দিয়ে ঘন ঘন বাইরে তাকাই আর ভাবি-কখন লাস্ট পিরিয়ডের ঘণ্টা পড়বে।
ড্রয়িং-এর ক্লাস নিচ্ছেন মৌলবী সাহেব। ভারি নিরীহ ভালোমানুষ। একটা ছোট্ট ঘোড়ার পিঠে জিনের বদলে একখানা কাঁথা বসিয়ে তাতেই চেপে ইস্কুলে আসতেন। আর ক্লাসে ঢুকে ব্ল্যাকবোর্ডে একটি ঘটি কিংবা বেগুন যা-হোক কিছু এঁকে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ঘুমিয়ে পড়তেন।
হেডমাস্টার কাছাকাছি না থাকলে ছেলেরা কেউ কেউ এই ফাঁকে তাঁর গোবেচারা ঘোড়াটায় চাপবার চেষ্টা করত। কেউ বা বেগুনের বদলে তাঁর মুখ আঁকত খাতায়। কোনওদিন ভ্রূক্ষেপ মাত্র না করে নিশ্চিন্তে ঘুমোতেন মৌলবী সাহেব। বেশি গোলমাল হলে কখনও কখনও ঘুম-ভরা চোখ তুলে আলগা ধমক দিয়ে বলতেন এই, এত গোলমাল হচ্ছে ক্যান? কানটা যে ফাটাই দিলে হে আমার!
এই মৌলবী সাহেবের ক্লাসেই–এমনি একটা মন-উড়ু দুপুরে এসে দেখা দিল গহন বনের গল্প।
যথারীতি একটা কুমড়ো এঁকে দিয়ে মৌলবী সাহেব ঘুমিয়ে পড়েছেন। আমি আর আমার পরম বন্ধু বাচ্চু সেন খাতায় কাটাকাটি খেলছি। এমন সময় চোখে পড়ল, সেকেন্ড বেঞ্চে বসে খগেন বড়াল খুব মন দিয়ে কী একখানা বই পড়ছে।
ব্যাপারটা একটু নতুন। ড্রয়িং ক্লাসের ছেলে খগেন, ভালো ছবির হাত। ওর আঁকা কুমড়োকে কখনও ঝিঙে বলে ভুল হয় না–মৌলবী সাহেব ওকে দশের মধ্যে এগারো নম্বর দিতে পারলে খুশি হন। এ-হেন খগেন ড্রয়িং ভুলে গিয়ে বই পড়ছে। কিমাশ্চর্যম!
কী বই রে ওটা খগেন?-কৌতূহল সামলাতে পারলাম না।
খগেন জবাব দিলে না। একেবারে তন্ময়।
-এই, বল না–কী বই?
খগেন ভারি বিরক্ত হল! রুদ্ধশ্বাসে বইয়ের একটা পাতা উলটে বললে, এখন ভীষণ ব্যাপার। রাত্তির বেলা সিংহ এসে শিকারিকে তাঁবু থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে! গোলমাল করিসনি এখন!
শুনেই রোমাঞ্চ হল। থাবা দিয়ে বললাম, দে না একটু দেখি।
ঝট করে বইটা সরিয়ে নিল খগেন। চোখ পাকিয়ে বললে, খবরদার রঞ্জন মারামারি হয়ে যাবে বলছি!
মৌলবী সাহেবের ঘুম ভাঙল।
–হাঁ হে, তুমরা কি এইটাক খেলারু মাঠ পাইছ? বেশি গোলমাল হইলে সব হাফ ডাউন করাই দিব।
তখনকার মতো শান্তি রক্ষা হল কিন্তু কৌতূহলে মন ছটফট করতে লাগল। তারপর গোপীবাবুর অঙ্কের ক্লাস–যমের ঘণ্টা। ‘গহন বনের গল্প’ ধামাচাপা রইল কিছুক্ষণ। কিন্তু ছুটি হতেই ফেউয়ের মতো লেগে গেলাম খগেনের পিছনে।
দে না ভাই, একটু দেখি বইটা।
খগেন বললে, আমার বই নয় পড়বার জন্যে চেয়ে এনেছি। আজই সন্ধেবেলা ফেরত দিতে হবে।
আমি তো আর নিচ্ছি না, হাতে করে দেখব শুধু। দে না একবার
খগেনের করুণা হল। বই-খাতার তলা থেকে সন্তর্পণে বইটা বের করে দিলে।
