পকেট থেকে বিড়ি বের করে তুহিনাংশু জিজ্ঞেস করলেন, চলে?
না, মাপ করবেন।
ওঃ, আপনার বুঝি সিগারেট? আমাদের পাড়াগাঁ মশাই, বিড়ি নইলে ঠিক জুত হয় না। আচ্ছা, চলুন এবার আমার ফার্ম একটু দেখিয়ে আনি আপনাকে। অবশ্য দেখবার মতো কিছুই নেই, সামান্য কিছু তরিতরকারি কেবল আছে। বরং শীতকাল এলে…
বলতে বলতে আমরা বেরিয়ে এলুম ঘর থেকে। মাথার ওপর নীল উজ্জ্বল আকাশ, দিগন্তে পাহাড়ের রেখা। শস্যহীন মাঠ পড়ে আছে যতদূর চোখ যায়। সেই নদীটার এক ফালি জল দেখতে পেলুম। এখান থেকেও সেই শিমুল গাছটা দেখা গেল যেখানে আমি মাছ ধরতে গিয়েছিলুম, আর যেখানে প্রথম হঠাৎ যেন বিকালের আলোর ভেতর থেকে ফুটে উঠেছিলেন চৌধুরি।
আমি ওঁর মুখের দিকে চাইলুম। রগের কাছে দু-তিনটে চুল চকচক করছে রোদে, চোখের কোলে কালির রেখা। আজ দিনের বেলায় এই রোদের ভেতরে আমার মনে হল, বয়েসের তুলনায় ভদ্রলোক যেন অনেক বেশি বুড়িয়ে গেছেন।
সামনে একটা প্রকান্ড গ্রানাইট পাথরের চাঙড় পড়ে ছিল। হঠাৎ সেই দিকে এগিয়ে গেলেন তুহিনাংশু।
এই পাথরটা দেখছেন?
দেখছি।
কী মনে হয় আপনার?
কী আবার মনে হবে?
খুব-একটা বিসদৃশ ব্যাপার বলে বোধ হয় না? কোথাও কিছু নেই, হঠাৎ যেন রাস্তাজুড়ে একটা অর্থহীন বাধা। বলতে বলতে একটা উগ্র বন্য আলো তাঁর দু-চোখে ঝলকে উঠল। জানেন, এই আট বছর ধরে এটাকে রোজ আমি ঠেলে সরাতে চেষ্টা করি, অথচ একটুও নড়ে না।
আমি বললুম, কী আশ্চর্য, খামোখা ওটাকে সরাবার জন্যে কেন পন্ডশ্রম করবেন? আর অত বড়ো একটা পাথরকে মাটি থেকে নড়ানো কি কোনো মানুষের পক্ষেই সম্ভব?
কী সম্ভব তাহলে বলতে পারেন? চৌধুরির স্বরে হঠাৎ যেন একরাশ আগুন ঝরে পড়ল, চিরকাল কি এমনি করে একটা পাথরের তলায় সব চাপা পড়ে থাকবে? কবিতা হারিয়ে যাবে? মণিকা হারিয়ে যাবে? যেখানেই যাব এই পাথরের হাত থেকে আমি মুক্তি পাব না? আপনি বিশ্বাস করুন, এইবারে এটা সরবেই, তার সময় এসেছে।
বলতে বলতেই চৌধুরি পাথরটার দিকে এগিয়ে গেলেন। প্রাণপণে ঠেলতে লাগলেন সেটাকে। লোকটা সত্যিই পাগল কি না বুঝতে চেষ্টা করছি, তৎক্ষণাৎ একটা তীব্র চিৎকার আমার কানে এল।
অমন জান্তব, অমন বুকফাটা চিৎকার জীবনে আমি কখনো শুনিনি। বিদ্যুদবেগে ফিরে তাকালুম। বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে তুহিনাংশুর সেই কালো কুৎসিত বোবা কালা স্ত্রী। মাথার ঘোমটা খসে পড়েছে, চোখের তারা দুটো বিস্ফারিত, একরাশ রুক্ষ চুল উড়ছে ডাকিনীর মতো। তার মুখের চেহারা কল্পনা করা যায় না, যেন মৃত্যু-বিভীষিকা দেখতে পাচ্ছে সামনে।
আঁ-গাঁ-গাঁ-গাঁ। আবার একটা জৈব আর্তনাদ বেরুল তার গলা দিয়ে।
তখন তুহিনাংশু সোজা হয়ে আমার দিকে মুখ ফেরালেন। পাথর ঠেলবার পরিশ্রমে বুকটা তখনও যেন ঢেউয়ের মতো ওঠা-পড়া করছে ভদ্রলোকের। ঝড়ের মতো নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে হেসে বললেন, ভয় পায় মশাই—পাথরটা ঠেলতে গেলেই ভয় পায়। কিন্তু এটা বুঝতে পারে না যে, ওটা না-সরিয়ে দেওয়া পর্যন্ত আমি মুক্তি পাব না।
চৌধুরির মুখের দিকে তাকিয়ে আমার পা দুটো মাটির মধ্যে গেঁথে গেল।
অনেকগুলো কথার উত্তর একসঙ্গে স্পষ্ট হয়ে গেছে তখন। আত্মহত্যা করব না—এই প্রতিজ্ঞা করে তিলে তিলে আত্মহত্যার সাধনা কি এমনিভাবেই করতে হয়? এই বোবা-কালা কুরূপা স্ত্রী, এই জীবন, অকারণে বিকালের নদী পার হয়ে সন্ধ্যার বনতুলসী আর লেবুঘাসের জঙ্গলে হারিয়ে যাওয়ার চেষ্টা, তার অন্ধকারের ভেতরে সাপের খোলস খোঁজার কী অর্থ থাকতে পারে আর? খাঁচার শলা তো নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি, তিরের ফলা হয়ে পাখির বুকে বিঁধেছে।
আমি তুহিনাংশু দত্তচৌধুরির আত্মহত্যা দেখতে পাচ্ছি। পাথর ঠেলার পরিশ্রমে তখনও ঝড়ের মতো শ্বাস পড়ছে তাঁর, আর আর ঠোঁটের দু-পাশ দিয়ে দুটো সরু রক্তের ধারা রোদের আলোয় জ্বলে উঠেছে।
চৌধুরির স্ত্রী পাগলের মতো ছুটে এল তাঁর দিকে। কিন্তু আমি দেখলুম তাঁর পাশে সেই ছায়াটা স্থির দাঁড়িয়ে আছে—সেই প্রেতলোকের সহচর, যে শেষ মুহূর্তের আগে তাঁর সঙ্গ ছাড়বে না।
সেই বইটি
প্রকাশকের দোকানে বসেছিলাম। সামনে কাউন্টারের ওপর নানা আকারের নানা রঙের বই। অসংখ্য মানুষের অসংখ্য মনের যেন এক বিশাল পৃথিবী এই বইগুলো। কত চিন্তা কত গবেষণা–জ্ঞান-বিজ্ঞানের কত খবর। সুখ-দুঃখ, কান্না-হাসি, গল্পকবিতা, রোমান্স-অ্যাডভেঞ্চারের স্বপ্নপুরী।
অন্যমনস্কভাবে বইগুলো নাড়াচাড়া করছি, হঠাৎ একখানা বইয়ের ওপর এসে চোখ আটকে গেল আমার। মলাটে সেই পুরনো ছবিটি–সেই গাঢ় নীল বড় বড় হরফের লেখা, ‘গহন বনের গল্প’। লেখক প্রিয়দর্শন মিত্র।
আকাশে যেমন উল্কা ঝরে, তেমনিভাবে কতকগুলো বছর ঝরে গেছে। কত অদলবদল হয়েছে পৃথিবীর। আমরা যারা ছোট ছিলাম তারা বড় হয়ে গেছি–যাঁরা বড় ছিলেন, বুড়িয়ে গেছেন তাঁরা। ছেলেদের জন্যে হাজার হাজার রঙচঙে বইয়ে ছেয়ে গেছে বাজার। তাদের মাঝখান থেকে বহুদিনের চেনা বইখানা সেই চেনা চেহারা নিয়ে করুণ চোখে যেন আমার দিকে তাকাল।
প্রকাশককে বললাম, এ বইটার দাম কত?
একটু অবাক হলে প্রকাশক : কী করবেন ওবই নিয়ে? ছেলেদের বই পড়বার বাতিক আছে নাকি আপনার?
বললাম, তা আছে। আমারও যে একটা ছেলেবেলা ছিল, এসব বই দেখতে সে কথা মনে পড়ে যায়। এটা আমি নেব।
