কী আশ্চর্য! সেসব ছেলেমানুষির কথা এখনও কারও মনে আছে নাকি? আমি তো কবে ভুলে গেছি।
ভুলে গেছেন? অথচ এত ভালো কবিতা লিখতেন আপনি!
ভালো কবিতা নয় মশাই, হাত থাকলেই বাঙালির ছেলে কবিতা লেখে, আমিও লিখতুম। তখন সবে কলেজ থেকে বেরিয়েছি, একটা ভদ্র রকমের চাকরিও জুটিয়েছিলুম। একজনের পাল্লায় পড়ে একটা কবিতার বইও ছেপে ফেলা গেল। তারপরেই দেখলুম এসব প্রলাপ বকবার কোনো মানেই হয় না, ভাবলুম একটা বড়ো কাজ কিছু করা যাক—সামথিং কনস্ট্রাকটিভ। একটা মডেল ফার্ম করলে কেমন হয়? ছুটিতে দার্জিলিং চলেছি, এই রেলস্টেশনটায় এসে হঠাৎ ট্রেন থেমে গেল—লাইনে গোলমাল হয়েছে কোথাও। কী মনে হল নেমে পড়লুম এখানে, চলে গেলুম গাঁয়ের ভেতরে। সেইদিনেই কয়েক বিঘে জমি বায়না করে ফেললুম অসম্ভব সস্তায়। সেই থেকে আছি এখানে, কবিতা লেখার চাইতে অনেক বড়ো কাজের খোঁজ পেয়েছি। এদিকের লোকে টোটকায় বিশ্বাস করে, আমিও কিছু আলোচনা করেছি ও নিয়ে। নেহাত ফেলনা জিনিস নয় মশাই। মডেল ফার্মিং-এ তেমন জুত করতে পারিনি, তবুও সব মিলিয়ে বেশ আছি। কী হবে মশাই বানানো কবিতা দিয়ে? কী মানে হয় তার?
এক নিশ্বাসে বলে গেলেন তুহিনাংশু। কিন্তু সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারলুম না আমি, কেমন মনে হল অনেক কথার ভিড়ে কয়েকটা ছোটো ছোটো কথা লুকিয়ে রইল। এমন অনেকগুলি প্রশ্ন রইল, যার জবাব তুহিনাংশু কোনোদিন দেবেন না।
আমার স্মৃতির মধ্যে কয়েকটা কবিতার লাইন জ্বলে উঠল হঠাৎ। আশ্চর্য ভালো লেগেছিল সেদিন। অন্যমনস্কর মতো আমি আবৃত্তি করলুম:
মণিকা, তোমার বাঘিনি-প্রেমের
আদিম অন্ধ রাতে
নোনা সাগরের ক্ষুব্ধ নিশান
তোলে সুন্দরবন
আমি ছুটে চলি হিংস্র কিরাত
খর বল্লম হাতে
সাপের মণিতে বিষাক্ত-নীল
আলোর সঞ্চরণ—
থামুন!
না, চিৎকার করলেন না তুহিনাংশু, প্রায় নিশব্দেই উচ্চারণ করলেন। কিন্তু তাঁর চোখে, তাঁর ঠোঁটে, তাঁর সমস্ত শরীরে যেন আর্তনাদ ফুটে উঠল একটা—যেন ঘর ফাটিয়ে একটা নীরব হাহাকার জেগে উঠল তাঁর। আতঙ্কে থেমে গেলুম আমি।
তুহিনাংশু আরও কিছু হয়তো বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু একটি মেয়ে এসে ঘরে ঢুকল। কালো, কদাকার, গায়ে ময়লা একটি শাড়ি-জড়ানো। একটি সেমিজ-ব্লাউজ পর্যন্ত নেই। কপাল পর্যন্ত ঘোমটা টানা, হাতে অমলেট আর জলের গ্লাস।
তুহিনাংশু বললেন, আমার স্ত্রী।
আমি বললুম, নমস্কার।
ভদ্রমহিলা ফিরেও তাকালেন না আমার দিকে। তক্তপোশের উপর আমার পাশেই প্লেট আর গ্লাস নামিয়ে রাখলেন। এক হাতে মাথার ঘোমটা আরও খানিকটা টেনে দিলেন, তারপর আবার যে-পথে এসেছিলেন সেই দিকেই অদৃশ্য হয়ে গেলেন।
তুহিনাংশু বললেন, কিছু মনে করবেন না মশাই। আমার স্ত্রী বোবা আর কালা, কানে শুনতে পায় না। চোখেও যে খুব ভালো দেখে তা নয়।
চকিত হয়ে বললুম, তাই নাকি?
সেই কালো ফ্রেমের চশমার ভেতর দিয়ে তুহিনাংশুর চোখ দুটো অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণতায় জ্বলতে লাগল, এই তো ভালো মশাই—যাকে বলে আদর্শ স্ত্রী। লেখাপড়া জানে না, গরিবের মেয়ে, কানে শোনে না, কথা বলতে পারে না। আমি বিয়ে করেছি বলে চিরকৃতার্থ হয়ে আছে, কী করি না-করি কোনোদিন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে না। এর চাইতে সুখ কিছু আছে বলতে পারেন আপনি? যাক গে, ওটা খেয়ে ফেলুন আগে, ঠাণ্ডা হলে আর ভালো লাগবে না।
কথা খুঁজে না-পেয়ে আমি অমলেটটাতেই মন দিলুম। স্বাদ পাচ্ছি না, একটা অজানা অস্বস্তি মনটাকে যেন চেপে ধরেছে এসে। মেটে দেওয়াল আর ওষুধ-বিষুধের সেই গন্ধের কুয়াশা আবার যেন ঘন হয়ে আসছে আমার মস্তিষ্কের ভেতরে। আমি এক হারিয়ে-যাওয়া কবি আর এই পাগলা চৌধুরির মধ্যে একটা যোগসূত্র খুঁজে ফিরছি কোথাও। খুঁজছি সেই নির্জন বিকালের আলোয় বনতুলসী আর লেবুঘাসের গন্ধভরা নদীর ধারে, খুঁজছি কপালিনীর মন্দির থেকে আসবার সময় সেই থমথমে অন্ধকারভরা সাপের জাঙালের মাঝখানে।
সেই মহিলা দুটো ময়লা পেয়ালায় করে প্রায় সাদা রঙের চা নিয়ে এলেন। তাঁকে সম্ভাষণ করবার পন্ডশ্রম আমি আর করলুম না। শুধু দুখানি কালো কালো শীর্ণ হাতের ওপর আমার
চোখ পড়ল, যেখানে চারগাছা নীল কাচের চুড়ি ছাড়া আর কোনো আভরণই নেই।
যাই বলুন মশাই, আমি সুখী। তুহিনাংশু যেন স্বগতোক্তি করতে লাগলেন, কবিতা— কলকাতা! কোনো মানে হয় না মশাই। তার চাইতে এই ভালো, অনেক ভালো। ভাবতে পারেন আট বছরের মধ্যে আমার নামে কোনো চিঠি আসেনি, আমি খবরের কাগজ দেখিনি? টোটকা দর্পণ আর ভেষজ-রহস্য ছাড়া কোনো বই পড়িনি? সুখ! সুখের অর্থ যে কী, কেউ বলতে পারে? বেশ আছি আমি, কারও কাছে এতটুকু নালিশ নেই আমার।
কোনো নালিশ নেই? খাঁচায় সকাল কবিতার আরও কয়েকটা পঙক্তি আমার মনে এল :
এক মুঠো আগুন দাও তোমার হৃদয় থেকে
হে লোহিতাক্ষ—হে জবাকুসুমসংকাশ, হে হিরণ্যপাণি!
খাঁচার এই লোহার শলাকাগুলো পুড়ে যাক
গলে যাক—চিরতরে হোক নিশ্চিহ্ন–
চা ঠাণ্ডা হয়ে গেল যে মশাই!
হ্যাঁ, খাচ্ছি।
মালাই চা-ই বটে। চায়ের স্বাদ-গন্ধ পর্যন্ত কিছুই পাওয়া গেল না তাতে। সন্দেহ নেই তুহিনাংশু দত্তচৌধুরি সত্যিকারের সুখের সন্ধান পেয়েছেন এখানে, জীবন থেকে শহরকে চিরদিনের মতোই মুছে দিয়েছেন। নইলে এ চা বরদাস্ত করা অসম্ভব হত।
