চৌধুরি থলিতে হাত ঢোকাবার উপক্রম করতেই আমি প্রায় আর্তনাদ করে উঠলুম।
না না, সাপের খোলস আমি দেখতে চাই না।
হা-হা করে মাঠ কাঁপিয়ে হেসে উঠলেন ভদ্রলোক। বললেন, যতই বিষধর সাপ হোক মশাই, তার খোলসে বিষ থাকে না। আচ্ছা, চললুম এখন; কাল সকালে তাহলে আসছেন আমার ওখানে, নেমন্তন্ন রইল।
বলে আর দাঁড়ালেন না, বাঁ-দিকের রাস্তা ধরে লম্বা লম্বা পায়ে এগিয়ে চললেন। আর আমার মনে হল তাঁর পাশে পাশে যেটা চলেছে ওটা তাঁর ছায়া নয়, আর একটা ছায়ামূর্তি সহযাত্রী বন্ধুর মতো তাঁর কাঁধে হাত দিয়ে এগিয়ে চলেছে।
নদীর ধারের সেই অদ্ভুত বিকাল, সন্ধ্যার অন্ধকারে সাপের জাঙাল আর ঘুরে-ফিরে সেই একটা লোক! সব মিলে একটা রহস্যময় তীব্র আকর্ষণ অনুভব করতে লাগলুম। একজন বিদেশি মানুষ, যথেষ্ট শিক্ষিত বলে মনে হয়, আট বছর ধরে উত্তরবাংলার এই নগণ্য পাড়াগাঁয়ে একটা আশ্চর্য জীবনযাপন করছে। আরও বিচিত্র এই যে, এখানকার কেউ আজ পর্যন্ত তাকে ভালো করে চেনে না। পলাতক আসামি নয়, তা হলে পুলিশের চোখ এড়াতে পারত না। পাগলা বলে একটা বদনাম আছে, কিন্তু যেখানে যেভাবেই দেখা যোক লোকটিকে অন্তত পাগল বলে আমার মনে হয়নি।
রহস্যের আকর্ষণে পরদিন যখন চৌধুরির মডেল ফার্মে গিয়ে পৌঁছেলুম, তখন বেলা গোটা আটেক হবে। চৌধুরি ডোবার ধারে সেই তিনটে তাল গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আমারই জন্যে অপেক্ষা করছিলেন মনে হল। বড়ো বড়ো পা ফেলে এগিয়ে এলেন।
আসুন আসুন।
প্রথম দৃষ্টিতেই বুঝতে পারলুম কাকার কথাই ঠিক। এ আর যা-ই হোক, মডেল ফার্মিংয়ের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। টিনের ছোটো একটি বাড়ি, বিঘে কয়েক জমিতে সামান্য কিছু তরিতরকারি চোখে পড়ল। গুটি ছয়েক হাঁস চরছিল ডোবায়, কয়েকটা মুরগিকেও এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে দেখলুম।
যে-ঘরটায় ঢুকলুম সেইটেই বোধ হয় বসবার ঘর। একটা তক্তপোশের উপর মলিন ছেড়া মাদুর। মেটে দেওয়ালের দুটো কুলুঙ্গিতে কতকগুলি শিশি-বোতল-কৌটো, কিছু শেকড় বাকড়। বুঝতে পারলুম, মডেল ফার্মিংয়ে চৌধুরির অন্নসংস্থান হয় না— এইগুলোতেই তাঁর আসল জীবিকা।
বসুন, চা বলে আসি।
বললুম, চা আমি খেয়ে এসেছি, ব্যস্ত হবেন না।
আহা, খেয়ে তো আসবেনই, সে কি আর আমি জানিনে? কিন্তু আমার ফার্মের টাটকা মুরগির ডিমের অমলেট আর নিজের গোরুর দুধের মালাই চা—তার স্বাদ একটু আলাদা মনে হবে আপনার। বসুন বসুন।
ভেতরের দিকে চলে গেলেন চৌধুরি, আমি সেই তক্তপোশটায় বসে রইলুম। মেটেঘরের সোঁদা গন্ধের সঙ্গে সেই ওষুধপত্রগুলোর আঘ্রাণ যেন একটু একটু করে কুয়াশার মতো আমার মস্তিষ্কের ভেতরে ঘন হতে লাগল। বাইরে থেকে হাঁসের ডাক শুনতে পাচ্ছিলুম, খোলা দরজা দিয়ে প্রকান্ড একটা নীল ভ্রমর এসে ঘরের ভেতরে এক বার ঘুরপাক খেয়ে গেল।
চৌধুরি ফিরে এলেন, বসলেন তক্তপোশের আর এক কোনায়। বললেন, আমার মডেল ফার্ম দেখে খুব নিরাশ হয়েছেন, না?
কী জবাব দেব বুঝতে পারলুম না। একে আদৌ ফার্ম বলে কি না আমার জানা নেই, আর এইটেই মডেল হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত কি না তাও আমার মনে সংশয় তুলল।
চৌধুরি হাসলেন, ইচ্ছে একটা সত্যিই ছিল সুকুমারবাবু। কিন্তু এই আট বছরে…
বাধা দিয়ে আশ্চর্য হয়ে বললুম, আমার নাম আপনি জানেন?
কলকাতার একজন প্রফেসার এসেছেন আমাদের পাড়াগাঁয়ে, নাম কে না জানে বলুন? আমার নামও নিশ্চয় শুনেছেন আপনি?
হাসিটা আবার ফুটে উঠল ভদ্রলোকের মুখে, পাগলা চৌধুরি, তাই না?
কুষ্ঠিত হয়ে জবাব দিলুম, তা-ই শুনেছি।
কিন্তু পাগলা আমার নাম নয়, ডাকনামও নয়। এখানকার লোকেই ওটা দিয়েছে আমাকে। আপনি নিশ্চয় চক্ষুলজ্জার খাতিরে আমাকে পাগলাবাবু বলে ডাকতে পারবেন না, আর বার বার চৌধুরিমশাই বলতেও বেয়াড়া লাগবে। আমার একটা জবরদস্ত পোশাকি নাম আছে— তুহিনাংশু দত্তচৌধুরি। সংক্ষেপে তুহিন বলতে পারেন।
তুহিনাংশু দত্তচৌধুরি! এই মুহূর্তে ঘরের মেটে দেওয়াল আর ওষুধপত্রের গন্ধে কুয়াশা জমে-ওঠা আমার মস্তিষ্কের ভেতরে বিদ্যুৎ বয়ে গেল। এই নাম একটু অসাধারণ, এ নাম এক বার কানে এলে সহজে ভোলা যায় না। তৎক্ষণাৎ আমার মনে পড়ল—
সেই কবিতার বইটি। সবসুদ্ধ পঞ্চাশ পৃষ্ঠার বেশি নয়। গাঢ় হলুদ রঙের মলাটে লাল টকটকে অক্ষরে লেখা খাঁচায় সকাল। কতগুলি তীক্ষ্ণধার আধুনিক কবিতা। বিখ্যাত সমালোচকের লেখা উচ্ছসিত মুখবন্ধ।
পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলুম। আর শুধু বইটিই নয়, কিছু কিছু সাময়িক পত্রিকায় এই উজ্জ্বল প্রতিভার আবির্ভাব জানিয়েছিল সেদিন। ভিড়ের মাঝখানে মিশে যায়নি, নিজের পরিচয়েই মাথা তুলে দাঁড়িয়েছিল। তারপর হঠাৎ কবে হারিয়ে গেলেন তুহিনাংশু দত্তচৌধুরি। তাঁর আরও কিছু অনুরাগী পাঠকের সঙ্গে আমিও তাঁর কবিতার খোঁজ করেছিলুম দু-এক বছর পর। তারপরে যেমন হয়, খাঁচায় সকাল-এর কবিকে আমি ভুলে গিয়েছিলুম।
কিন্তু মনে পড়ল। প্রায় দশ বছরের ওপার থেকে মনে পড়ল আবার। সেই গাঢ় হলদে মলাটের উপর টকটকে লাল অক্ষরগুলো স্পষ্ট জ্বলে উঠল চোখের সামনে।
রুদ্ধস্বরে বললুম, কবি তুহিনাংশু দত্তচৌধুরি?
ঠিক দেখলুম কি না জানি না, পাগলা চৌধুরির মুখ সাদা হয়ে গেল এক বারের জন্যে। তারপরেই হেসে উঠলেন।
