আম-জাম-বাবলা গাছের ওপর দিয়ে তামাটে রঙের চাঁদটা আলো ছড়াচ্ছে। মেটেপথে চলেছি সাইকেল নিয়ে। কেন জানি না ওই মন্দিরটাই আমার মনকে আচ্ছন্ন করে দিল। চমক ভাঙল বিশ্রী একটা হোঁচট খেয়ে। কড়াং কট করে আওয়াজ কানে এল। অর্থাৎ চেন ছিড়ল সাইকেলের।
সামনে এখনও প্রায় দেড় মাইল পথ। আর যেখানটায় চেন ছিড়ল সে-জায়গাটাও একটু বেয়াড়া। কতকগুলি বড়ো বড়ো গাছ যেন সেখানে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে রাস্তার উপর। চাঁদ দেখা যায় না, ছাড়া ছাড়া অন্ধকারের টুকরো থমথম করছে। সাইকেলের আলোর শেষ সীমানা দিয়ে বাঘের বাচ্চার মতো বাদামি রঙের কী-একটা দৌড়ে গেল। আতঙ্কের ধাক্কা লাগল এক বার, পরক্ষণেই বুঝতে পারলুম ওটা একটা অতিকায় ভাম বেড়াল।
কয়েক মিনিট স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নিজেকে সামলে নিচ্ছি, হঠাৎ কানে এল, কী হল সাইকেলের?
আরও এক বার দারুণভাবে চমকালুম আমি। পথের ধারের অন্ধকার ছায়া ফুড়ে একটা কুঁজো মতন লোক এগিয়ে আসছে। লোকটার হাতে ছোটো একটা টর্চের আলো ঝলকে না উঠলে আমি হয়তো চিৎকার করে উঠতুম।
আমার মুখে টর্চ ফেলে লোকটা বললে, আরে, আপনি যে!
তখন চিনতে পারলুম। সেই পাগলা চৌধুরি।
জিজ্ঞেস করলুম, আপনি এখানে?
বুকের ভেতরটা ঢিপ ঢিপ করছিল তখনও, গলার আওয়াজ যে আমার কেঁপে উঠল, নিজেই টের পেলুম সেটা।
একটু কাজ ছিল। কিন্তু আপনি কোথায় গিয়েছিলেন?
কপালিনীর মন্দির দেখতে।
সেটা বুঝেছি। নতুন লোক, তাই জানেন না। দিনের বেলা ছাড়া এসব দিকে না আসাই ভালো।
চোর-ডাকাত? অপদেবতা?
না মশাই, সেসব নয়; অন্য ব্যাপার। নিন এগিয়ে চলুন এখন। সাইকেল তো দেখছি বেকার হয়ে গেছে, টানতে টানতেই যেতে হবে। চলুন।
ভদ্রলোক সঙ্গে থাকায় মনে ভরসা এসেছিল। চলতে চলতে জিজ্ঞেস করলুম, পথে কী আছে বলছিলেন?
সাপ মশাই, সাপ। বিরাট বিরাট গোখরো। পাকা গমের মতো গায়ের রং। পশ্চিমে গহুমা বলে খ্যাত, এদিকে বলে গোমা সাপ। কামড়ালে আর দেখতে হবে না। খুব পুরোনো আমলের জায়গা কিনা, নবাবি ইটের পাঁজা আর ভাঙা মন্দির-মসজিদের তো অভাব নেই আশপাশে। নিশ্চিন্তে বংশবৃদ্ধি করছে। বলেই ভদ্রলোক আমার হাত ধরে টানলেন। একটু দাঁড়ান।
কী হল?
শুকনো পাতার খড়খড়ানি পাচ্ছেন না? ওঁদেরই কেউ যাচ্ছেন একটু দূর দিয়ে। সাপের চলা ছাড়া ওরকম আওয়াজ হয় না। দাঁড়িয়ে যান, এগোতে দিন মহাপ্রভুকে। সাইজে বেশ বড়োই হবেন, নিদেনপক্ষে হাত পাঁচেক মনে হচ্ছে।
আর বলবার দরকার ছিল না। এমনিতেই আমার রক্ত হিম হয়ে এসেছিল।
কতক্ষণ পরে সাপটা চলে গেল জানি না। ভদ্রলোক আমার হাতে আবার একটা চাপ দিলে সভয়ে নড়ে উঠলুম আমি।
নিন, চলুন এবার। লাইন ক্লিয়ার।
চলতে লাগলুম, কিন্তু কীভাবে সে কেবল আমিই জানি। অন্ধকার গাছগুলোর ভূতুড়ে জগৎটা পেরিয়ে যখন তামাটে চাঁদের আলোর আবার মেঠোপথে এসে পড়লুম, তখনও সমানে পা কাঁপছে। চৌধুরির টর্চ মধ্যে মধ্যে জ্বলছে-নিবছে, কিন্তু আমার ক্রমাগত মনে হচ্ছিল—যেসব ছোটো ছোটো অন্ধকারের টুকরোগুলোতে টর্চের আলো পড়ছে না, সাক্ষাৎ মৃত্যু কুন্ডলী পাকিয়ে অপেক্ষা করছে তাদের ভেতর। আমি পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বিদ্যুতের মতো বিষাক্ত ফণা তুলবে তারা।
আরও আধ মাইল পথ নিঃশব্দে কাটল। আমার গলা অদ্ভুতভাবে শুকিয়ে গিয়েছিল, আমি কথা কইতে পারছিলুম না। চৌধুরি কী ভাবছিলেন জানি না। তামাটে চাঁদের পিঙ্গল আলোয় তাঁর একটা লম্বা ছায়া পড়েছিল পথের উপর। কেমন যেন মনে হচ্ছিল ও-ছায়াটা চৌধুরি নয়, তাঁর আগে আগে একটা ছায়ামূর্তি তাঁকে পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে চলেছে।
হঠাৎ চৌধুরি বললেন, নিন, ওই আপনার পোস্ট অফিসের আলো দেখা যাচ্ছে, গঞ্জের কাছে এসে পড়েছি আমরা। নির্ভয়ে চলে যান এবার।
আপনি?
আমি বাঁ-দিকে যাব। ওই যে ওখানটায় একটা মিটমিটে আলো দেখছেন, ওই আমার আস্তানা। একটু হেসে বললেন, মডেল ফার্ম। আসুন-না বেড়াতে বেড়াতে কাল সকালের দিকে। চিনতে অসুবিধে হবে না, একটা ডোবা দেখতে পাবেন, তার ধারে তিনটে তাল গাছ। আসবেন কাল?
বললুম, আসব।
তাহলে এই টর্চটা রাখুন সঙ্গে, কাল সকালেই সঙ্গে করে আনবেন।
বললুম, টর্চের দরকার নেই, এমনিই যেতে পারব এখন। আর তা ছাড়া আমার চাইতে বেশি পথ যেতে হবে আপনাকে, ওটা আপনারই দরকার।
আমার না হলেও চলে। অভ্যেস হয়ে গেছে।
কেন জানি না ফস করে জিজ্ঞেস করে বসলুম, একটা কথা বলব? রাগ করবেন না?
রাগ করব কেন? বলুন।
আপনি সব জেনেশুনেও এই সন্ধে বেলা ওই সাপের জাঙালে গিয়ে ঢুকেছিলেন?
দরকার মশাই, দরকার। পিয়োর অ্যাণ্ড সিম্পল নেসেসিটি। চৌধুরি হাসলেন, কয়েকটা সাপের খোলস আনতে গিয়েছিলুম।
সাপের খোলস! পা থেকে মাথা পর্যন্ত আমার ঝাঁকুনি লাগল।
হ্যাঁ, হ্যাঁ। আজ কী তিথি জানেন? জানেন না? যা-ই হোক, এই তিথিতে সাপের খোলস কুড়িয়ে আনতে পারলে তা দিয়ে বাতের একটা অব্যর্থ ওষুধ নাকি তৈরি করা যায়। সেইটে পরীক্ষা করব বলেই খোলস খুঁজতে গিয়েছিলুম। একেবারে হতাশ হতে হয়নি, দুটো পেয়েছি। দেখবেন?
এতক্ষণে আমার মনে পড়ল, কাকার কাছে শুনেছি যে চৌধুরি জড়িবুটির ব্যাবসা করেন। আরও খেয়াল হল, চৌধুরির বাঁ-হাতে ছোটো একটা চটের থলি আছে বটে।
