একটা অদ্ভুত অস্বস্তিতে আরও কিছুক্ষণ আমি দাঁড়িয়ে রইলুম সেখানে। যেন স্বপ্ন দেখলুম, যেন একটা অলৌকিক ঘটনা ঘটে গেল চোখের সামনে। এই নির্জন মাঠ, বাতাসে বেনাবনের শব্দ, লেবুঘাস আর বনতুলসীর গন্ধ, আর কালো-হয়ে-আসা রোদের রং সমস্ত জিনিসটাকে অদ্ভুত প্রেতপ্রত্যয়ে পৌঁছে দিতে পারত, যদি-না আমি দেখতুম তখনও নদীর জলটা অনেকখানি ধরে ঘোলা হয়ে আছে, যদি-না আমার চোখে পড়ত শিমুল গাছের তলায় একটা আধপোড়া বিড়ি থেকে সুতোর মতো ধোঁয়া উঠছে তখনও।
কাকা কনফার্মড ব্যাচেলর, একটি পোস্টাল পিয়োনকে নিয়েই তাঁর সংসারযাত্রা। সে-ই রান্নাবান্না করে। রাত্রে খেতে বসে আমি নদীর ধারের সেই অদ্ভুত লোকটার কথা কাকাকে বললুম।
কাকা বললেন, বুঝেছি, পাগলা চৌধুরি।
পাগলা চৌধুরি মানে? পাগল?
না, পাগল বলে তো মনে হয় না। একটু অদ্ভুত ধরনের এই যা।
অদ্ভুত কেন?
তা ছাড়া কী আর। লেখাপড়া জানে মনে হয়, ভদ্রলোক, অথচ কারুর সঙ্গে বিশেষ মেশেটেশে না। যা-কিছু খাতির গ্রামের চাষাভুসোর সঙ্গে। আমি তো এই দু-বছর আছি এখানে, হাটে কয়েক বার দেখা হয়েছে, আর সামান্যই আলাপ।
নিজের সেই মডেল ফার্মিং নিয়েই থাকেন বুঝি?
মডেল ফার্মিং! কাকা ভ্রুকুটি করলেন, সেসব তো কিছু শুনিনি। সামান্য কিছু জমিজমা আছে, চাষবাস করে; তা ছাড়া গ্রামের লোককে জড়িবুটি দেয়, টোটকা চিকিৎসা করে—এই তো জানি।
টোটকা চিকিৎসা?
হুঁ, এইসব করেই চালায়। এখানকার ভদ্রলোকদের সঙ্গে মেলামেশায় একেবারে আনসসাশ্যাল। শুনেছি প্রথম যখন এদিকে এসেছিল, তখন পুলিশে সন্দেহ করেছিল অ্যাবসকার, কিছু খোঁজখবরও নিয়েছিল। শেষে দেখেছে ওই এক ধরনের খেয়ালখ্যাপা লোক—ঘাঁটাঘাঁটি করে কোনো লাভ নেই।
কোথায় থাকেন?
গঞ্জের বাইরে, গাঁয়ের ভেতর। ঠিক কোথায় তা বলতে পারব না।
কৌতূহল মিটল আপাতত। পৃথিবীর অসংখ্য মানুষ নিজের খেয়ালখুশিতে দিন কাটিয়ে চলে। আমার কাছে যা নিছক পাগলামো, আর একজন তার ভেতর নিজের মতো করে যুক্তির শৃঙ্খলা খুঁজে পায়। অতএব ও নিয়ে মাথা-ঘামানো সম্পূর্ণ নিরর্থক। কিন্তু তবুও রাতে অনেকক্ষণ পর্যন্ত আমার ঘুম এল না। জানালার বাইরে দূরের এক সার কালো গাছপালার উপর তামাটে রঙের বিবর্ণ চাঁদটার ডুবে-যাওয়া দেখতে দেখতে আর বাদুড়ের ডানার আওয়াজ শুনতে শুনতে দুটো জিনিস আমাকে বার বার পীড়ন করতে লাগল। সেই পড়ন্ত রোদের আলোয় আগুনের মতো জ্বলতে থাকা চশমার কাচ আমার চিঠি কখনো আসবে না। আর, আর সেই আসন্ন সন্ধ্যায় অমনভাবে নদীটা পার হয়ে বনতুলসী আর লেবুঘাসের জঙ্গলে কোথায় মিলিয়ে গেল লোকটা?
পরের দিনটা নিজের এলোমেলো কাজ নিয়ে কাটল। সারা সকাল বসে বসে অনেকগুলো চিঠি লিখলুম। কাকার ছোটো রেডিয়োটা গোলমাল করছিল, সেটা খুলে ঘণ্টা দুই হাতুড়ে চিকিৎসা চালালুম, কাজ-চালানোর মতো দাঁড়িয়ে গেল। দুপুরে বাঁধানো পুরোনো মাসিক পত্রিকা জোগাড় করে একটা ধারাবাহিক নিটোল প্রেমের উপন্যাস পড়ে ফেললুম শেষ কিস্তিটা পর্যন্ত। বিকেলে চা খাওয়ার সময় মনে পড়ল মাইল পাঁচেক দূরে একটা চমৎকার পুরোনো মন্দির আছে, সেটা নাকি দেখবার মতো। চা শেষ করে কাকার সাইকেলটা নিয়ে সেই মন্দিরটার উদ্দেশেই বেরিয়ে পড়লুম।
কাকা বললেন, দেরি করিসনি, রাস্তাটা খারাপ।
না না, সন্ধ্যার মধ্যেই ফিরে আসব।
ঘড়িতে দেখলুম সাড়ে চারটে। যেতে-আসতে মাইল দশেক রাস্তা, সাইকেলে কতক্ষণই-বা লাগবে? মন্দিরের জন্যে আধ ঘণ্টা সময় ধরে রাখা যেতে পারে। সাড়ে ছ-টার মধ্যে ফিরে আসব। তা ছাড়া পৌনে সাতটা-সাতটার আগে তো ভালো করে অন্ধকারই হয় না আজকাল। ভাবনার কিছুই ছিল না।
কাঁচামাটির পথ, গোরুর গাড়ি চলে, তবু সাইকেলের পক্ষে এমন-কিছু দুরূহ দুর্গম নয়। মাঠের ভেতর দিয়ে আম-জাম-বাবলাবনের পাশ কাটিয়ে, গোটা দুই গ্রাম ছাড়িয়ে আর খুবসম্ভব সেই নদীটারই একটা লোহার সাঁকো পার হয়ে যখন মন্দিরে পৌঁছোলুম তখন আকাশে কালকের মতোই রাঙা বিকেল। কিন্তু আজ আর আমার পাগলা চৌধুরিকে মনে পড়ল না। মন্দিরটাই আমাকে মুগ্ধ করল। লাল পোড়া ইটে বিষ্ণুপুরী ধরনে তৈরি, প্রত্যেকটি ইটে কারুকার্য। এখন ফাটল ধরেছে এখানে-ওখানে, নবরত্ন চুড়োর ক-টাই ভেঙে পড়েছে, তবু দিঘির উঁচু পাড়ের উপর যেন রাজার মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে এখনও। ভেতরে কালো কষ্টিপাথরে-গড়া অষ্টভুজা কালীমূর্তি। তাঁর গায়ে বহুদিনের জমাট সিঁদুরের প্রলেপ চাপধরা রক্তের মতো দেখাচ্ছে। মন্দিরের চাইতেও মূর্তিটা অনেক বেশি পুরোনো বলে মনে হল।
ঘাটের সিঁড়িগুলো ভেঙে ঘাসবনের মধ্যে লুকিয়েছে, দিঘিটা মজে এসেছে আধাআধি, শ্যাওলা-পানা-পদ্মপাতায় ঢাকা মেঘরত্ন জলের ওপর পদ্মের কালো শুকনো ডাঁটা সারি সারি ফণাহীন কেউটের মতো দাঁড়িয়ে। মন্দিরের সামনে বসে দিঘির দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলুম আমি। আর শুনতে পেলুম হাওয়ায় হাওয়ায় দিঘির চারধারে বেল, আমলকী, রুদ্রাক্ষ আর হরীতকীর বন থেকে যেন দমচাপা দীর্ঘশ্বাস উঠছে।
যখন খেয়াল হল, তখন ফিকে নীল রেশমি শাড়ির মতো হালকা সন্ধ্যার গায়ে তারা জরি বুনছে, জোনাকির বুটি ফুটছে বেল-আমলকী-রুদ্রাক্ষের ছায়ায়। অনেক দেরি হয়ে গেল যে। ব্যস্ত হয়ে আমি উঠে দাঁড়ালুম, সাইকেলটা নিয়ে নেমে এলুম উঁচু ডাঙাটা থেকে, তারপর বাড়ির দিকে চলতে শুরু করে দিলুম।
