শালা বদমাস!
গর্জন করে উঠল একজন। আর একজনের হাতের লাঠিটা প্রবল বেগে এসে আছড়ে
পড়ল তার মাথায়।
ঝুপ করে জলের মধ্যে খসে পড়ল চালের বস্তাটা, পড়ে গেল ফজলে রব্বিও। নদীর কালো জলের চাইতেও আরও কালো আরও প্রখর অন্ধকার স্রোতের মধ্যে ভেসে গেল তার চেতনা।
শুধু ফজলে রব্বি একটা জিনিস জানতে পারল না। জানতে পারল না লাঠি যে মেরেছে সে মাত্র আট মাস আগে পাকিস্তানে পালিয়ে এসে মুসলমান হয়েছে। আগে তার নাম ছিল কান্তরাম, এখন সে ইয়ার মহম্মদ।
সুখ
মাছ ধরতে চান? ওভাবে হবে না।
আমি চমকে উঠলুম। আমার ধারণা ছিল বিকেলের এই নির্জন মাঠে, এই ছোটো নদীটার ধারে যেখানে এক টুকরো পাথরের ওপর বসে আমি শান্ত স্বচ্ছ জলের ভেতরে বঁড়শি ফেলেছি, তার আধ মাইলের ভেতরে কোনো জনপ্রাণী নেই। না, ভুল বলা হল। দু-একটি গোরু চরতে দেখেছিলুম এদিক-ওদিক, আশপাশের ক-টা ঝোপঝাড় থেকে এক-আধটা শেয়ালও বেরিয়ে আসা অসম্ভব নয়, কিন্তু…
তাকিয়ে দেখলুম পিছনে একটি মানুষ দাঁড়িয়ে। ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশের মধ্যে বয়েস, একটু বেশিমাত্রায় লম্বা বলে শরীরের ওপর দিকটায় অল্প একটু ভাঁজ পড়েছে। গায়ে আধময়লা হাফ শার্ট, পরনে ধুতি, পায়ে ধুলোমাখা রবারের জুতো। কালো ফ্রেমের চশমার ওপর পশ্চিমের রোদ পড়ে মনে হচ্ছিল চোখ দুটি জ্বলছে আগুনের গোলার মতো।
ভদ্রলোক আবার বললেন, নতুন লোক নিশ্চয়? নাহলে এ নদীতে ছিপ ফেলবার পন্ডশ্রম কেউ করে না। কিছু পেলেন?
বললুম, একটা ছোটো বেলে মাছ।
ব্যাস ব্যাস, যথেষ্ট পেয়েছেন। আজকের মতো খুশি হয়ে বাড়ি চলে যান। আর সত্যিই যদি দুটো-চারটে মাছ ধরতে চান, তাহলে রোমে এসে রোমান হতে হবে। অর্থাৎ গামছা পরুন, পলো নিয়ে জলে নামুন, ঘণ্টা তিনেক পরিশ্রম করুন, তারপর দেখবেন অন্তত পোয়াটাক চুনো মাছ জোগাড় হয়েছে।
বলে হেসে উঠলেন।
ভদ্রলোক কিছু লেখাপড়া জানেন বলে মনে হল। আর ঠিক এই পরিবেশে তাঁর আবির্ভাবটা কেমন অসঙ্গত বোধ হয় আমার কাছে। উত্তরবাংলার এই গ্রামটিতে কয়েকটা ছুটির দিন আমি কাটাতে এসেছি এক সপ্তাহ আগে। যে-আত্মীয়টির কাছে এসেছি তিনি সম্পর্কে আমার কাকা; তাঁর পরিচিত এবং বন্ধুবান্ধব অর্থাৎ যে দু-চারটি মোটামুটি শিক্ষিত মানুষ এখানে আছেন, তাঁদের সঙ্গেও আলাপ হয়ে গেছে আগেই। দুজন পোস্ট অফিসের কেরানি, জন কয়েক স্কুলটিচার, একজন ডাক্তার আর তাঁর কম্পাউণ্ডার, জন তিনেক ব্যবসায়ী। এঁদের বাইরে আর কেউ রোমে এসে রোমান হওয়ার প্রবাদ শোনাতে পারেন সেকথা আমার জানা ছিল না। আর বিকেলের এই নির্জন মাঠে যেখানে আধ মাইলের ভেতরে কোনো জনপ্রাণী আছে বলে আমার মনে হয়নি, যেখানে হাওয়ায় বেনাবন সরসর করছিল, যেখানে ওপারের জঙ্গল থেকে মধ্যে মধ্যে ভেসে আসছিল লেবুঘাস আর বনতুলসীর গন্ধ, যেখানে আমার ঠিক পায়ের নীচেই মিহি বালির ওপর খানিকটা নীলচে জল প্রায় নিথর হয়ে ছিল আর কয়েকটা ভাঙা ঝিনুকের রুপালি খোলায় লাল রোদের টুকরো মুক্তো হয়ে জ্বলছিল, সেখানে এই লোকটি যেন হঠাৎ ফুটে উঠল; যেন একটু আগে সে কোথাও ছিল না, একটু পরে এই রোদ মুছে গেলে সে-ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
আমি ছিপ গুটিয়ে আস্তে আস্তে দাঁড়িয়ে পড়লুম। জলের কোল ছেড়ে উঠে এলুম পাহাড়ের ওপর। সেই চার ইঞ্চি বেলে মাছটা পাথরের ধারেই পড়ে রইল।
নদীর ধারের একটি মাত্র গাছ—একটা শিমুলের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বিড়ি ধরাচ্ছিলেন ভদ্রলোক।
চললেন?
বললুম, হ্যাঁ। ভেবে দেখলুম আপনার প্রস্তাবটাই ভালো। কাল গামছা আর পলো এনেই চেষ্টা করে দেখব।
ভদ্রলোক একটু হাসলেন। বললেন, বাইরের লোক না?
এক সপ্তাহ হল এসেছি।
কোথায় উঠেছেন?
পরিচয় দিলুম। তারপর বললুম, আমার ধারণা ছিল এখানকার সকলের সঙ্গেই আমার মোটামুটি চেনা হয়ে গেছে। কারণ বিকেলে ডাক আসবার সময় সবাই এক বার পোস্ট অফিসে যান। কিন্তু আপনার সঙ্গে কখনো আমার দেখা হয়নি।
বিড়িতে টান দিয়ে ভদ্রলোক বললেন, তার কারণ আমার কখনো চিঠি আসে না–কখনো আসবে না।
শেষ কথাটায় আর এক বার চমকালুম আমি। চিঠি কখনো আসেনি এটা অসম্ভব না হতে পারে, কিন্তু চিঠি কখনো আসবে না—এইটেই কানে অত্যন্ত বেসুরো ঠেকল। আর বিকেলের সেই পড়ন্ত রোদে আরও এক বার তাঁর চশমার কাচ দুটোকে আগ্নেয় বলে মনে হল আমার।
অনুভব করলুম, এখানে আসবার পরে যাদের সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে—এই মানুষটি। তাদের চেয়ে অন্তত খানিকটা আলাদা।
বললুম, আপনিও বোধ হয় ঠিক এখানকার লোক নন।
এখনও এখানকার লোক হতে পেরেছি কি না জানি না। কিন্তু আট বছর আছি এখানে। মাসের হিসেব ধরলে আরও কিছু বেশি।
কী করেন?
চাষবাস। মডেল ফার্মিং।
মডেল ফার্মিং! ভদ্রলোকের মুখের দিকে চেয়ে রইলুম। সব যেন রূপকথার মতো শোনাচ্ছে। এই নগণ্য ছোটো গঞ্জটির আশপাশে মডেল ফার্মিং-এর মতো একটা ব্যাপার কিছু আছে একথা তো কেউ আমাকে বলেনি।
ভদ্রলোক বললেন, বিশ্বাস হচ্ছে না-না? একদিন নিয়ে যাব আপনাকে। আছেন তো এখন?
আর দিন চারেক থাকব।
আচ্ছা, দেখা হবে তাহলে। নমস্কার।
বলে ভদ্রলোক পাড় থেকে নদীর দিকে নেমে গেলেন। জুতো খুলে হাতে নিলেন, কাপড় তুললেন হাঁটু পর্যন্ত, তারপর প্রায় মজা নদীটার তিরতিরে জলটুকু ছপ ছপ করে পার হয়ে একটা বুনো জন্তুর মতো ওপারের বনতুলসী আর লেবুঘাসের বনের মধ্যে কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন।
