নিম গাছটার পেছনেই দয়ালের ভিটের দাওয়াটা শুধু চোখে পড়ে এখান থেকে। এই এক বছরেই চালের খড় ঝরে ঝরে মাটিতে মিশে গেছে ওর, হলুদের গুঁড়োর মতো রেণু রেণু হয়ে লয় পেয়েছে ঘুণে-খাওয়া বাঁশের খুঁটিগুলো। দরজা-জানালা যা ছিল যে যা পেয়েছে রাতারাতি হাতিয়েছে সব। পোড়া দাওয়ার ওপরে উঠেছে হাঁটুসমান বিছুটি, কচু আর তেলাকুচোর লতা। ওখানে কোনোদিন মানুষ ছিল, ছিল সংসার একথা যেন আজ বিশ্বাস করতে প্রবৃত্তি হয় না।
ওদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বেশি করে মনে পড়ে বন্ধুর কথা, মনে পড়ে ফুলমণির কথা। এই দেশের জন্যে লড়াই করে যে নিজের জান কোরবানি করে দিয়েছিল, দেশের মাটিতে তার চিহ্ন মাত্র রইল না। ভারি তাজ্জব লাগে, কেমন অস্বাভাবিক মনে হয়। আর মেয়েটার জন্যে থেকে থেকে একটা তীক্ষ্ণ উৎকণ্ঠা আর বেদনা তাকে পীড়ন করতে থাকে। যাওয়ার দিনে গোরুর গাড়িতে ওঠার আগে যখন অশ্রুভরা চোখে ফুলমণি তার পায়ে লুটিয়ে প্রণাম করল, সেদিন তাকে বাধা দিতে পারেনি ফজলে রব্বি, একটা কথাও বলতে পারেনি। শুধু চলন্ত গাড়িটার ধুলোর মেঘের দিকে চোখ মেলে দিয়ে ঠায় দাঁড়িয়েছিল অনেকক্ষণ।
আজ এক বছরের মধ্যে কোনো খবর পায়নি ফুলমণির। কোথায় আছে, কেমন আছে কে জানে। হিন্দুস্থান আর পাকিস্তান। মাঝখানে শুধু একটা নদীর খেয়াঘাট পার হয়েই মানুষ কেমন করে এত দূরে সরে যায় কে বলবে।
বুড়ো মিয়া?
কে? একটু দূরের মানুষ আর ভালো করে ঠাহর হয় না আজকাল। ভুরুর ওপর হাতখানা তুলে ধরে ফজলে রব্বি বলল, কে ওখানে?
আমি মকবুল।
কী খবর রে।
ওপারে গিয়াছিলাম। তোমার ফুলমণির সঙ্গে দেখা হল।
ফুলমণি! ফজলে রব্বি চমকে উঠল, কোথায় আছে তারা! ভালো আছে তো সব?
শহরেই বাসা বেঁধেছে, কিন্তু ভালো নেই চাচা। সেই খবরটাই তোমায় দিতে বললে।
ভালো নেই! বুকের ভেতরে ধক করে উঠল ফজলে রব্বির, কী হয়েছে?
কী-একটা হাঙ্গামায় মানুষ খুন করে উধাও হয়েছে কান্তরাম। খাওয়া জুটছে না তোমার ফুলমণির। ওপারে ষাট টাকা চালের মন আজকাল।
ফজলে রব্বি বিমূঢ়ের মতো বসে রইল। খুন করে উধাও হয়েছে কান্তরাম, উপোস করছে। ফুলমণি। দুটোই এত অসম্ভব, এমন অবিশ্বাস্য যে একটা অস্ফুট শব্দ পর্যন্ত বেরুল না ফজলে রব্বির মুখ দিয়ে। সেই ভীরু দুর্বল কান্তরাম মানুষ খুন করেছে আজ। মুমূর্য দোস্তের কাছে কসম খেয়ে যার দায় সে মাথা পেতে নিয়েছিল, আজ না খেয়ে উপোস করছে সেই মেয়ে।
এই দিনদুপুরেও ফজলে রব্বির কানের কাছে ঝিঝি ডাকতে লাগল, আরও ঝাপসা হয়ে এল ঝাপসা চোখের দৃষ্টি। তাহের তাহেরই ঠিক বলেছিল। কলমা পড়িয়ে ওই মকবুলের সঙ্গেই বিয়ে দেওয়া উচিত ছিল ফুলমণির। হিন্দুস্থানির সঙ্গে মেয়েটাকে অমন করে বলি দেওয়ার চাইতে তাকে সুখী করলেই বন্ধুর কাছে প্রতিজ্ঞার মর্যাদা বজায় থাকত তার। ভালো ছেলে মকবুল, চরিত্রবান, জমিজিরেত সব আছে, শুধু জাতের জন্য মেয়েটাকে নিজের হাতে জবাই করেছে সে—ভালো করতে গিয়ে ঠেলে দিয়েছে সর্বনাশের মুখে উঠে দাঁড়াতে চাইল ফজলে রব্বি, ইচ্ছে করতে লাগল ছুটে গিয়ে গলাটা চেপে ধরে কান্তরামের।
আমি চলি বুড়ো মিয়া। মকবুল বিদায় নিয়ে গেল।
একটা অসহ্য জ্বালায় ফজলে রব্বি জ্বলতে লাগল। উপায় করতে হবে যে করে হোক, বাঁচাতে হবে ফুলমণিকে। দরকার হলে আবার তাকে ফিরিয়ে আনবে পাকিস্তানে। এবার তার নিজের মেয়েকে সে তার জাতের হাতে তুলে দেবে, যাতে তার ভালো হয় তা-ই সে করবে।
সে কলমা পড়িয়েই হোক আর যে উপায়েই হোক।
বিকেল বেলায় তাহরেকে সে ডাকল।
আমন চাল পৌঁছে দিয়ে আসতে হবে।
আমন চাল! কোথায়?
ওপারে, শহরে। ফুলমণিকে দিয়ে আসবি।
শুনে বার কয়েক খাবি খেল তাহের।
তুমি কি খেপে গেলে আব্বাজান?
খেপব কেন? ফজলে রব্বি চটে উঠল, যা বলছি তাই করবি। দিয়ে আসবি চাল।
তাহের করুণার হাসি হাসল, কী পাগলামি করছ? চাল নিতে দেবে কেন ওপারে?
বোকা ভুললাচ্ছিস আমাকে? এত তোক নিয়ে যাচ্ছে—চোরাকারবার করছে চালের, আর তুই পারবি না? নাহয় আট গন্ডা পয়সা গুঁজে দিবি হাতে।
তাহের আবার সহিষ্ণু করুণার হাসি হাসল, দিনরাত তো ঘরেই বসে আছ আব্বাজান, দুনিয়ার হালচালের কোনো খবর রাখ না। আনসার আর ফৌজের ঘাঁটি বসেছে খেয়াঘাটের ধারে। এক দানা ধান-চাল নিতে দেবে না ওপারে।
ফৌজের ঘাঁটি! ফজলে রব্বি ম্লান হয়ে রইল কিছুক্ষণ। বেশ তো, তা হলে রাতের অন্ধকারে…
আস্তে, আস্তে আব্বা! কারুর কানে গেলে ফাটকে যেতে হবে। তাহের সভয়ে বললে, রাতের অন্ধকারে? কিছু বোঝ না তাই বলছ এসব কথা। ও-চেষ্টা করতে গেলে ফৌজের গুলিতে মাথার খুলি উড়ে যাবে। আইন হয়ে গেছে—সাঁঝের পরে খেয়া পেরুনো একদম বারণ।
আইন থাকলে বেআইনও আছে। তর্ক করিসনি আমার সঙ্গে। নিরুপায় ক্রোধে ফজলে রব্বি প্রায় চেঁচিয়ে উঠল, আমি বলছি তোকে নিয়ে যেতে হবে।
অসম্ভব কথা বোলো না আব্বাজান। আধমন চালের জন্যে আমি জান দিতে পারব না। তাহের আর কথা বাড়াল, সংক্ষেপে নিজের বক্তব্য পেশ করে দিয়ে সরে গেল সামনে থেকে।
ফজলে রব্বির মুখের রেখাগুলো কঠিন হয়ে আসতে লাগল আস্তে আস্তে।
কিন্তু ফজলে রব্বিও পারল না।
পরের দিন রাত প্রায় দুটোর সময় যখন কাঁধে আধমন চালের বোঝা নিয়ে খোঁড়া বুড়ো ফজলে রব্বি খেয়াঘাট থেকে প্রায় আধ মাইল দূরে আঘাটায় নেমেছে নদী পার হওয়ার জন্যে, তখন তার মুখের ওপর এসে পড়ল কড়া টর্চের আলো। হাঁটুসমান কালো জলের মধ্যে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল সে।
