তাহের চলে গেল। কিন্তু যে-দৃষ্টিতে তাকিয়ে গেল, সে-দৃষ্টি জিকরিয়ার চোখের। ঠিক কথা, তামাম দুনিয়াজুড়ে শয়তানের দেওয়ানি কায়েম হয়েছে। কেউ বাদ নেই, কোথাও বাদ নেই। বাইরের খ্যাপা কুত্তাগুলোকে তাড়িয়ে দেওয়া চলে, কিন্তু ঘরের দাওয়াতে যখন গোমা সাপে গর্ত করে বসে আছে, তখন যত তাড়াতাড়ি দায় চুকিয়ে দেওয়া যায় ততই ভালো।
হ্যাঁ, কান্তরাম। ভালোই হবে। দয়ালেরই স্বজাতি। দেখতে-শুনতেও মন্দ নয় ছোকরা, সুখীই হবে ফুলমণি। হিন্দুস্থানে পালাতে চাইছে কান্তরাম—তা পালাক। একেবারে চোখের আড়াল হয়ে যাবে মেয়েটা, একথা ভাবতে গেলেও মোচড় দিয়ে ওঠে বুকের ভেতরে। কিন্তু নিজের চেনা, নিজের জানা মানুষগুলোর মধ্যে গিয়েই নিশ্চিন্ত হোক মেয়েটা, দু-দন্ড স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচুক। ফুলমণি তার নিজের মেয়ে হলেও এর চাইতে বেশি কী আর দোয়া সে চাইতে পারত আল্লা রহমানের কাছে?
না, কান্তরামের সঙ্গেই বিয়ের ব্যবস্থাটা করে ফেলতে হবে। সম্ভব হলে আজকালের মধ্যেই। নইলে চট করে কোন দিন হিন্দুস্থানে সরে পড়বে তার ঠিকঠিকানা নেই কিছু।
নেবা কোটায় একটা টান দিয়ে নামিয়ে রাখল ফজলে রাব্বি। পোড়া টিকে আর তামাকের ছাই ঝাড়তে লাগল দাওয়ার নীচে।
ডেকেছেন বুড়ো মিয়া?
কান্তরাম ভয়ার্ত ভঙ্গিতে এসে দাঁড়িয়েছে দাওয়ার নীচে। একটু এদিক-ওদিক দেখলেই হাত কচলাতে শুরু করবে যেন। দেশভাগ হয়ে যাওয়ার পর সব হিন্দুর চোখেই ওইরকম একটা উদভ্রান্ত বিহ্বলতা লক্ষ করেছে ফজলে রব্বি। যেন কোথা থেকে কেউ মস্ত একটা ডাণ্ডার ঘা দিয়ে খুঁড়িয়ে দিয়েছে ওদের শিরদাঁড়াগুলো, ওদের কলিজার রক্তটুকু শুষে খেয়ে নিয়েছে কেউ। দিনেদুপুরে আচমকা বেরিয়ে-পড়া শেয়াল যেমন পালাবার জন্য ঝোপঝাড় সন্ধান করে বেড়ায়, ওরাও ঠিক সেইরকম সবসময় একটা লুকোবার জায়গা খুঁজে ফিরছে।
বিশ্রী লাগে, কেমন সহজভাবে কথা বলতে পারা যায় না ওদের সঙ্গে। মিষ্টি করে বললে সন্দেহ করে, চোখ রাঙালে আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। সত্যিই ওদের ঘৃণা করা যেন আর অন্যায় নয় এখন।
ফজলে রব্বি জাকুটি করল।
দাঁড়িয়ে রইলে কেন? বসো।
জড়োসড়ো ভঙ্গিতে একটা চৌপাই টেনে নিলে কান্তরাম।
চলে যাচ্ছ বুঝি ঘরবাড়ি ছেড়ে?
কান্তরাম মাথা নীচু করে রইল, জবাব দিলে না।
তা যাও। সাত পুরুষের ভিটেমাটি ছেড়ে মরতে যাও যেখানে খুশি! ফজলে রব্বি আর এক বার কুটি করল, কিন্তু এই বুড়োর একটি আর্জি আছে তোমার কাছে।
আর্জি! হকচকিয়ে উঠল কান্তরাম, আর্জি কি বুড়ো মিয়া! হুকুম করুন।
থামো! পাকামি কোরো না। ফজলে রব্বি একটা ধমক দিলে। দয়াল মন্ডলের মেয়ে ফুলমণিকে দেখেছ তো?
দেখেছি। সবিস্ময়ে মাথা নাড়ল কান্তরাম।
কেমন মেয়ে?
তা, তা মন্দ কী! কান্তরাম গোটা দুই ঢোঁক গিলল। প্রশ্নটার কোনো অর্থবোধ করতে না পেরে তাকিয়ে রইল বোকা বোকা শঙ্কিত দৃষ্টিতে।
ফুলমণিকে তোমার বিয়ে করতে হবে।
কী বললেন? কান্তরাম ভয়ানকভাবে চমকে গেল এবারে।
অমন হাঁ করছ কেন! আমি কি রসগোল্লা গিলতে বলছি নাকি? খাসা মেয়ে ফুলমণি, আমার নিজের বেটির মতোই দেখি ওকে। ঘরে নিলে বর্তে যাবে। তোমাদের যা পাওনা থোওনা সব আমিই দেব, সেজন্যে কিছু আটকাবে না তোমার।
আজ্ঞে তা বটে, তা বটে। কান্তরাম মাথা নাড়তে লাগল, কিন্তু…
কিন্তু আবার কী? হিন্দু, তোমার সজাতি, কিন্তু কোথায় এল এর ভেতরে?
দৃষ্টি তীক্ষ্ণকরে ফজলে রব্বি জানতে চাইলে।
আমি বলছিলাম… কান্তরাম ঢোঁক গিলল, ওদের নীচু ঘর, আমাদের সঙ্গে ঠিক…
চোপরাও! জিকরিয়া আর তাহেরের ওপরে সঞ্চিত ফজলে রব্বির যা কিছু ক্রোধ দ্বিগুণ বেগে ফেটে পড়ল কান্তরামের ওপর। নীচু ঘর! জাতের বড়াই হচ্ছে। ওই করেই মরতে বসেছ তোমরা! খেয়াল থাকে যেন এটা পাকিস্তান। এখন যদি মাটিতে চিত করে ফেলে। খানিক গোস্ত ঠেলে দিই, জাতের গরমাই কোথায় থাকবে তখন?
আতঙ্কে বিবর্ণ হয়ে গেল কান্তরাম। পাথরের মতো শক্ত হয়ে বসে রইল চৌপাইটার ওপরে।
জাত জাত! অসহ্য জ্বালায় দাঁতে দাঁত ঘষতে লাগল ফজলে রব্বি। আজ যদি গুণ্ডারা এসে মেয়েটাকে লোপাট করে নিয়ে যায়, জাতের মান বাড়বে তোমার? যদি জোর করে মুসলমানদের সঙ্গে ওর বিয়ে দিই, হিদুর মুখ উজ্জল হবে? ডরপোক জানোয়ারের দল। একটা মেয়ের ইজ্জত বাঁচাবার সাহস নেই, জাতের বড়াই। সাধে কি তোমাদের ঠেঙিয়ে দূর করে দিতে চায় পাকিস্তান থেকে!
নিষ্প্রাণ কান্তরাম নড়ে উঠল এবার। থরথর করে কাঁপতে লাগল বাঁশপাতার মতো। তার হাত দুটোকে জড়ো করে আনল কোনোক্রমে। প্রায় নিঃশব্দ আবছা গলায় বললে, মাপ করুন। আপনি যা বললেন, তাই করব।
পুরো একটা বছর হয়ে গেছে তারপর।
আর একটু বুড়ো হয়ে গেছে ফজলে রব্বি, খোঁড়া পা-খানাকে টেনে চলতে আরও বেশি কষ্ট হয় আজকাল। তাহেরের হাতে তুলে দিয়েছে ঘরসংসার খেতখামারের ভার। শূন্য দাওয়ায় বসে বসে ঝিমোনো ছাড়া আর কোনো কাজ নেই আজকাল। এক-এক বার ইচ্ছে করে এই শেষ বয়সে হজটা এক বার ঘুরে আসে, কিন্তু উৎসাহ হয় না, ভরসা জাগে না দুর্বল অশক্ত দেহটার ওপরে।
ঝিমঝিমে স্তব্ধ দুপুরে নেশা-জড়ানো চোখে চুপ করে বসে থাকে দাওয়াটার ওপরে। কানে আসে শালিকের কচকচি, ঝিরঝিরে হাওয়ায় সামনের নিম গাছ থেকে ঝুরজুরিয়ে পাতা ঝড়তে থাকে; আর ওই ঝরা পাতাগুলোর মতোই বোধ হয় জীবনকে—তার দিনগুলো যে কখন অমন করে ঝরে গেছে, ভালো করে যেন মনেও পড়ে না সেসব।
