চিরকালের চেনা মানুষগুলো যখন এক-এক করে পর হয়ে গেল, বুকের ভেতরে তখন মোচড় দিয়ে উঠেছিল বই কী। তবু মনে হয়েছিল একদিক দিয়ে এ ভালোই হয়েছে। কাগজের পাতায় আর লোকের মুখে উড়ো উড়ো ভাবে যখন কলকাতার খবর আসত, খবর আসত কাফেররা কীভাবে সাবাড় করে দিচ্ছে মুসলমানের ধন-প্রাণ-ইজ্জত, তখন খাঁটি মুসলমান ফজলে রব্বিও কি রক্তের মধ্যে একটা চঞ্চলতা অনুভব করত না? আগুন-ঝরানো ভাষায় মসজেদে মোক্তবে মৌলবিসাহেবরা যখন ওয়াজ করে যেতেন, তখন সে-আগুনের তাপ কি তাকেও এসে স্পর্শ করত না? তার চাইতে এই-ই ভালো হয়েছে। ওরা থাক হিন্দুস্থান নিয়ে, পাকিস্তান নিয়ে খুশি থাক মুসলমান। কারও গায়ে কেউ এসে পড়বে না, যার যত ইচ্ছে বাজনা বাজাক আর যত খুশি কোরবানি করুক। কোনো ঝামেলা নেই।
তবু ঝামেলা বেঁধেছে ফুলমণিকে নিয়ে।
দয়াল মারা যাওয়ার পরে তার জমিজিরেত ফজলে রব্বিই তদারক করত। মেয়েটাকে দেখবার জন্যে ভিন-গাঁ থেকে এসেছিল তার এক বিধবা মাসি। মোটের ওপর নিশ্চিন্তেই কাটছিল দিনগুলো। কিন্তু আট বছরের ফুলমণি যখন সতেরো বছরে পড়ল, তখন একদিন ওলাবিবির নেকনজরে পড়ে চোখ বুজল মাসি। আর সেই থেকে মুখের প্রতিটি গ্রাস তেতো হয়ে উঠল ফজলে রব্বির। একা ঘরে থাকে মেয়েটা, একা ঘাটে জল ভরে। তারই সুযোগ নিয়ে শুরু হয়েছে ভূতের উৎপাত। দিনদুপুরে বাড়ির সামনে কে গান গেয়ে ওঠে, পুকুরপাড়ের ভাঁট ঝোঁপের আড়াল থেকে চড়া গলায় শিস টানে রাতবিরেতে, টর্চের আলো পিছলে পড়ে উঠোনে দাওয়ায়।
এই তো কাল সকালে ফুলমণি এসে বললে, চাচা, আর তো ঘাটে যেতে ভরসা পাই না।
কেন, কী হয়েছে? নড়েচড়ে বসল ফজলে রব্বি।
পানু মোল্লার বড়োছেলে জিকরিয়া আজ দু-দিন থেকে ছিপ নিয়ে ঘাটে বসছে। আর যা তা বলছে আমাকে।
জিকরিয়া! অসহ্য ক্রোধে ফজলে রব্বির সারা গা জ্বলে উঠল। এক নম্বরের বদমায়েশ, একটা মেয়েচুরির হাঙ্গামায় কিছুদিন আগেও দু-বছর হাজত খেটে এসেছে। এতদিন চোরের মতো লুকিয়ে বেড়াত, হালে আবার বড় বাড় বেড়েছে ওর। নাঃ, এক বার দেখতে হচ্ছে।
খোঁড়া পা-খানাকে টেনে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল ফজলে রব্বি, আয় আমার সঙ্গে। ঘাটে তখনও ছিপ ফেলে বসে ছিল জিকরিয়া ওরফে জ্যাকেরিয়া। ওদের আসতে দেখে ভ্রূক্ষেপমাত্র করল না, তাকিয়ে রইল ফাতনার দিকে।
বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল ফজলে রব্বি। ভেবেছিল তাকে দেখে উর্ধ্বশ্বাসে পালাতে পথ পাবে না জিকরিয়া। কিন্তু আশ্চর্য দুঃসাহস, অবিশ্বাস্য স্পর্ধা ছোকরাটার!
নিজেকে সামলে নিয়ে ফজলে রব্বি বললে, জিকরিয়া!
মাথা না তুলে জিকরিয়া সাড়া দিলে, কী বলছ?
ছিপ নিয়ে বসেছিস কেন মন্ডলের পুকুরে?
মাছ ধরব। শান্ত নিস্পৃহ স্বর জিকরিয়ার।
কিন্তু পরের পুকুরে মাছ ধরতে কে হুকুম দিয়েছে তোকে?
পাকিস্তানে হিন্দুর কোনো সম্পত্তি নেই, সব মুসলমানের।
ফজলে রব্বি এইবার ফেটে পড়ল।
চুপ কর হারামজাদা বদমায়েশ! তোদের মতো শয়তানের জন্যেই পাকিস্তানের এত বদনাম। উঠে যা বলছি এক্ষুনি, উঠে যা।
আকস্মিক বিস্ফোরণে বিভ্রান্ত হয়ে ছিপ গুটিয়ে উঠে দাঁড়াল জিকরিয়া। কিন্তু তার দু-চোখে আগুন ঝিলমিল করতে লাগল।
অত চোখ দেখিয়ে না মিয়া, এ তোমায় বলে দিচ্ছি।
কী করবি, কী করবি তুই? হতভাগা শয়তান! খোঁড়া পা নিয়েই হিংস্র ক্রোধে জিকরিয়ার দিকে এগোতে লাগল ফজলে রব্বি, ফের এদিকে এগোবি তো মাথা গুঁড়িয়ে দেব।
জিকরিয়া পিছু হটতে লাগল। তার সমস্ত মুখ যেমন কুটিল তেমনি ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। কাফেরের পক্ষ নিয়ে তুমিও বড়ো বেশি মাথা ঘামাচ্ছ মিয়া। কিন্তু অত বাড়াবাড়ি ভালো নয়। আমার মাথা গুঁড়োবার ভয় দেখাচ্ছ, কিন্তু অমন করে চোখ রাঙালে তোমার ভালো হবে না।
এরপরে একমাত্র হাতের লাঠিটা তুলেই ছুড়ে মারতে পারত ফজলে রব্বি। করতে যাচ্ছিলও তাই, কিন্তু তার আগেই বুদ্ধিমানের মতো উধাও হয়েছে জিকরিয়া। অদৃশ্য হয়েছে। যথাসম্ভব দ্রুতবেগে।
হারামজাদা! নিরুপায় ক্রোধে ফজলে রাব্বি দাঁত কিড়মিড় করল এক বার, বিষাক্ত চোখে তাকাল ফুলমণির দিকে, কাল থেকে ঘাটে আসবার সময় আমায় ডাকবি তুই।
কিন্তু এমন করে কতদিন আগলে রাখা যাবে? শয়তানের মওকা পড়েছে চারদিকে। মানুষের আরজ আর খোদার দরবারে গিয়ে পৌঁছোয় না। সাচ্চা লোকের জান-মান কিছুই আর থাকবে না বলে সন্দেহ হয়। রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে গেছে পাপ, মজ্জায় মজ্জায় বাস্তু বেঁধেছে বেইমানি। খোঁড়া পা দিয়ে বুড়ো ফজলে রব্বি কতদিন লড়তে পারবে? লড়তে পারবে ক জনের সঙ্গে?
নইলে তাহের—তার নিজের ছেলে তাহের! সেই কিনা বলতে পারল কথাটা।
ফুলমণির শাদি নিয়ে এত ভাবনা কেন আব্বাজান? দিয়ে দাও-না আমাদের মকবুলের সঙ্গে। কথাটা শুনতে পায়নি, এমনই বিহ্বল ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল ফজলে রাব্বি। তাহের আবার শুরু করল, কালই কলমা পড়িয়ে, উকিল ডেকে…।
কথাটা শেষ হতে পারল না। তার আগেই ফজলে রব্বির ডান পায়ের চটিটা বাজের মতো গিয়ে উড়ে পড়ল তাহেরের গালে। একটা টাল খেয়ে পড়তে পড়তে সামলে নিলে তাহের।
কমবখত, উল্লুক! ফের যদি এসব তোর মুখে শুনতে পাই তাহলে পঁচিশ পয়জার লাগিয়ে বাড়ি থেকে দূর করে দেব।
