এদিক থেকে তাদের নিয়মকানুন বরং অনেকটা ভালো। নিতান্ত চাষাভুসোর ঘরেও ন বছর হতে-না-হতে পর্দা হয়ে যায় মেয়েদের, অনেকখানি আড়াল থাকে শকুনগুলোর চোখ থেকে। কিন্তু হিন্দুর ঘরের বেটি, নটখট করে সব জায়গায় বেরুনো চাই। গাঁয়ের যে বখা বাঁদরগুলো আগে তটস্থ হয়ে থাকত ভয়ে, ইদানীং যেন সাপের পাঁচখানা করে পা দেখেছে। তারা। কিছুদিন থেকেই এ রাস্তায় তাদের আসা-যাওয়া অকারণে বেড়ে উঠেছে। কবে রাতারাতি কী হয়ে বসবে ঠিক নেই। তার চাইতে…
ছেলে তাহের একখানা গোরুর গাড়ি নিয়ে বেরোচ্ছিল। ফজলে রব্বি তাকে ডাকল।
হ্যাঁ রে, কোন দিকে চললি?
সাপাহার হাটে যাব বা-জান। ধান আনতে হবে আজ।
ভালোই হল। যাওয়ার সময় কান্তরামকে ডেকে দিবি এক বার।
কান্তরাম? তাহের এক বার চোখ মিটমিট করল, সে তো শুনছি হিন্দুস্থানে পালাবার ফিকির খুঁজছে। তাকে কেন?
ফজলে রব্বি চটে উঠল, সব কথার জবাবদিহি করতে হবে নাকি তোকে? যা বললাম তাই করবি।
আচ্ছা। মুখ গোঁজ করে তাহের গাড়িতে গিয়ে উঠল। চাপা ক্রোধে একটা নির্দোষ গোরুর ওপরেই সবেগে চালিয়ে দিলে শাঁটাটা। একরাশ ধুলো উড়িয়ে মেহেদি-বেড়ার আড়ালে গাড়িটা অদৃশ্য হল।
বিরক্ত হয়ে হুঁকো নামাল ফজলে রব্বি। সত্যি সত্যিই মেয়েটা তার গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে। নিজে বুড়ো হয়ে পড়েছে, তার ওপরে একটা পা তার খোঁড়া। এমনিতেই অশক্ত মানুষ, সবসময়ে আগলে আগলে রাখা সম্ভব নয় তার পক্ষে। তা ছাড়া পট করে একদিন যদি মরে যায়, তাহলে যে মেয়েটা অথই জলে পড়বে এ সে দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছে। হাঙর কুমির চারদিকে মুখিয়ে তো আছেই, তার নিজের ছেলে তাহেরের মতিগতিও খুব সুবিধে বলে মনে হচ্ছে না। তাই বেঁচে থাকতে থাকতে কোনো বেইমানি ঘটবার আগেই মেয়েটার একটা সুরাহা সে করে দিয়ে যাবে।
বন্ধু!
কথাটা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন সুতোয় টান পড়ল একটা; আর সেই টানে পুতুলবাজির মতো কতগুলো পেছনের দিন সামনে এসে দাঁড়াল। পাশাপাশি বাড়িতে থাকত, পাশাপাশি জমিতে চাষ করত দুজন, তার হাত থেকে হুঁকো নিয়ে তাতে একটা নল বসিয়ে টান লাগাত দয়াল মন্ডল। বন্ধু বই কী! অমন বন্ধু কারও হয় না, কারও কোনোদিন হয়নি।
তারপর ঝড়ের রাত এল! সে-ঝড় আকাশ ভেঙে ঝরে পড়ল না, মাটি খুঁড়ে উঠে এল। সমস্ত রাত ধরে লালমাটির মাঠজুড়ে ডুম ডুম করে মেঘের ডাকের মতো বাজতে লাগল। সাঁওতালের নাগারা-টিকারা। বাঘের জিভের মতো সড়কি-বল্লম-টাঙ্গির ফলা।
আগস্ট আন্দোলন। নামটা ভোলবার কথা নয়, কলিজার ভেতর গাঁথা হয়ে আছে আগুনের হরফে। সেদিনের লড়াইয়ের ডাকে দয়াল মন্ডল ঝাঁপ দিয়ে পড়ল, ফজলে রব্বিও পেছনে পড়ে থাকল না। প্রথম দুটো দিন কাটল অবিচ্ছিন্ন জয়ের গৌরবে। শহর দখল হয়ে গেল। থানার বাবুরা, মহকুমা হাকিম, কে যে কোন দিকে পালিয়ে বাঁচল তার হদিশ পর্যন্ত পাওয়া গেল না। মনে হল ইংরেজ সরকার ফৌত হয়ে গেছে, কায়েম হয়েছে গরিবের মালিকানা, দেশের মানুষ তার দেশের মাটি ফিরে পেয়েছে।
কিন্তু তিন দিনের দিন এল ফৌজ। একটা টিলার দু-ধারে জমায়েত হল দু-দল। এপার থেকে যখন সড়কি-বল্লম নিয়ে হাজার মানুষ ঝাঁপ দিয়ে পড়ল, ওপার থেকে তখন তার জবাব দিলে কয়েকশো বন্দুক। সে-বন্দুকের সামনে টাঙ্গি-বল্লম শুকনো পাতার মতো ঝরঝর করে ঝরে পড়ল, সেইসঙ্গে বুক চেপে পড়ে গেল দয়াল মন্ডল।
হাঁটুতে গুলি খেয়ে তার পাশেই বসে পড়েছিল ফজলে রব্বি। মরবার আগে দয়াল মন্ডল তার হাত ধরল।
আমার বেটিটাকে দেখো দোস্ত। ওর আর কেউ নেই। ওর ভার তোমার হাতেই দিয়ে গেলাম।
সেই থেকেই ফুলমণির দায় ফজলে রব্বির ওপরে এসে পড়েছে। তারপর অনেক জল গড়িয়ে গেল কাঞ্চন নদীর ওপর দিয়ে। যে-আজাদির জন্যে অতগুলো মানুষ অমন করে প্রাণ দিলে, যার জন্যে অতগুলো মানুষকে অমন করে চাবুক মারা হল, জ্বালিয়ে দেওয়া হল গ্রামের পর গ্রাম, কেরোসিন তেল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হল ধানের গোলা, সেই আজাদি একদিন না-চাইতেই দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল। বাও নেই, বাতাস নেই, অথচ ভাদ্র মাসের পাকা তাল যেমন টুপ করে পড়ে যায়, তেমনি করে আজাদি এসে পৌঁছাল।
ভারি তাজ্জব লেগেছিল গোড়াতে। পাকিস্তানের কথা শোনা আছে অনেক বার, ইউনিয়ন বোর্ডের ব্যাপারে ভোটও দিয়েছে লিগের লোককে, কিন্তু পাকিস্তান যে এমন বিনা নোটিশে মুঠোর মধ্যে চলে আসবে, কে ভেবেছিল সেকথা।
এসেছে ভালোই হয়েছে। মুসলমানের মাটি, মুসলমানের তমদুন! কোথাও কোথাও এ নিয়ে খুব দাঙ্গাফ্যাসাদও হয়েছে হিন্দু-মুসলমানে, সেকথাও অজানা নেই ফজলে রব্বির। কিন্তু ওসব দাঙ্গার আঁচ কখনো এসব তল্লাটে লাগেনি। কখনো-সখনো মৌলবিরা গরম গরম বক্তৃতা শুনিয়ে গেছে বটে, কিন্তু লোকে ঝিমুতে ঝিমুতে সেসব কথা শুনেছে, কখনো কান পাতেনি। কিন্তু সত্যি সত্যিই পাকিস্তান হয়ে গেল। নদীর ওপার থেকে ঝাঁকবেঁধে আসতে লাগল মুসলমান, এপার থেকে দলবেঁধে পালাতে লাগল হিন্দু। বোঝা গেল রাতারাতি পালটে গেছে দুনিয়ার হালচাল। কিন্তু মনে মনে কিছুতেই একটা জিনিসের ফয়সালা করতে পারল না ফজলে রব্বি। আজাদির জন্যে যে-মাটিতে দয়াল মন্ডল তার বুকের তাজা রক্ত ঝরিয়ে দিলে—সেই মাটিই তার রইল না, সে হল ভিন দেশের বাসিন্দা।
