সায়েবটা বললে, হোয়াট?
আমি ঝাঁ করে মস্ত হাঁড়িটা খুলে একখানা পাটালি গুড় বের করে ফেললুম। বললুম, এইটে খেয়ে দ্যাখো তো একবার।
পাটালির দিকে জুলজুল করে তাকালে সায়েব।
ইণ্ডিয়ান চকোলেট?
হাঁ, ইণ্ডিয়ান চকোলেট।
–নট বাইট?
–ইট নট বাইট। ইউ বাইট ইট। মানে এ কামড়ায় না–তুমিই একে কামড়াতে পারো।
সায়েব পাটালি নিয়ে খানিকটা কী ভাবলে। দিলে এক কামড়–তারপর আর-এক কামড়। তারপর, তোমায় কী বলব প্যালারাম হঠাৎ ছুটে এসে আমায় জাপটে ধরলে, আর লা-লা-লা-লা বলে আমার হাত ধরে সেই চলতি গাড়ির মধ্যে নাচতে আরম্ভ করলে।
যত বলি, ছাড়ো ছাড়ো–মারা গেলুম, সে কি ছাড়ে। পাক্কা দশটি মিনিট নিজে নাচলে–আমাকে নাচালে। আমার তখন কোমর টন-টন করছে, মাথা বনবন করছে। যখন ছাড়লে তখন আমি প্রায় ভিরমি লেগে বসে পড়লুম বেঞ্চির ওপর।
এরমধ্যে সায়েব পাটালিখানা বেমালুম সাবড়েছে। বললে, ওঃ–কী জিনিস খাওয়ালে। জীবনে এমনটি আর কোনও দিন খাইনি। কোথাও লাগে এর কাছে চকোলেট কেক-জ্যাম-জেলি! আর আছে?
দিলুম আর-একখানা।
দেখে বললে, ফুল ওয়ান হাঁড়ি? মানে–এক হাঁড়ি ভর্তি!
বললুম, হ্যাঁ, ফুল ওয়ান হাঁড়ি। আমার মেয়ে ফুটকির জন্যে নিয়ে যাচ্ছি।
–আই ডোন্ট নো ফুটকি কমা-সেমিকোলন। এই হাঁড়িটা আমি নেব-তুমি আমাকে এটা প্রেজেন্ট করো।
এই সেরেছে। পুরো দশসের নলেন পাটালি-পঁচিশ টাকা দাম নিয়েছে। ইণ্ডিয়ান সুইটের বড়াই দেখাতে গিয়ে আচ্ছা ফ্যাচাঙেই পড়েছি তো। আমি কাতর হয়ে বললুম, দু-একখানা নিতে চাও তো নাও সায়েব, কিন্তু মাই ডটার, মানে আমার মেয়ে ফুটকি
–নো ফুটকি-নো সেমিকোলন। এ-হাঁড়ি আমায় দিতেই হবে।
পড়েছি মিলিটারির পাল্লায়। এমনিতে না দিলে তো জোর করে কেড়ে নেবে। সত্যি বলতে কি, আমার কান্না পেল।
আমার মুখ দেখে বোধ হয় সায়েবের দয়া হল। বললে, মন খারাপ কোরো না বাবু। এমনি নেব না। আমিও এর বদলে কিছু প্রেজেন্ট করব তোমাকে।
কী প্রেজেন্ট করবে? আমি নড়ে উঠলাম। আমার মামাতো ভাইয়ের ছেলে ভ্যাবলা এক মিলিটারি সায়েবকে ভজিয়ে একটা ক্যামেরা বাগিয়েছে। আমারও আশা হল–নির্ঘাত দাঁও মারব একটা।
সায়েব বললে, আমার হাতের এই ঘড়িটা দেখেছ? দুশো ডলার দাম। পছন্দ হয়?
সোনার ঘড়ি–কী তার জেল্লা! আমার বুকের ভেতর হাঁকুপাঁকু করে উঠল। বললুম, আলবাত! খুছ পছন্দ হচ্ছে।
সায়েব আস্তে-আস্তে মাথা নাড়লে।
উঁহু, এত তুচ্ছ জিনিস দিয়ে তোমার এমন আশ্চর্য ইণ্ডিয়ান সুইটসের দাম শোধ হয়। আমার এই আংটিটা দেখছ?
–দেখছি?
হীরে বসানো আছে। হাজার ডলার দাম। পছন্দ হয়?
পঁচিশ টাকার গুড়ের বদলে হাজার ডলার! আমি অজ্ঞান হতে হতে সামলে গেলুম বলতে গেলে, তিনবার খাবি খেয়ে বললুম, খুবই পছন্দ সায়েব। তুমি ওটাই দাও।
সায়েব আংটিটা খুলতে যাচ্ছিল, কিন্তু কী ভেবে থেমে গেল আবার। বললে, উঁহুনানা! তোমার সুইটসকে এত সামান্য দাম আমি দিতে পারি না–অপমান করা হয়–তারপর অনেকক্ষণ ধরে ভাবলে। একটা মস্ত বড় নিঃশ্বাস ফেললে শেষকালে।
বললে, না, এসব নয়। তোমাকে আমি এমন জিনিস দেব, যা পৃথিবীতে আমার সবচেয়ে প্রিয়, পেলে আমি সব ভুলে যাই-যা আমার চোখের আলো–মনের আশা–মুখের ভালো–বুকের মালা–তাই আমি তোমায় দিয়ে যাব। দিতে প্রাণ আমার চাইছে না, কিন্তু তোমার এই ইণ্ডিয়ান সুইটসের বদলে তা ছাড়া কী-ই বা আমি দিতে পারি।
বলে কিছুক্ষণ কেমন ভাবুক-ভাবুক হয়ে বসে রইল, যেন কেঁদে ফেলবে এমনি মনে হল আমার। গাড়ি তখন একটা বড় ইস্টিশানে এসে থামছে। সায়েব উঠে দাঁড়ালে। কাঁধের মস্ত ভারি খাকী ঝোলাটা আমার হাতে দিয়ে বললে, নাও-এর মধ্যে সে জিনিস আছে। এর তুলনা নেই–এর মতো প্রিয় আমার আর কিছু নেই। অনেক আশা করে যোগাড় করেছিলুম-আবার কবে পাব কে জানে! যাই হোক তোমার ইণ্ডিয়ান চকোলেটের বদলে এই যৎসামান্য উপহার তোমায় দিলুম। আমায় মনে রেখো, বাই বাই
বলেই, আমার পাটালি গুড়ের হাঁড়িটা কাঁকালে তুলে নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে গেল। যুদ্ধের সময় স্টেশন ভর্তি মিলিটারি ঘুরছে–কোথায় যে মিলিয়ে গেল কে জানে।
ওই মস্ত বড় ঝোলাটা কোলে নিয়ে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। বুকের ভেতর হাঁকুরপাঁকুর চলছে! কী দিয়ে গেল কে জানে! সংসারে ওর সবচেয়ে প্রিয় জিনিস–চোখের আলো–বুকের মালা–কত কী বললে! হয়তো লাখ টাকার হীরে-মোতিই হবে।
ট্রেন ছাড়লে, কাঁপতে কাঁপতে আমি থলেতে হাত দিলুম। বেশ বড় গোল মতন কী-একটা রয়েছে। সেই যে অতিকায় মুক্তোর বিবরণ পড়ি–তাই নাকি?
দেখলুম, বেশ যত্ন করে খবরের কাগজ দিয়ে জড়ানো। আমি টেনে বার করলুম। প্রাণ-পাখি তখন আশা-আনন্দে প্রায় খাবি খাচ্ছে। পঁচিশ টাকার পাটালি গুড়ের বদলে বোধ হয় পেলুম লাখ টাকার জিনিস!
খুলে দেখলুম–কী দেখলুম জানো প্যালারাম! মাঝারি সাইজের একটা কুমড়ো! একটা নিটোল নির্ভেজাল কুমড়ো!
এই তা হলে ওর চোখের আলো মুখের ভালো! ছআনা দামের একটা কুমড়ো গছিয়ে আমার পঁচিশ টাকার পাটালি গুড় মেরে দিলে। তোমায় বলব কি প্যালারাম, আমি তখুনি সেই শোকে–একেবারে অজ্ঞান হয়ে গেলুম।
ভজকেষ্টবাবু থামলেন। করুণ গলায় বললেন, জানো প্যালারাম–সেই থেকে আমি কুমড়ো ছুঁই না, কুমড়ো দেখি না। আর দেখলেই পঁচিশ টাকার পাটালির শোক আমার উথলে ওঠে।
সীমান্ত
দাওয়ায় বসে চিন্তিত মুখে হুকো টানছিল ফজলে রব্বি। না, আর দেরি করা উচিত নয়। এবার যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা বিয়েশাদির ব্যবস্থা করে ফেলতে হচ্ছে মেয়েটার।
