রামহরিবাবু জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমার সব বই পড়েছেন আপনি?
–খেপেছেন আপনি!–বিড়িতে টান দিয়ে গজেন তফাদার জবাব দিয়েছিল : আমার সময় কোথায় বলুন দিকি? দিনরাত যাত্রার পার্ট মুখস্থ করেই সময় পাই না, তো বই পড়ব। দু-একখানা যাত্রার বই যদি লিখতেন স্যার, তা হলেও বা কথা ছিল।
মুহূর্তে ভারি ক্ষুণ্ণ হয়ে গেলেন রামহরিবার, ইচ্ছে করল গজেনের লম্বা লম্বা কান দুটো ধরে বেশ করে ঝাঁকিয়ে দেন। কিন্তু মনের ভাব গোপন করে বললেন, তবে আমি যে লিখি সেটা জানলেন কী করে?
–আমি কেমন করে জানব মশাই? আমাদের যাত্রার দলে যে হনুমান সাজে সেই গদাই শীল আগে কলকাতায় ছাপাখানার কম্পোজিটার ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করলাম কোনও সাহিত্যিককে চেনে কিনা! সে আপনার ‘পাতালের আগুন’ না কি একটা কম্পোজ করেছিল, প্রুফ নিয়েও গিয়েছিল আপনার বাড়িতে। তার কাছেই আপনার নাম ঠিকানা পেলাম আর কী! সে বললে, আপনি বেড়ে লেখেন–পাতালের আগুন
রামহরিবাবু বাধা দিয়ে বললেন, উঁহু, প্রলয়ের আগুন।
–ওই হল স্যার। প্রলয় হলেই সব পাতালে চলে যায় কিনা। তা আপনার বইয়ের আট-দশ পাতা সে পড়েছে, বলেছে দশ পাতাতেই নাকি আপনি দশটা খুন ঘটিয়ে দিয়েছেন। শুনে আমাদেরও আপনার ওপর খুব ভক্তি হয়েছে স্যার! দশ পাতায় দশটা খুন! আপনি স্যার, অসাধারণ লোক।
রামহরিবাবুর ইচ্ছে হয়েছিল তক্ষুনি বাড়ি ফিরে যান, কিন্তু সভাপতি হওয়ার প্রলোভনটা কম নয়। না হয় তাঁর লেখা এরা পড়েইনি, কিন্তু তাতেই বা ক্ষতি কী! বক্তৃতার চোটে মুখ দিয়ে এমন আগুন তিনি ছড়িয়ে দেবেন যে, চারদিকে দাউদাউ করে জ্বলে যাবে। এরা বুঝতে পারবে তিনি একেবারে কেউকেটা নন।
অতএব শেষ পর্যন্ত গজেনের সঙ্গে তিনি এসে নামলেন বাঁশতলা স্টেশনে।
আশা ছিল, স্টেশনে তাঁকে দেখবার জন্যে কাতারে কাতারে লোক দাঁড়িয়ে থাকবে। কিন্তু জনপ্রাণীর চিহ্ন নেই। একজন পিলে-রোগী স্টেশন মাস্টার আর জন তিনেক হেলে চাষা স্টেশনময় ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে। রামহরিবাবুর মনটা আর একবার খারাপ হয়ে গেল।
গজেন এসে বললে, দাঁড়িয়ে আছেন কেন? চলুন।
–কোথায় যেতে হবে?
–আমাদের গাঁয়ে।
–সে কোথায়?
–শিয়ালপাড়া।
–শিয়ালপাড়া! সে কদ্দূর?
–বেশি নয়, কোশ দুয়েক।
–কোশ দুয়েক? গাড়ি কই?
গজেন অবাক হয়ে গেল : গাড়ি! এ কি স্যার কলকাতা শহর পেয়েছেন? টুপ করে ট্রামগাড়িতে চাপলেন আর ঝুপ করে ধরমতলা গিয়ে নামলেন। এ স্যার পাড়াগাঁ।
–কিন্তু দু কোশ রাস্তা! হাঁটব কী করে? অন্তত একটা গোরুর গাড়ি
গোরুর গাড়ি! গজেন মুখ ভেংচে উঠল : একটা গাড়ির আজকাল ভাড়া কত জানেন? অন্তত আড়াই টাকা। কে দেবে মশাই? আপনি?
রামহরিবাবু মাথা নেড়ে জানালেন যে তিনি দেবেন না।
-তা হলে হাঁটুন, হাঁটুন। এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়াবেন না, কাছাকাছি গোটা দুই শেয়াল খেপেছে, কামড়ালেই জলাতঙ্ক।
–ওরে বাবা। লাফিয়ে উঠে রামহরিবাবু ছুটতে শুরু করেন।
গজেন চেঁচিয়ে বললে, থামুন স্যার, থামুন। অমন ঘোড়ার মতো আদাড়ে-পাদাড়ে ছুটবেন না–এখানকার জঙ্গলে আবার কেউটে সাপের আমদানি বেশি।
অ্যাঁঃ!–রামহরিবাবুর ভয়ে প্রায় শিবনেত্র হবার দাখিল।
তবু সভাপতি হবার লোভ। পঞ্চানন শিকদারকে যে করে হোক টেক্কা দিতে হবে। বেলা দুটোর সময় এক হাঁটু ধুলো নিয়ে রামহরিবাবু যখন শিয়ালপাড়ায় এসে পৌঁছুলেন তখন তাঁর প্রায় দম আটকে আসছে।
জংলা ছোট গ্রাম। কয়েকঘর গৃহস্থ, বেশির ভাগেরই দৈন্যদশা। সভাস্থলের নমুনা দেখেই সভাপতির হয়ে এল।
একটা আধভাঙা চণ্ডীমণ্ডপে চাটাই বিছিয়ে রামহরিবাবুকে বসতে দেওয়া হল। তারপর আস্তে আস্তে দু-চারজন করে ভিড় জমাতে লাগল তাঁর পাশে।
পাঠশালার বুড়ো পণ্ডিতমশাই এসে অনেকক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করছিলেন রামহরিবাবুকে। এইবার বেশ করে কেশে নিয়ে বললেন, আপনার বই আমার বড্ড ভালো লাগে স্যার। খাসা লেখা আপনার।
রামহরিবাবুর অত্যন্ত আনন্দ হল। এখানকার সবাই তা হলে গজেনের মতো নয়, দু-একজন পড়ুয়া লোকও আছে!
–আমার কী কী বই পড়েছেন আপনি?
-কেন স্যার? ব্যাকরণ-সুধা, বালক-বোধ প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ–পড়িনি কী? আহা-হা, কী চমৎকার তদ্ধিত-প্রকরণ লিখেছেন আপনি। পড়তে পড়তে আমার কান্না পেয়ে গিয়েছিল।
–কিন্তু ব্যাকরণ-ট্যাকরণ তো আমি লিখিনি।
–সে কী! আপনার নাম অশ্বপতি কাব্যচঞ্চু নয়?
কী আশ্চর্য–লোকটা রামহরিবাবুর নাম পর্যন্ত জানে না, অথচ কোন এক অশ্বপতি না অশ্বডিম্ব ঠাউরে বসে আছে! চটে গিয়ে তিনি বললেন, না মশাই, আমি অশ্বটশ্ব নই, ওনামের কোনও লোককে আমি চিনি না।
ধ্যাৎ, তা হলে খালি খালি এলাম! শুধু সময় নষ্ট বলে পণ্ডিতমশাই উঠে চলে গেলেন।
এবার এগিয়ে এলেন কবিরাজমশাই।
–আমাশয় প্রকরণ আর সহজ পাঁচন-নির্মাণ বই দুটো আপনারই লেখা তো?
রামহরিবাবু সরোষে বললেন, না।
–তা হলে আপনি কৃতান্তকুমার মারণরত্ন নন?
–না-না-না। আমার নাম রামহরি বটব্যাল।
-তাই নাকি?–বিরক্তমুখে কবিরাজ বললেন, গজা হতভাগা তা তো বললে না। খালি খালি বেতো পা নিয়ে ছুটে এলাম। দূর-দূর!
কবিরাজ প্রস্থান করলেন। তারপর আস্তে আস্তে আর সবাই। একা চণ্ডীমণ্ডপে রামহরি বসে রইলেন, রাগে তাঁর গা জ্বলতে লাগল।
ইতিমধ্যে কোত্থেকে একটা ডাবা হুঁকো সেজে এনেছে গজেন। বললে, তামাক ইচ্ছে করুন, তারপর চলুন সভায় যাই।
