সক্রোধে রামহরি বললেন, সভা না হাতি! খালি খালি আমাকে ভোগান্তি করতে কেন নিয়ে এলেন বলুন দেখি?
গজেন মধুর হেসে জবাব দিলে, আহা হা, চটছেন কেন স্যার! পাড়াগাঁ জায়গা, এমন হয়েই থাকে। নিন নিন, তামাকটা খেয়ে ফেলুন, তারপর সভায় যাওয়া যাবে।
অগত্যা হুঁকোটা হাতে নিয়ে একটা টান দিলেন রামহরিবাবু। কিন্তু সে কী সোজা তামাক! টান দেবার সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঘুরে একেবারে মূর্ছার উপক্রম। সামলে নিয়ে রামহরিবাবু খেপে উঠলেন : এ কী কাণ্ড মশাই?
কী হল স্যার?
–এ তামাক না গাঁজা? উঃ–আর একটু হলে প্রাণটা আমার বেরিয়ে যেত।
–ও কিছু না স্যার–তেমনি মিষ্টি করে হেসে গজেন বললে, দা-কাটা তামাক একটু কড়া হবেই। ওসব না হলে যাত্ৰাই জমে না।
-কিন্তু আমি তো যাত্রা করতে আসিনি।
না, সভা করতে এসেছেন। একই কথা স্যার–আসলে তো বক্তৃতা করাই? নিন, এবারে উঠুন।
.
সভা-পর্বের বিস্তারিত বর্ণনা না করাই ভালো।
একটা খোলামাঠে খানকয়েক চাটাই পাতা। আর একদিকে একখানা তে-পায়া চেয়ার : সভাপতির আসন। চেয়ারে বসতে গিয়ে একটুর জন্যে ধরাশয্যার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে গেলেন রামহরিবাবু।
সভায় লোক হয়েছে গোনা-গুনতি পনেরো জন। সাত-আটটি কালো কালো ন্যাংটো ছেলেমেয়ে, জন দুই চাষা, গজেন আর জন পাঁচেক ভদ্রলোক। মাল্যদান হল না, প্রস্তাব হল না, উদ্বোধন সঙ্গীত হল না। রামহরিবাবুর বুকভরা আশা যেন ধক করে নিবে গেল।
কিন্তু ঘাবড়ালে চলবে না। মনে মনে শক্ত করে কোমর বাঁধলেন তিনি। হোক ছোট সভা, না-ই বা থাকুক মালা, কিন্তু তিনি পিছপা হবেন না। বক্তৃতার তোড়ে এমন আগুন ছুটিয়ে দেবেন যে, এই পনেরোজন লোকেরই মাথা ঘুরে যাবে। সুতরাং তিনি আরম্ভ করলেন :
“বন্ধুগণ, অদ্যকার এই বিরাট জনসভায় আমাকে সভাপতির আসন দিয়া আমাকে আপনারা যেভাবে সম্মানিত করিয়াছেন, সেজন্য আমার আন্তরিক অভিনন্দন জানাই। আমি জানি, এই আসনের যোগ্য আমি নই–”
হঠাৎ পেছন থেকে চিৎকার উঠল–পালাও–পালাও
আঁতকে রামহরিবাবু থেমে গেলেন। কী হয়েছে?
জমিদারের লাঠিয়াল আসছে। বিনা অনুমতিতে তার জমিতে সভা করা হচ্ছে, তাই লাঠিয়াল পাঠিয়েছে। বলেছে, আগে সভাপতির মুণ্ডুটা দু ফাঁক করে তারপর
বাকিটা শোনবার আর সময় ছিল না। বাবা গো–বলে রামহরিবাবু ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে শুরু করলেন। কোথায় কোনদিকে তিনি জানেন না। মুহূর্তে সেখানে সভার চিহ্নমাত্রও রইল না।
ওদিকে রামহরিবাবু ছুটলেন। ভুঁড়িটা মস্ত একটা ফুটবলের মতো আগে আগে দৌড়ুচ্ছে, পেছনে দৌড়ুচ্ছে শরীর। তারপরেই ঝপ ঝপাস করে একটা শব্দ!
হ্যাঁ–এতক্ষণে সভা জমেছে বটে!
একটা পচা ডোবার বুক সমান কাদার ভেতর থেকে রামহরিবাবু ওঠার চেষ্টা করছেন, কিন্তু উঠতে পারছেন না। জলে কাদায় তাঁর বিরাট শরীরটাকে দেখাচ্ছে একটা জলহস্তীর মতো। আর ডোবার চারদিকে শ’দুয়েক লোক জড়ো হয়েছে। গজেন আছে, পণ্ডিতমশাই আছেন, কবিরাজও আছেন। পরমানন্দে সবাই রামহরিবাবুর দুর্গতিটা উপভোগ করছে। এইবারে সত্যি সত্যিই বিরাট সভা আর রামহরিবাবু সত্যিকারের সভাপতি।
.
কলকাতায় ফিরে রামহরিবাবু ইজিচেয়ারে চোখ বুজে শুয়ে আছেন। বুদ্ধু তাঁর সর্বাঙ্গে মলম মাখাচ্ছে।
হঠাৎ চোখ মেলে রামহরি করুণস্বরে ডাকলেন, বুদ্ধু!
-আইজ্ঞা।
–কোনও দিন কোথাও সভাপতি হোসনে, বুঝলি?
–আইজ্ঞা বুঝছি। আমি আমার পরিবারের পতি অইয়া সুখে আছি, শোবাটোবার পতি হম কোন দুঃখে? বীরের মতো জবাব দিলে বুদ্ধু।
সাহেবের উপহার
ভজকেষ্টবাবু দাওয়ায় বসে আমাকে বোঝাচ্ছিলেন যে, আজকালকার ইস্কুলমাস্টারদের একেবারে মায়া-দয়া নেই। তাঁর ছোট ছেলে প্যাঙা ক্লাসে পেটের অসুখ-এর মানে লিখেছিল : আনহ্যাপিনেস অব দি বেলি। তাতে মাস্টার তাকে কান ধরে বেঞ্চে দাঁড় করে দিয়েছে।
ভজকেষ্টবাবু মনে খুব ব্যথা পেয়ে আমাকে বলেছিলেন, তুমিই বলো তো প্যালারাম, পেট-খারাপ হলে কি কারও মনে সুখ থাকে? বাড়িতে হয়তো তখন চিংড়ির কাটলেট ভাজা হচ্ছে–গন্ধে ম-ম করছে চাদ্দিক, আর যার পেটের অসুখ, সে হয়তো বসে বসে বার্লির জল খাচ্ছে। তখন কি তার হ্যাপিনেস থাকে? আর ওই যে কী-একটা শব্দ আছে-ডায়ারহোইয়া না কী যেন, ওটা লিখতে এই আমারই তিনটে কলম ভেঙে যায়। এইটুকু পুঁচকে প্যাঙা কেমন করে এই কটকটে বানান লিখবে বলো দিকি?
ডাইরিয়া বানান আমার কাছে বিভীষিকা লিখতে বললেই পেট গরগর করে ওঠে। আমি খুব জোরে-জোরে মাথা নেড়ে বলতে যাচ্ছি, আজ্ঞে ঠিকই তো, এমন সময় একটা কাণ্ড হয়ে গেল।
ভজকেষ্টবাবুর নতুন হিন্দুস্থানী চাকর যমনা (যম না বললে কী হয়, চেহারা প্রায় যমের মতো মস্ত আর কালো) একটা থলে করে বাজার নিয়ে এল। আর দেখা গেল, থলের মুখে উঁকি দিচ্ছে একটা কুমড়োর ফালি। দেখেই ভজকেষ্টবাবু মোড়া থেকে লাফিয়ে উঠলেন। তাঁর হুঁকোটা উলটে গেল, আর তা থেকে বগবগ করে খানিক লালচে ময়লা জল বেরিয়ে আমার পুজোর নতুন স্যাণ্ডেলটাকে ভিজিয়ে দিলে।
ভজকেষ্টবাবু চিৎকার করে বললেন, এই যমনা–তুম কাহে কুমড়ো আনা হ্যায়?
যম না–অথচ যমের মতো দেখতে, যমনা ভীষণ ঘাবড়ে গেল। বললে, ই তো বড়িয়া চিজ হ্যায় বাবু।
বড়িয়া চিজু! হামকা মুণ্ডু! আভি ফেলে দাও কুমড়ো। ওই কুমড়ো যদি বাড়ি মে ঢুকেগা–তব হামি আভি যাঁহা মে চোখ যায় তাঁহা চলে যায় গা!
