সামনে ওয়েলিংটন স্কোয়ার। ট্রাম থেকে নেমে তার মধ্যে ঢুকে পড়ল ডাবু। উঃ সদা হাস্যমুখে থাকাটা কী ভয়ঙ্কর! আধ ঘণ্টাও চেষ্টা করতে হয়নি এরই মধ্যে বারকয়েক ফাঁড়া কেটে গেল। আর-একটু হলে পকেটমার বলে ঠেঙিয়ে ঠোঙা করে দিত।
স্বামী ঘুর্ঘুরানন্দকে হাতের কাছে পেলে হয় একবার। আদত জোচ্চোর লোকটা। স্রেফ ভোগা দিয়ে ছআনা পয়সা মেরে দিলে। তিনদিন পাঁঠার ঘুগনি খাওয়াই বরবাদ।
ঘাসের ওপর বসে পড়তে যাবে, এমন সময় হাফশার্ট পরা বেঁটে লোকটা এগিয়ে এল। একেবারে পাশ ঘেঁষেই দাঁড়াল ডাবুর।
আমি গ্যাঁড়াতলার গাঁট্টালাল, আমাকেও আপনি জব্দ করেছেন স্যার।
–মানে? কী বলছ তুমি!
–কেন স্যার ছলনা করছেন? ওই মিটমিটে হাসি, পেছনে-পেছনে আসা, বুঝতে কি বাকি থাকে? যাক স্যার-ওটা চেপেই যান, পুলিশে আর খবর দেবেন না। আমি অর্ধেক শেয়ার দিচ্ছি আপনাকে।
বলেই, ডাবুর হাতের মধ্যে কী কতকগুলো কাগজ গুঁজে দিয়ে সুড়ৎ করে অন্ধকারে কোথায় মিলিয়ে গেল হাফশার্ট পরা বেঁটে লোকটা। যেমন করে স্বামী ঘুর্ঘুরানন্দ মিলিয়ে গিয়েছিল, ঠিক সেইরকম।
কিন্তু হাতের কাগজগুলোর দিকে তাকিয়ে ডাবুর হাসি বন্ধ হয়ে গেল। মিটমিটে হাসি একদম বন্ধ হয়ে গেল এতক্ষণে। সেগুলো কাগজ নয়–একতাড়া দশ টাকার নোট।
সভাপতি
অনেকগুলো গল্পের বই আর দশ বারোখানা উপন্যাস লিখেছেন রামহরিবাবু। তাঁর বইগুলোর ভয়ঙ্কর ভয়ঙ্কর নাম–প্রলয়ের আগুন, ডাইনীর আর্তনাদ, রক্তের হুঙ্কার, ডাকাতের খাঁড়া, কাটামুণ্ডুর নাচ–এই সব! রামহরিবাবুর ধারণা, শরৎচন্দ্রের পরে তাঁর মতো ভালো কেউ তো লিখতে পারেই না শরৎচন্দ্রের চাইতেও তিনি ভালো লেখেন।
কিন্তু দুঃখের কথা এই যে, ধারণাটা তিনি ছাড়া আর কারও নেই। এত রাশি রাশি বই লিখলেন, অথচ লোকে তাঁর কদর বুঝল না। কুড়িয়ে বাড়িয়ে সবসুদ্ধ পঞ্চাশখানার বেশি বই এ-পর্যন্ত তাঁর বিক্রি হল না। সাধে কি জাতির অধঃপতন হচ্ছে। ওই পঞ্চানন শিকদার নিতান্তই সেদিনকার ছোকরা এখনও ভালো করে গোঁফ ওঠেনি, আর তার বই কিনা ঝড়ের বেগে কাটতি হয়ে যায়। অথচ তিনি, যিনি শরৎচন্দ্রের চাইতেও ভালো লেখেন, তাঁর বই কাটে পোকাতে। ধিক ধিক!
পোকায় কাটা বইগুলোর দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে রামহরিবাবু বারবার বাঙালি জাতিকে ধিক্কার দিতে থাকেন।
শুধু কি এই? বাংলাদেশে কতই তো সভা-সমিতি হচ্ছে। সেদিনকার ছোকরা পঞ্চানন শিকদার পর্যন্ত সভাপতি হয়ে গলায় মোটা মোটা মালা পরে–দেখে রামহরিবাবুর উত্তেজনায় হার্টের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে আসতে চায়। কোনও সভায় এ-পর্যন্ত তাঁকে কেউ সভাপতি হতে ডাকল না। বড় বড় মিটিংয়ের কথা না হয় ছেড়েই দিলাম, পাড়ার সরস্বতী পুজোয় পর্যন্ত বাইরে থেকে লোক ডেকে এনে সভাপতি করা হয়। অথচ তিনি যে সকলের চোখের সামনে সূর্যের মতো একেবারে জ্বলজ্বল করে জ্বলছেন এটা কারও মনেই পড়ে না। এরই নাম হচ্ছে প্রদীপের নীচে অন্ধকার।
এই সব গবেষণা করে রামহরিবাবু যখন সন্ন্যাসী হওয়ার জন্য গেরুয়া ছোপাচ্ছিলেন, এমন সময় একটা কাণ্ড ঘটে গেল।
ভগবান অন্তর্যামী। রামহরিবাবুর মনের বেদনা তিনি বুঝলেন!
সেদিন সকালে দাড়ি কামাচ্ছেন রামহরিবাবু। সবে গালের একটা দিক কামিয়েছেন এমন সময়ে শুনতে পেলেন বাইরে তাঁর চাকর বুদ্ধুর সঙ্গে কে যেন কথা বলছে।
–রামহরি বটব্যালের বাড়ি এইটে?
–আইগ্যা হ। কত্তা কী কামে আইছেন?
–তাঁকে একটা সভায় সভাপতি হবার জন্যে
-শোবাপতি? তিনি আবার শোভার পতি অইবেন ক্যান? আমার মা ঠাইনের পতি তো তিনি অইয়াই আছেন–
লোকটি কী যেন বলতে যাচ্ছিল, এর মধ্যেই ক্যাঙারুর মতো একখানা সমুদ্রলঙ্ঘন লম্ফ দিয়ে এসে পড়েছেন রামহরিবাবু। একগালে সাবান, হাতে ক্ষুর। চেহারাখানা যা খোলতাই হয়েছে বলবার নয়। দেখে লাফিয়ে তিন পা সরে গেল বুদ্ধু। বললে, কত্তা, অমন ক্ষুর লইয়া ধাইয়া আইলেন ক্যান? খ্যাপছেন নাকি?
–যা যা ব্যাটা গাড়ল, ভেতরে যা।–এক ধমকে নার্ভাস বুদ্ধুকে আরও নার্ভাস করে দিয়ে প্রসন্ন দৃষ্টিতে রামহরিবাবু আগন্তুকের দিকে তাকালেন। তারপর আধগাল দাড়ি আর সাবান নিয়ে তিনি একগাল হাসি হাসলেন; আমিই রামহরি বটব্যাল। কী চাই আপনার?
–আপনিই রামহরিবাবু? নমস্কার নমস্কার। আপনাকে আমাদের একটা সাহিত্যসভার সভাপতি হবার জন্যে
–আসুন, আসুন, বসুন–ওরে বুদ্ধু, বাবুকে শিগগির চা এনে দে।
কৃপণতার জন্যে রামহরিবাবু বিখ্যাত। তাঁর দোরগোড়া থেকে ভিখিরি ঠ্যাঙা খেয়ে যায়, পাত কুড়োবার মতো কিছু পায় না বলে বাড়িতে কাক পর্যন্ত পড়ে না। এ-হেন লোক কিনা খুশির আতিশয্যে আগন্তুককে হাফ কাপ ঝোলাগুড়ের চা খাইয়ে দিলেন।
.
তারপরে শুরু হল আসল গল্প।
মার্টিনের রেলগাড়িতে প্রচণ্ড ছারপোকার কামড় খেতে খেতে রামহরিবাবু এসে নামলেন একটা ছোট স্টেশনে। স্টেশনের নাম বাঁশতলা।
যে-লোকটি তাঁকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে, তার নাম গজেন তফাদার। কথায় কথায় রামহরিবাবু জানতে পেরেছেন সে গ্রামের নাট্য-সমিতির সেক্রেটারি–এ-গাঁয়ে ও-গাঁয়ে যাত্রা করে বেড়ায়। খবরের কাগজে সাহিত্য-সমিতির হিড়িক দেখে তাদেরও সাহিত্য করবার শখ হয়েছে। তাই তারা রামহরিবাবুকে সভাপতি করবার জন্যে ধরে এনেছে।
