কিছুদিন পরে টের পেল জিউতের বন্ধুবান্ধবেরা।
একটা আসরে তারা জিউৎকে ঘিরে ধরল।
কী হয়েছে তোর?
কুছ নেহি।
দিল খারাপ?
হ্যাঁ।
তবে চল আজ মৌজ করে আসি।
না।
কিন্তু বন্ধুরা ছাড়লে, সেদিন সন্ধ্যার পরেই সাজগোজ করিয়ে তাকে টেনে নিয়ে গেল। দেশি মদের দোকানে এক-এক পাঁইট করে টেনে সকলে যখন রাস্তায় বেরুল, তখন বহুদিন পরে জিউতের রক্তে আগুন ধরেছে আবার। জোরগলায় একটা অশ্রাব্য গান জুড়ে দিল সে।
ডালমণ্ডিতে ঘরে ঘরে তখন উৎসব চলছে। হার্মোনিয়ামের শব্দ, ঘুঙুরের আওয়াজ, বেতালা গান, বেসুরো চিৎকার। মাঝে মাঝে সব কিছু ছাপিয়ে জেগে উঠছে তবলার উদ্দাম চাঁটির নির্ঘোষ। দরজায় দরজায় রাত্রির অপ্সরি। শিকার ধরবার জন্যে ওত পেতে দাঁড়িয়ে।
টলতে টলতে যাচ্ছিল, হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে গেল জিউৎ। কেদারঘাটের একফালি আলোতে দেখেছিল, এখানে বিদ্যুতের আলোতেও সে চিনতে পারল। আশ্চর্য, নেশায় রাঙা চোখ নিয়েও চিনতে পারল জিউৎ।
মেয়েটার চোখেও নেশার ঘোর। জিউৎকে থেমে দাঁড়াতে দেখে সে এগিয়ে এল। জিউতের একখানা হাত চেপে ধরে বললে, চলে এসো।
ঠাণ্ডা একটা সাপ হঠাৎ শরীরে জড়িয়ে গেলে যে-অনুভূতি জাগে, তেমনি একটা ন্যক্কারজনক ভয়ার্ত শিহরণে জিউৎ শিউরে উঠল। হাত ছাড়াবার চেষ্টা করে বললে, আমি চাঁড়াল।
উচ্চৈঃস্বরে মাতালের হাসি হেসে মেয়েটা বললে, আমি চাঁড়ালনি। ভয় কী? চলে এসো।
প্রকান্ড একটা ঝাঁকানি দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলে জিউৎরাম, ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটতে শুরু করে দিলে। পেছন থেকে মেয়েটার হাসি কানে আসছে, একটা ধারালো অস্ত্র দিয়ে যেন পিতলের বাসনের গায়ে সশব্দে আঁচড় কাটছে কেউ।
শ্মশানে শ্মশানচন্ডাল পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে।
সামনে চিতার ওপর লকলকে আগুন, গঙ্গার জলে নাচছে তার প্রেতচ্ছায়া। শ্মশানচন্ডালের কালো শরীরে আগুনের আভা পিছলে যাচ্ছে।
আর রাগ নেই, অভিযোগ নেই, গ্লানি নেই। ব্যথা আর করুণায় মনের ভেতরটা টলমল করছে। চেতনার ভেতর থেকে কে যেন বলছে, একদিন এই ঘাটেই আসবে নীরদা, এইখানে গঙ্গার জলে জীবনের সমস্ত জ্বালা তার জুড়িয়ে যাবে। সেদিন তার অহংকার থাকবে না, থাকবে না আজকের এই অপমানের কালো কলঙ্কের ছাপ। সেদিন জিউ তাকে নিজের মতো করে পাবে, পাবে তাকে স্পর্শ করবার অধিকার। চন্ডালের ছোঁয়ায় সেদিন তার কাশীপ্রাপ্তির সার্থক মর্যাদা ফিরে আসবে। সেই দিনের প্রতীক্ষা করবে জিউৎ, অপেক্ষা করে থাকবে সেই দিনের জন্যে।
রাধাকান্তের বাড়িতে তখন কথকতা হচ্ছিল। শ্মশানে চন্ডাল মহারাজা হরিশ্চন্দ্রের সঙ্গে রাজরানি শৈব্যার মিলন।
সদা হাস্যমুখে থাকিবে
পর পর দুবার আই-এ ফেল করলে কার আর মেজাজ ভালো থাকে? তার ওপর বড়দা যখন বললেন, ওর আর পড়ে দরকার নেই–এবার গলির মোড়ে বিড়ির দোকান করে দেব, তখন ডাবু স্রেফ উড়ন-তুবড়ির মতো ছিটকে পড়ল বাড়ি থেকে।
ময়দানে বসে বসে যখন ভাবছে আত্মহত্যা করবে না সিনেমা দেখতে যাবে, ঠিক সেই সময় স্বামী ঘুর্ঘুরানন্দের আবির্ভাব।
ইয়া জটা, অ্যায়সা দাড়ি–চোখ দুটো লাট্টুর মত ঘুরছে। ডাবুর সামনে এসেই বাজখাঁই গলায় বললেন, এই ছোকরা, তোমার পকেটমে কেনা যায়?
আওয়াজ শুনেই ডাবু ভেবড়ে গেল। একটা চীনেবাদাম চিবুচ্ছিল, কটাৎ করে গলায় আটকে গেল সেটা। হুস করে বলে ফেলল, বারো আনা হ্যায়।
–তব ছ আনা দে দো।
–কেন?
-কেন আবার কেয়া! আমি ঘুর্ঘুরানন্দ হ্যায়। ছআনা দে দো। বহুত আচ্ছা উপদেশ দেগা–তোমার খুব ভালো হোগা।
উপদেশের আশায় নয়–ঘুর্ঘুরানন্দের চেহারা দেখেই ছআনা পয়সা পকেট থেকে বার করে দেয় ডাবু। না দিলে জোর করে হয়তো বারো আনাই কেড়ে নেবে। আরও এখন কাছাকাছি লোকজন কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
ছআনা গুনে নিয়ে ঘুর্ঘুরানন্দ হাসলেন। তারপর তেমন বাজখাঁই গলায় বলেন, সব সময় হাসি মুখমে থাকে গা বুঝেছ? সদা হাস্যমুখে থাকিবে। দেখবে, সব ঠিক হো যায়ে গা।
এই বলেই সুড়ত করে কোনদিকে চলে গেলেন ঘুর্ঘুরানন্দ। সন্ধ্যার অন্ধকারে ডাবু সেটা ভালো করে ঠাহর করতে পারল না।
একবার মনে হল, লোকটা জোচ্চোর–একদম মাথায় চাঁটি বসিয়ে ছগণ্ডা পয়সা হাতিয়ে নিয়ে গেল। তারপর ভাবল, কে জানে কোনও মহাপুরুষই হয়তো বা। ডাবুর মনের ব্যথার খবর পেয়ে তার সঙ্গে ছলনা করে গেলেন।
সে যাই হোক–উপদেশটা মেনেই চলা যাক না। সদা হাস্যমুখে থাকিবে। মন্দ কী? আই-এ ফেল করে তিনদিন তো সমানে কাঁদতেই হয়েছে–একদিন হেসেই দেখা যাক না, না হয়। কী থেকে যে কী হয়, কেউ বলতে পারে সে কথা?
চীনেবাদাম খেতে-খেতে ডাবু উঠে পড়ল। হাস্যমুখেই। এসপ্ল্যানেড গুমটির সামনে এসে ট্রামের জন্যে দাঁড়াতে হল ডাবুকে। শ্যামবাজারের গাড়ি ধরতে হবে তাকে। হাসিমুখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুর্ঘুরানন্দের কথাই সে ভাবছে ঠিক এই সময় কাণ্ড হল একটা।
-কী মশাই, হাসছেন যে?
ডাবু চমকে ফিরে তাকাল। ঘাড়ে-গদানে ঠাসা প্রচণ্ড মোটা এক ভদ্রলোক তার সামনে। হঠাৎ দেখলে মনে হয়, একটা খইয়ের বস্তার একটা মাথা আর গোটাকয়েক হাত-পা গজিয়েছে। দুটো কুতকুতে চোখের দৃষ্টি ডাবুর ওপর ফেলে ঘ্যাঁসঘেঁসে গলায় ভদ্রলোক বললেন, হাসছেন কেন মশাই?
-এমনি।
–এমনি?–ভদ্রলোক প্রায় তেড়ে উঠলেন : তখন থেকে সমানে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছেন–বললেই হল, এমনি?
