অস্পষ্ট স্বরে জিউ বললে, আমি জিউৎরাম।
তুমি পান্ডা? ব্রাহ্মণ? দন্ডবৎ?
যেন সাপে ছোবল মেরেছে এমনিভাবে জিউৎ পিছিয়ে গেল। চমকে উঠেছে চেতনা, তর্জন করে উঠেছে বংশানুক্রমিক ক্ষুদ্রতাবোধের সংস্কার। জিভ কেটে জিউ বলে ফেলল, না, আমি চন্ডাল।
চন্ডাল!
জিউতের যেন নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল, কোনোক্রমে উচ্চারণ করতে পারল, হ্যাঁ, আমি চন্ডাল।
চন্ডাল! বিদ্যুদবেগে দাঁড়িয়ে উঠল নীরদা। কেদারঘাট থেকে পিছলে-পড়া আলোর ফালিতে দেখা গেল অপরিসীম ঘৃণায় নীরদার সমস্ত মুখ কালো হয়ে গেছে। একটা নিষ্ঠুর আঘাতে মুছে গেছে বিশ্বেশ্বরের অলৌকিক মহিমার প্রভাব, সরে গেছে অভিভূত আচ্ছন্নতার জাল।
বিষাক্ত তীক্ষ্ণ গলায় নীরদা চেঁচিয়ে উঠল, চাঁড়াল হয়ে বামুনের বিধবাকে ছুঁলি তুই? মুখে জল দিলি?
সভয়ে তিন-পা পিছিয়ে গেল জিউৎ।
নীরদা তেমনি চ্যাঁচাতে লাগল, তোর প্রাণে ভয় নেই? এত বড়ো সাহস, আমাকে খাবার দিতে আসিস? তোর মতলব কী বল দেখি?
জিউতের পায়ের তলায় মাটি সরতে লাগল।
এক লাথি দিয়ে খাবারগুলো ছড়িয়ে দিলে নীরদা, উলটে দিলে দইয়ের ভাঁড়। তারপর সোজা উঠে হনহন করে হাঁটতে শুরু করলে মদনপুরার রাস্তার দিকে। আর লজ্জায় অপমানে জিউ মাটির দিকে তাকিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার নেশা ছুটেছে এতক্ষণে। ভাঙা সিঁড়ির ওপর দিয়ে দইয়ের একটা শুভ্র রেখা গড়িয়ে গড়িয়ে বালির মধ্যে গিয়ে পড়তে লাগল।
খানিক দূরে এগিয়ে গিয়ে নীরদার খেয়াল হল, চাঁড়ালে ছুঁয়েছে, গঙ্গাস্নান করে নেওয়া দরকার। কিন্তু খিদেয় আর তেষ্টায় সমস্ত শরীরটা তার টলছে। বাড়িতে গিয়ে কলেই স্নান করবে একেবারে, এখন আর ঘাটের অতগুলো সিঁড়ি ভাঙা সম্ভব নয়।
পথ চলতে চলতে ক্রমাগত মনে হচ্ছিল আজ ভারি রক্ষা পেয়েছে সে। লোকটার মনে কী ছিল কে জানে। নির্জন ঘাটে যা খুশি তাই করতে পারত, টেনে নিয়ে যেতে পারত যেখানে সেখানে। অন্নপূর্ণা রক্ষা করেছেন। উত্তেজনায় রক্ত জ্বলজ্বল করতে লাগল, হরিশ্চন্দ্র ঘাটের সঙ্গে দূরত্বটা বজায় রাখবার জন্যে যথাসম্ভব দ্রুতবেগে সে চলতে শুরু করে দিলে।
বাড়িতে এসে যখন ঢুকল, সব নির্জন। শুধু তেতলার ঘরে একটা আলো জ্বলছে, আর সমস্ত অন্ধকার। বিশ্বনাথের আরতি দেখতে গেছে সকলে। কলতলায় স্নান সেরে ঘরে ঢুকতে গিয়েই মনে হল দরজায় শিকল নেই কেন! ঘর খুললে কে!
কিন্তু অত কথা ভাববার আর সময় ছিল না। আর দাঁড়াতে পারছে না সে, সমস্ত শরীরটা অস্থির করছে, বোঁ বোঁ করে ঘুরছে মাথাটা। এক ঘটি জল খেয়ে আজ কোনোমতে গড়িয়ে পড়বে, তারপর উপায়ান্তর না দেখলে কাল থেকে নাহয় বিশ্বনাথের গলিতেই বসবে হাত পেতে। কাশীতে ভিক্ষে করে খেলেও সুখ।
দরজা খুলে অন্ধকার ঘরে পা দিতেই অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠল নীরদা।
যেমন করে জিউল্লাম তাকে বুকে তুলে নিয়েছিল, তার চাইতে অনেক কঠিন নিষ্ঠুর পেষণে কে তাকে সাপটে ধরেছে। তার মুখে মদের গন্ধ, অন্ধকারে তার চোখ সাপের চোখের মতো জ্বলছে।
ফিসফিস করে সে বললে, ডরো মত প্যারে, রুপেয়া মিল যায়েগা।
নীরদার দুর্বল হতচেতন দেহ বিনা প্রতিবাদে আত্মসমর্পণ করলে, আর অন্ধকারের ভেতর থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাবধানে টাকাগুলো মুঠো করে ধরলে মহাদেব তেওয়ারি। রেইস আদমির প্রাণটা দরাজ আছে, আর পাওনা টাকাটাও তাকে উশুল করতেই হবে। বিশ্বনাথের কাশীতে নীরদাকে ঋণী রেখে সে পাপের ভাগী হতে পারবে না, তা সে-টাকা নীরদা ইচ্ছায় নিক আর অনিচ্ছায়ই নিক।
ঠিক সেই সময় বৈঠকখানার আসরে বসে জিতেন্দ্রিয়ের লক্ষণগুলো বাচস্পতিকে বোঝাচ্ছিলেন রাধাকান্ত। সামনে মহাভারতের পাতা খোলা। ব্যাসদেব বলছেন, হে ভীষ্ম, যে পুরুষ ইন্দ্রিয়জয়ে সক্ষম…
কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেছে জিউরাম।
ফর্সা জামা পরে না, কানে আতরমাখা তুলো গোঁজে না, একমুখ পান চিবিয়ে ভদ্রলোক। হবার চেষ্টা করে না। কোথা থেকে এক কঠিন রূঢ় আঘাত এসে আকস্মিকভাবে তাকে নিজের সম্বন্ধে অত্যন্ত সচেতন ও সজাগ করে দিয়েছে।
জিউৎরাম মড়া পোড়ায়। একটা লম্বা বাঁশ দিয়ে মড়ার মাথা ফটাস করে ফাটিয়ে দেয়, চিতার কয়লাগুলো ছড়িয়ে ছড়িয়ে ফেলে দেয় গঙ্গার জলে। কেমন একটা অন্ধ আক্রোশ বোধ করে, বোধ করে একটা অশোভন উন্মাদনা। জীবন্তে যাদের তার স্পর্শ করবার অধিকার পর্যন্ত নেই, চিতার ওপরে তাদের আধপোড়া মৃতদেহগুলোর ওপরে যেন সে প্রতিশোধ নিতে চায়, তাদের অপমান করতে চায়, লাঞ্ছিত করতে চায়।
মাঝে মাঝে যখন অন্যমনস্ক হয়ে বসে থাকে, মনে পড়ে যায় নীরদাকে। ঘৃণ্য-বীভৎস মুখে বলছে, চন্ডাল! তার পায়ের ধাক্কায় সিঁড়ির ওপরে উলটে পড়েছে দইয়ের ভাঁড়, পরম অবহেলায় গড়িয়ে চলে যাচ্ছে তার শ্রেষ্ঠ অর্ঘ্য তার প্রথম নিবেদন।
হঠাৎ জিউতের শরীরের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠতে চায়, হাতের মুঠিগুলো থাবার মতো কঠিন হয়ে ওঠে। কী হত যদি সেদিন সে তুলে আনত নীরদাকে, যদি জবরদস্তি করত তার ওপরে? কে জানতে পারত, কে কী করতে পারত তার? সেই ভালো হত, তাই করাই উচিত ছিল তার। ভুল হয়ে গেছে, অন্যায় হয়ে গেছে সেদিন।
লাফিয়ে উঠে পড়ে জিউৎ, হাতের বাঁশটা তুলে নিয়ে প্রচন্ড বেগে খোঁচা দেয় চিতার মড়াটাকে। কালো রবারের পুতুলের মতো শিরা-সংকুচিত দেহটা পোড়া কাঠের ভেতর থেকে খানিকটা লাফিয়ে ওঠে। একরাশ আগুন ঝুরঝুর করে ছড়িয়ে যায় আশেপাশে। তারপর নির্মমভাবে বাঁশ দিয়ে পিটতে শুরু করে, সাদা হাড়ের ওপর থেকে থেতলে থেঁতলে পোড়া মাংস খসে পড়তে থাকে, দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে যায়।
