জিউৎরাম চাঁড়ালের ছেলে। বংশানুক্রমিকভাবে এই ঘাটে তারা মড়া পুড়িয়ে আসছে। কিন্তু জিউল্লামের যৌবনকাল এবং অল্প অল্প শখও আছে। মাঝে মাঝে রুমাল বেঁধে বিলিতি নেটের মিহি পাঞ্জাবি পরে পান চিবুতে চিবুতে সে বেরিয়ে পড়ে, একটুকরো তুলোয় সস্তা আতর মেখে গুঁজে দেয় কানের পাশে, চোখের পাতায় হালকা করে আঁকে সুর্মার রেখা। এই হরিশ্চন্দ্র ঘাটে মড়া পোড়ানোর চাইতেও আর একটা বৃহত্তর জীবনের দাবি যে আছে সেইটেকেই সে অনুভব করতে চায় মাঝে মাঝে, ভুলে যেতে চায় নিজের ব্রাত্য পরিচয়।
আজ একটু রঙের মুখে ছিল জিউৎরাম। মুসম্মার রস দিয়ে বেশ কড়া করে লোটা খানেক সিদ্ধি টেনেছে, তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে কোনো অজানা-অচেনা প্যারের উদ্দেশে হৃদয়ের আকুতি নিবেদন করছে। এমন সময় দেখতে পেল সিঁড়ির মাথার ওপরে সাদামতো কী-একটা পড়ে রয়েছে।
প্রথম দু-এক বার দেখেও দেখেনি, তারপর কেমন সন্দেহ হল। জিউল্লাম আস্তে আস্তে এগিয়ে গেল। হঠাৎ ছ্যাঁৎ করে উঠল বুকের ভেতরটা—মড়া নয় তো?
একটা ঝাঁকড়া গাছের ছায়ায় পড়ে ছিল নীরদা। পাশের কেদারঘাট থেকে একফালি বিদ্যুতের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝে দুলে যাচ্ছিল নীরদার মুখের ওপর। সেই আলোয় জিউৎ দেখল নিশ্বাস পড়ছে—অজ্ঞান হয়ে গেছে মেয়েটা। কাশীর ঘাটে এমন দৃশ্য বিরল নয়।
কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একটা-কিছু এখনই করা দরকার। কিন্তু কী করতে পারা যায়?
আজ মাথার মধ্যে নেশা রনরন করছিল জিউঞ্জামের, নইলে এমন সে কিছুতেই করতে পারত না। কিছুতেই ভুলতে পারত না সে চন্ডাল, তার ছোঁয়া লাগলে বাঙালি ঘরের মেয়েকে চান করতে হয়। কিন্তু আজ সে নেশা করেছিল, খেয়েছিল একমুখ জর্দা-দেওয়া মিঠে পান, কানে খুঁজে নিয়েছিল গুলাবি আতর। মনটা অনেকখানি উড়ে গিয়েছিল তার নিজের সীমানার বাইরে, তার সহজ স্বাভাবিক বুদ্ধি খানিকটা বিপর্যস্ত হয়ে গিয়েছিল, নিজেকে ভেবে নিয়েছিল ভদ্রলোকদের সগোত্র বলে।
জিউৎরাম ঝুঁকে পড়ল, পাঁজাকোলা করে তুলে নিলে নীরদাকে। চন্ডালের কঠিন বুকের ভেতর মিশে গেল নীরদার দুর্বল কোমল দেহ। বুকের রক্তে কলধ্বনি বাজতে লাগল জিউত্রামের, রোমকূপগুলো যেন ঝিঝি করতে লাগল।
নীরদাকে এনে সে নামালে গঙ্গার ধারে। আঁজলা আঁজলা জল দিলে চোখে-মুখে। গঙ্গার হাওয়ায় নীরদার জ্ঞান ফিরে এল ক্রমশ, বিহ্বলের মতো সে উঠে বসল।
আমি কোথায়?
হরিশ্চন্দ্র ঘাটে, গঙ্গাজির ধারে। কী হয়েছে তোমার? মু
হূর্তে বর্তমানটা নীরদার ঝাপসা সাদা চেতনার ওপরে একটা কালো ছায়ার মতো এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল। জিউস্রাম আবার জিজ্ঞাসা করলে, তোমার কী হয়েছে?
হঠাৎ নীরদা কেঁদে ফেলল। বাবা বিশ্বনাথের কাশীতে সে এই প্রথম শুনল বিশ্বনাথের এই কণ্ঠ, শুনল স্নেহের স্বর। দু-হাতে মুখ ঢেকে উচ্ছ্বসিতভাবে কেঁদে উঠল সে।
আমার কেউ নেই, আমার কিছু নেই…
জিউৎ আশ্চর্য হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। কী করা উচিত, কী বলা সঙ্গত কিছু বুঝতে পারছে না। নিভন্ত চিতাটার রাঙা আলোর আভায় নীরদার বিবর্ণ পান্ডুর মুখোনা দেখে একটা-কিছু সে অনুমান করে নিলে।
তোমার আজ খাওয়া হয়নি, না?
নীরদার আর সংশয় রইল না। সত্যি, কোনো ভুল নেই। শ্মশানচারী বিশ্বেশ্বর ছদ্মবেশে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। অশ্রুপ্লাবিত মুখে তেমনি করেই চেয়ে রইল সে।
জিৎ বললে, তুমি বোসো, আমি আসছি।
দু-পা এগিয়েই কেদারের বাজার। জিউৎ পকেটে হাত দিয়ে দেখলে একটা টাকা আর কয়েক আনা খুচরো রয়েছে। কিছু দই-মিষ্টি আর তরিতরকারি কিনে জিউৎ ফিরে এল।
নীরদা তখনও সেখানে স্তব্ধ একটা মূর্তির মতো বসে ছিল। গঙ্গার দিকে তাকিয়ে কী ভাবছিল সে-ই জানে। নীরদার সামনে এসে জিৎ বললে, এই নাও।
মুখ দিয়ে কথা জোগাচ্ছে না নীরদার। সীমাহীন কৃতজ্ঞতায় যেন আচ্ছন্ন অভিভূত হয়ে গেছে সে। ক্ষণিকের জন্যে মনে হল কোনো বদ মতলব নেই তো লোকটার, কিন্তু চিন্তাটা অস্পষ্টভাবে ভেসে উঠেই আবার তলিয়ে গেল। তরল অন্ধকারে ঘেরা হরিশ্চন্দ্র ঘাট, সামনে গঙ্গার কলোগ্লাস, বাতাসে চিতার অস্ফুট গন্ধ আর চারদিকের একটা থমথমে নিঃসঙ্গতা নীরদার বাস্তব বুদ্ধিকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে, বুকের ভেতর থেকে আকস্মিক একটা আবেগের জোয়ার ঠেলে ঠেলে উঠছে— বাবা বিশ্বনাথের কাশীতে কেউ উপবাসী থাকে না।
আর ভাঙের নেশাটা তখনও থিতিয়ে আছে জিউতের মগজে। সে যে কী করছে নিজেই জানে না। এত বড়ো দুঃসাহস তার কোনোদিন যে হতে পারে এটা সে কল্পনাও করতে পারেনি। অনুকম্পা নয়, দয়া নয়, পুরুষের চিরন্তন প্রেরণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তার চেতনায়। কেমন যেন মনে হচ্ছে এই সন্ধ্যার শ্মশানের এই পরিবেশে এই মেয়েটি একান্ত তারই কাছে চলে এসেছে, তারই প্রতীক্ষার মধ্যে ধরা দেবার জন্যে।
হাত বাড়িয়ে ঠোঙাটা নিয়ে নীরদা বললে, বিশ্বনাথ তোমার ভালো করবেন। তুমি কে?
এক মুহূর্তে গলার ভেতরে কী-একটা আটকে গেল জিউতের। একবার চেষ্টা করলে মিথ্যা কথা বলবার, চেষ্টা করলে নিজের তুচ্ছ কদর্য পরিচয় গোপন করবার। কিন্তু পরম সত্যাশ্রয়ী মহারাজ হরিশ্চন্দ্র একদিন যে-শ্মশানে দাঁড়িয়ে নিজের ব্রত পালন করে গিয়েছিলেন, শিবচতুর্দশীর রাত্রে যে আদি মণিকর্ণিকার ঘাটে স্বয়ং বিশ্বনাথ স্নান করতে আসেন, সেই পুণ্যতীর্থে মিথ্যা কথা সে মুখ দিয়ে উচ্চারণ করতে পারল না।
