হিন্দুর পরমতম পুণ্যতীর্থ। ভিখারি বিশ্বনাথের ক্ষুধার্ত করপুটে অমৃত ঢেলে দিচ্ছেন অন্নপূর্ণা। কিন্তু যুগের অভিশাপে অন্নপূর্ণাও ভিখারিনি। বিশ্বনাথের গলিতে, গঙ্গার ঘাটে ঘাটে, দেবালয়ের আশেপাশে সহস্র অন্নপূর্ণার কান্না শোনা যায়, একটা পয়সা দিয়ে যা বাবা, বিশ্বেশ্বর তোর ভালো করবেন।
বাবা বিশ্বনাথের কাশীতে কেউ উপবাসী থাকে না!
কেউ হয়তো থাকে না, কিন্তু দু-দিন ধরে নীরদার খাওয়া জোটেনি। বোধ হয় বিশ্বনাথের আশ্রয় সে পায়নি, বোধ হয় নীরদার পাপে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
ক্লান্ত দুর্বল পায়ে বেরিয়ে এল নীরদা। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মন্দিরে আলো জ্বলেছে, আরতি দেখবার আশায় যাত্রীরা রওনা হয়েছে বিশ্বনাথের বাড়ির উদ্দেশৌ। কর্মব্যস্ত শহরের দোকানপাটে বিকিকিনি চলেছে, চায়ের দোকানে উঠছে হুল্লোড়, পথ দিয়ে সমানে চলেছে টাঙা-এক্কা-মোটর আর রিকশার স্রোত। বাঙালিটোলা ছাড়িয়ে নীরদা এগিয়ে চলল।
খানিক এগিয়ে যেখানে আলো আর কোলাহল কিছুটা ক্ষীণ হয়ে এসেছে, সেখানে বাঁ দিকে একটা বাঁক নিলে নীরদা। পথ প্রায় নির্জন। খোয়া-ওঠা নোংরা রাস্তা সোজা গিয়ে নেমেছে হরিশ্চন্দ্র ঘাটে। সমস্ত কাশীতে এই ঘাটটাই নীরদার ভালো লাগে, এখানে এসেই যেন মুক্তির নিশ্বাস ফেলতে পারে।
আগে দু-চার দিন দশাশ্বমেধ ঘাটে, অহল্যাবাই ঘাটে গিয়ে সে বসেছে। কিন্তু কেমন যেন অস্বস্তি বোধ হয় তার, কেমন যেন মনে হয় ওসব জায়গাতে সে অনধিকারী। ঘাটের চত্বরে চত্বরে যেখানে কীর্তন শোনবার জন্যে পুণ্যকামী নরনারীরা ভিড় জমিয়েছে, ছত্রের নীচে নীচে যেখানে বেদপাঠ আর কথকতা চলছে, সামনে গঙ্গার জলে ভাসছে আনন্দতরণি আর ঘাটের ওপরে পাথরের ভিত-গাঁথা প্রাসাদগুলো বিদ্যুতের আলোয় ইন্দ্রপুরীর মতো জ্বলছে— ওখানকার ওই পরিবেশ নীরদার জন্যে নয়। ওখানে যারা আসে ওরা সবাই শুদ্ধ, সবাই পবিত্র। তাদের জীবনে কখনো মলিনতার একটুকু আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি। ওরা সহজভাবে হাসে, সহজভাবে কথা বলে, নির্মল নিষ্কলঙ্ক মুখে গলায় আঁচল দিয়ে কথকতা শোনে। কীর্তনের আসরে ওদের চোখ দিয়ে দরদর করে জল নেমে আসে। আর নীরদার চারপাশে কলঙ্কের কালো ছায়া, অশুচিতার স্পর্শ একটা বৃত্তের মতো বেষ্টন করে আছে। মনে হয় সকলের শান্ত পবিত্র দৃষ্টি মুহূর্তে ঘৃণায় কুটিল কুৎসিত হয়ে ওর অপরাধী মুখের ওপরে এসে পড়বে।
অদ্ভুতভাবে নির্জন, আশ্চর্যভাবে পরিত্যক্ত। পাশেই কেদারেশ্বর শিবের মন্দির থেকে নেমেছে ঝকঝকে চওড়া সিঁড়ির রাশি। ওখানে ভিড় জমিয়েছে দন্ডীরা, কথকেরা, তীর্থকামীরা, স্বাস্থ্যলোভীরা এবং ভিক্ষুকেরা। ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজছে কেদারের মন্দিরে। ঘাটের ওপরে জ্বলছে জোরালো বিদ্যুতের আলো। কিন্তু তার থেকে দু-পা সরে এলেই তরল অন্ধকারের মধ্যে হরিশ্চন্দ্র ঘাট নির্জনতায় তলিয়ে আছে।
দু-তিন বছর আগে জোর বান ডেকেছিল গঙ্গায়। কেঁপে উঠেছিল, ফুলে উঠেছিল জল। পাহাড়প্রমাণ সিঁড়ির ধাপ ডিঙিয়ে সে-জল ঢুকেছিল শহরের ভেতরে। তারই ফলে পুঞ্জিত বালি হরিশ্চন্দ্র ঘাটের ভাঙা সিঁড়িগুলোকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে। সে-বালি কেউ পরিষ্কার করেনি, করবার দরকারই হয়তো বোধ করেনি কেউ। শুধু যারা মড়া নিয়ে আসে তারাই বালির স্তূপ ভেঙে নীচে নেমে যায়, দু-একজন দন্ডী স্নান করে যায় সকালে-সন্ধ্যায়। বুড়িরা কচিৎ কখনো হয়তো এসে বসে, তারপর সন্ধ্যা হলেই চলে যায় কেদারঘাটের দিকে। দু একটা চিতার রাঙা আলোতে হরিশ্চন্দ্রের ছোটো মন্দিরটা আলো হয়ে ওঠে, সেই রক্তশিখায় গঙ্গার জলে একটা দীর্ঘ ছায়া ফেলে মাথায় পাগড়িবাঁধা চন্ডাল লম্বা বাঁশ দিয়ে চিতা ঝাড়তে থাকে।
এইখানে এসে বসল নীরদা।
ঘাটে জনপ্রাণী নেই, শুধু গঙ্গার ধারে সদ্য-নিভে-যাওয়া একটা চিতায় যেন রাশি রাশি। আগুনের ফুল ফুটে আছে। ওপারের অন্ধকার দিগন্তে চোখে পড়ছে রামনগরের দু-একটা আলো। পেছনে ছিপিটোলার দিক থেকে আসছে উৎকট গানের হুল্লোর—মদ খেয়েছে ওরা।
নীরদা স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে রইল নিভন্ত চিতাটার দিকে। বাবা বিশ্বনাথের কাশীতে তার স্থান হল না। এই জনবিরল ঘাটে নিঃসঙ্গ শ্মশানে বসে মনে হচ্ছিল একটা পথ ওর খোলা আছে এখনও। বিশ্বনাথ কৃপা করলেন না, কিন্তু শ্মশানে শ্মশানে জেগে আছেন ত্রিশূলপাণি ভয়ালমূর্তি কালভৈরব। চোখের ওপর থেকে যখন পৃথিবীর আলো নিভে যাবে, যখন এই দেহের অসহ্য বোঝাটা টানবার দায় থেকে মুক্তি পাবে সে, তখন চিতার ধোঁয়ার মতো বিশাল জটাজুট এলিয়ে দিয়ে মহাকায় কালভৈরব সামনে এসে দাঁড়াবেন, কানে দেবেন তারকব্রহ্ম নাম।
হঠাৎ মাথার ভেতরটা ঘুরে উঠল নীরদার। মরে-যাওয়া স্বামীর মুখ, রাধাকান্তের মুখ আর মহাদেব তেওয়ারির কদর্য বিকৃত মুখগুলো একসঙ্গে তালগোল পাকিয়ে একটা নতুন মুখের সৃষ্টি করল—কালভৈরবের মুখ। সময় হয়েছে, কালভৈরব এসে দাঁড়িয়েছেন। সামনের অগ্নিময় চিতাশয্যা থেকে আগুনের পিন্ডগুলো যেন ছিটকে লাফিয়ে উঠল, তারপর শ্মশানপ্রেতের লক্ষ চোখের মতো সেগুলো ছড়িয়ে পড়ল সমস্ত ঘাটে, রাশি রাশি বালির ওপর, গঙ্গার কালো জলের উচ্ছল তরঙ্গে তরঙ্গে।
সেই সময় হরিশ্চন্দ্র মন্দিরের চাতালে বসে এক পয়সা দামের একটা সিগারেট খাচ্ছিল জিউরাম।
