দাঁত কিড়মিড় করে শয়তান বললে, তা হলে ওই বজ্জাত মেয়রটাকেই মেরে ফেলি। আর বলেই যেই মেয়রের মাথা লক্ষ্য করে পাথর ছুঁড়তে যাচ্ছে, অমনি মেয়র বললেন, লে ভোলা-ছু-চ্ছু-চ্ছু–
বস্তার মধ্যে আটকে থেকে নেড়ী কুকুর চটেই ছিল, আর বলতে হল না। তার ওপরে ল্যাজে ভাঙা সসপ্যান বাঁধা থাকায় তার মেজাজ আরও খারাপ। আর শয়তানের বিতিকিচ্ছিরি চেহারাও তার ভালো লাগেনি। সে ঘোঁ-ঘঁক–বলে শয়তানকে তাড়া করল।
বাপ-রে–মা-রে বলে শয়তান দে-দৌড়!
কিন্তু নেড়ী কুকুর কি তাকে ছাড়ে?–ঘোঁ-ঘঁক করে সমানে ছুটে চলল তার পেছনে।
মেয়র আনন্দে নাচতে শুরু করে দিলেন, কিন্তু কোটের পকেট থেকে ধোঁয়া বেরুতে আর গায়ে গরম ছ্যাঁকা লাগতে নাচ বন্ধ হয়ে গেল। হুড়মুড় করে কোটটা ছুঁড়ে ফেললেন তিনি। বাপস্–একটুর জন্যে প্রাণ বেঁচে গেছে। পকেটে শয়তানের সেই সোনার তাল কখন আবার জ্বলন্ত কয়লা হয়ে গিয়ে জামায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছে তাঁর।
ওদিকে শয়তান সেই যে ছুটে পালাল, আর কোনওদিন তার টিকিও দেখা গেল না। নেড়ী কুকুরটা আজও তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে কি না কে জানে! চুক্তিমতো কুকুরের আত্মা তো অনন্তকালের জন্যে তার সঙ্গী।
আর সেই সাঁকোটা? দুরন্ত নদীটার বুকের ওপর সে পাঁচশো বছরের জন্যে অক্ষয় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
শৈব্যা
শেষপর্যন্ত ট্রেনটা যখন রাজঘাটে গঙ্গার পুলের ওপরে এসে উঠল, তখন নীরদা আর চোখের জল রোধ করতে পারল না। তার গাল দুটি অশ্রুতে প্লাবিত হয়ে গেল।
চারিদিক মুখরিত করে জনতার জয়ধ্বনি উঠেছে। হর হর মহাদেব, জয় বাবা বিশ্বনাথ। যাত্রীরা মুঠো মুঠো করে পয়সা ছুড়ে দিচ্ছে গঙ্গার জলে। বেণীমাধবের উদ্ধত ধ্বজা দুটো সকালের আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, চিতার নীলাভ ধোঁয়া কুন্ডলী পাকিয়ে উঠছে দুর্নিরীক্ষা মণিকর্ণিকার ঘাট থেকে। অর্ধচন্দ্রাকার গঙ্গার তীরে হিন্দুর তীর্থশ্রেষ্ঠ বারাণসী সবে ঘুম ভেঙে জেগে উঠেছে।
রাধাকান্ত বিব্রত বোধ করছিলেন। চাপা গলায় বললেন, চুপ কর, সবাই দেখতে পাচ্ছে যে।
আকুল কণ্ঠে নীরদা বললে, দেখুক গে।
আঃ, থাম থাম। কোনো ভয় নেই তোর, আমি বলছি সব ঠিক হয়ে যাবে।
সব ঠিক হয়ে যাবে। একথা আগেও অনেক বার বলেছেন রাধাকান্ত। কিন্তু কিছুই ঠিক হয়নি। জটিলতা ক্রমেই বেড়ে উঠেছে এবং শেষপর্যন্ত গ্রন্থিমোচন করবার জন্যে রাধাকান্ত নীরদাকে সর্বংসহ পুণ্যভূমি কাশীধামে এনে হাজির করেছেন। তাঁরই বাড়িতে আশ্রিত বালবিধবা জ্ঞাতির মেয়ের কাছ থেকে বংশধর তিনি কামনা করেন না। ধার্মিক এবং চরিত্রবান বলে তাঁর খ্যাতি আছে এবং পত্নী-পুত্র-কন্যা পরিবৃত সংসার আছে, সর্বোপরি সমাজ তো আছেই। আর যা-ই হোক তিনি সাধারণ মানুষ—দেবতা নন!
ক্যান্টনমেন্টে এসে ট্রেন থামল। চেনা পাণ্ডাকে আগেই চিঠি দেওয়া ছিল, টাঙা করে সে-ই নিয়ে গেল কচুরিগলির বাসায়। তারপর যথানিয়মে পুলিশ চৌষট্টি যোগিনীর ঘাটে কুড়িয়ে পেল আর একটি নামগোত্রহীন নবজাতকের মৃতদেহ।
ততদিনে রাধাকান্ত দেশে ফিরে গিয়েছেন। বৈঠকখানায় হুঁকো নিয়ে বসে আলোচনা করছেন নারীজাতির পাপপ্রবণতা সম্পর্কে। বাচস্পতির দিকে হুঁকোটা বাড়িয়ে দিয়ে তিনি বললেন, সেই যে হিতোপদেশে আছে-না গাভী যেরূপ নিত্য নব নব তৃণভক্ষণের আকাঙ্ক্ষা করে, সেইরূপ স্ত্রীলোকও…
কদর্য একটা সংস্কৃত শ্লোক উদ্ধৃত করে বাচস্পতি রাধাকান্তের বক্তব্যটাকে আরও প্রাঞ্জল করে দিলেন।
এদিকে পাণ্ডা মহাদেব তেওয়ারির আর ধৈর্য থাকল না।
একদিন অগ্নিমূর্তি হয়ে এসে বললে, এবার বেরোও আমার বাড়ি থেকে।
মড়ার চোখের মতো দুটো ঘোলাটে চোখের দৃষ্টি মহাদেবের মুখের ওপরে ফেলে নীরদা কথা বললে। এত আস্তে আস্তে বললে যে বহু যত্নে কান খাড়া করে কথাটা শুনতে হল মহাদেবকে।
গাঁজার নেশায় চড়া মেজাজ মুহূর্তের জন্যে নেমে এল মহাদেবের। ওই অদ্ভুত চোখ দুটো, ওই শবের মতো বিচিত্র শীতল দৃষ্টি তার কেমন অমানুষিক বলে মনে হয়; কেমন একটা অস্বস্তি বোধ হয় তার। যেন পাথরের ওপরে ঘা দিচ্ছে; পাথরের কিছুই হবে না, প্রতিঘাতটা ফিরে আসবে তারই দিকে। ভয়, উৎকণ্ঠা, অপমান ও অপরাধ সব কিছু জড়িয়ে কোন একটা নির্বেদলোকে পৌঁছে গেছে নীরদা।
মহাদেব কুঁকড়ে গিয়ে বললে, আজ চার মাহিনা হয়ে গেল টাকাপয়সা কিছু পাইনি। আমি তো আর দানছত্র খুলে বসিনি।
নীরদা তেমনি অস্পষ্ট গলায় বললে, আমি কী করব?
আবার জ্বলে উঠল মহাদেব, বিশ্রী একটা অঙ্গভঙ্গি করে বললে, ডালমণ্ডি থেকে রোজগার করে আনো। তোমার যৌবন আছে, কাশীতে রেইস আদমিরও অভাব নেই।
কিন্তু কথাটা বলেই মহাদেব আবার লজ্জা পেল। নীরদার দিক থেকে দৃষ্টিটা ফিরিয়ে নিয়ে চলে যেতে যেতে বললে, নইলে পথ দ্যাখো।
পথই দেখতে হবে নীরদাকে। যে পঙ্ককুন্ড আর গ্লানির ভেতরে তাকে নামিয়ে রেখে রাধাকান্ত সরে পড়েছে, তারপরে পথ ছাড়া কিছু আর দেখবার নেই। যাওয়ার আগে রাধাকান্ত তাঁর অভ্যস্ত রীতিতে সান্ত্বনা দিয়ে গিয়েছিলেন, কোনো ভাবনা নেই, মাসে মাসে আমি খরচা পাঠাব। কিন্তু দু-মাস পরেই সংসারী রাধাকান্ত, চরিত্রবান ভদ্র রাধাকান্ত এই চরিত্রহীনা সম্পর্কে তাঁর প্রতিশ্রুতিটা অবলীলাক্রমে ভুলে যেতে পেরেছেন। ভুলে না যাওয়াটাই আশ্চর্য ছিল।
