খানিকক্ষণ অবাক হয়ে থেকে মেয়র সেটা নেড়ে-চেড়ে উলটে-পালটে দেখলেন। তারপর ফিরিয়ে দিরে গেলেন শয়তানকে।
আরে না-না–পায়ের ওপর পা তুলে আবার জাঁকিয়ে বসে শয়তান বললে, ওটা আর তোমার ফেরত দিতে হবে না। ও আমি তোমাকে উপহার দিলুম।
মেয়র সোনার তালটা নিজের ব্যাগে পুরে বললেন, তা হলে সোনা যখন আপনি নেবেন না, তখন অন্য কোনওভাবে আপনাকে পারিশ্রমিকটা দিতে হবে। কিন্তু সেটা যে কী, আমি তো তা বুঝতে পারছি না। আপনি অনুগ্রহ করে বাতলে দিন।
একমুহূর্ত চিন্তা করল শয়তান। পরক্ষণেই কুটিলতায় ভরে উঠল তার জ্বলন্ত চোখ দুটো।
শয়তান বললে, আমার পারিশ্রমিক আর কিছুই নয়। পুল তৈরি হওয়ার পর সর্বপ্রথম যে ওটা পার হবে, তার আত্মাটাকে আমি নেব।
শোনবার সঙ্গে সঙ্গে মেয়র শিউরে উঠলেন। শয়তান আত্মা নিয়ে যাবে। তার অর্থ যে কী সাংঘাতিক, সে তো মেয়রের জানতে বাকি নেই। যে-আত্মাকে শয়তান একবার অধিকার করবে, তার আর কখনোই নিষ্কৃতি মিলবে না। অনন্তকাল ধরে তাকে নরকের অন্ধকারে ঘুরতে হবে, শয়তানের দাসত্ব করতে হবে, শয়তানের যত বীভৎস পাপের কাজ–তাতেও তার অংশ নিতে হবে। চিরকালের মতো অভিশপ্ত হয়ে যাবে সে।
মেয়র চুপ করে রইলেন। অধৈর্য হয়ে শয়তান বললে, কী ভাবছ। উত্তর দিচ্ছ না যে। রাজি?
একটু পরে মেয়র বললেন, রাজি।
শয়তান বললে, তা হলে কাগজ কলম বের করো। ভদ্রলোকের মতো চুক্তিপত্র তৈরি করে ফেলা যাক একটা।
কাগজ কলম নিয়ে মেয়র বললেন, চুক্তিপত্রে কী লিখতে হবে, আপনিই-বলুন।
শয়তান বলে গেল, মেয়র লিখে নিলেন। চুক্তি হল এই : আজ রাত ভোর হওয়ার আগেই শয়তান ওই দুর্ধর্ষ দুরন্ত নদীটার ওপর দিয়ে একটা সাঁকো তৈরি করে দেবে। সে-সাঁকো যেমন সুন্দর হবে-তেমনি শক্তও হবে, আর পুরো পাঁচশো বছর সেটা অক্ষয়-অটল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। এই কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে, সর্বপ্রথমে এই সাঁকোটা যে পার হয়ে যাবে, তার আত্মার ওপর কায়েম হবে শয়তানের অধিকার। সে ভুল করেই যাক আর ইচ্ছে করেই পার হোক, শয়তানের কাছ থেকে তার আর পরিত্রাণ নেই।
চুক্তিপত্র লেখা হল, দুটো নকলও করা হল তার। যেমন নিয়ম, মেয়র সমস্ত শহরের পক্ষ থেকে সেই দুটোতে সই করলেন, শয়তানও গোটা-গোটা করে নিজের নাম সই করে দিলে। তারপর একটা নকল নিলেন মেয়র, আর একটা নিয়ে শয়তান তার ঝোল্লা কালো কোটের পকেটে ভাঁজ করে পুরে ফেলল।
উঠে দাঁড়িয়ে, এক গাল হেসে শয়তান বললেন, তা হলে কথা পাকা। কাল ভোরেই দেখবে তোমার সাঁকো তৈরি হয়ে গেছে।
বলেই খুটখুট করে গোল-গোল জুতোর আওয়াজ তুলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে। রাতে মেয়রের আর ঘুম হল না। পরদিন খুব ভোরে, শহরের জনপ্রাণীটিও জেগে ওঠবার আগেই, কাঁধে একটা মুখ বন্ধ মস্ত ঝোলা নিয়ে তিনি নদীর ধারে গিয়ে হাজির হলেন।
শয়তানের যে কথা সেই কাজ। মেয়র দেখলেন, অতি চমৎকার, দারুণ পাকাপোক্ত এক পুল নদীর ওপর দিয়ে তৈরি হয়ে রয়েছে। আর পুলের ওপারে, ভোরের ঝাপসা আলোয় একটা পাথরের ওপরে বাঘের মতো খাপ পেতে বসে রয়েছে শয়তান। যে-হতভাগা না জেনে সকলের আগে এই সাঁকোটা পার হবে–তার আত্মাটাকে অমনি সে খপাত করে কেড়ে নেবে। তার পারিশ্রমিক।
মেয়রকে সাঁকোর মাথায় দাঁড়াতে দেখে শয়তান হাঁক দিয়ে বললে, দেখছ তো, আমি কী রকম কথার লোক।
আমিও কথার লোক–মেয়র জবাব দিলেন।
শুনে, শয়তানের ধোঁকা লাগল।
সে কী! তুমি নিজেই প্রথম সাঁকো পেরিয়ে আমার খপ্পরে পড়তে চাও নাকি? এত বড় আত্মত্যাগ?
আত্মত্যাগের নিকুচি করেছে। আমাকে কি তুমি এমন গর্দভ ভেবেছ?–বলেই মেয়র কাঁধের মস্ত ঝোলাটা নামিয়ে খুলতে আরম্ভ করলেন।
শয়তান বললে, ওটা কী হচ্ছে?
উত্তরে মেয়র বললেন, ভু-উ-উ-ভৌ-ঔ-ঔ
শয়তান অবাক হয়ে বললে, তার মানে?
মেয়র বললেন, তার মানে ভৌ-ঔ-ঔ—
অ্যাঁ
বলতে বলতেই মেয়র থলেটা খুলে ফেললেন। আর তার ভেতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এল একটা বদমেজাজি রাস্তার নেড়ী কুকুর–সেটার ল্যাজে আবার ভাঙা একটা সসপ্যান বাঁধা রয়েছে। থলে থেকে ছাড়ান পেতেই সেটা সাঁকো পেরিয়ে ভোঁ-দৌড়!
মেয়র বললেন, নাও হে শয়তানদা-তোমার আত্মা নিয়ে যাও। এই কুকুরটাই তো প্রথম সাঁকো পার হয়েছে।
শয়তান বললে, বা-রে, তা কী করে হয়। কুকুরের আত্মা দিয়ে কোন্ ঘোড়ার ডিম হবে? আমি তো মানুষের আত্মার কথা বলেছিলাম।
মেয়র বললেন, বার করে চুক্তিপত্র। তাতে কেবল আত্মা লেখা আছে। মানুষ, কুকুর, গোরু, ছাগল–কিছুই আলাদা করে বলা নেই। অতএব, তোমার পারিশ্রমিক তুমি পেয়ে গেলে। এবার আনন্দে নাচতে নাচতে নরকে চলে যাও।
রেগে আগুন হল শয়তান। তার হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছে। আচ্ছা বোকা বানিয়েছে তো তাকে। সে হল মূর্তিমান শয়তান, তার মগজে যত কুবুদ্ধির কারখানা, আর লোকটা এমন করে তাকেই বেকুব করে দিলে!
পুলটাই ভেঙে ফেলব–শয়তান ভাবল। কিন্তু প্রাণপণ চেষ্টা করে সে সাঁকোর একটুকরো নুড়িও নড়াতে পারল না। চুক্তি অনুসারে সেটা পাঁচশো বছরের মতো অটল হয়ে আছে–বজ্রের মতন তার গাঁথুনি। খেপে গিয়ে শয়তান একটা হাজার-মন পাথর ছুঁড়ে মারল সাঁকোর ওপর। সাঁকোয় টোলটি পর্যন্ত খেল না, তার বদলে পাথরটাই গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে ঝুরঝুর করে ঝরে গেল নদীর জলে।
