সমস্যা হচ্ছে, এই নদীর ওপরে একটা পুল বাঁধা যায় কী করে।
চেষ্টা যে হয়নি, তা নয়। অনেক পরিশ্রম, অনেক খরচ করে, ঢের মাথা খাটিয়ে একটা সাঁকো হয়তো তৈরি করা হল। একদিন রইল, দুদিন রইল, তারপরেই–ব্যস! কোত্থেকে নেমে এল ভয়ংকর পাহাড়ি ঢল-হুড়মুড় করে একঘায়ে ভেঙে ফেলল সাঁকো, তার ইট-পাথর লোহালক্কড় যে কোন চুলোয় ভাসিয়ে নিয়ে গেল, তার আর পাত্তাই মিলল না।
শেষকালে দেশ-বিদেশের অনেক পণ্ডিত এসে, বিস্তর হিসেব-নিকেশ করে হাজার-হাজার মোহর খরচ করে এক জবর সাঁকো তৈরি করলেন। দিন কয়েক সেটা রইলও। তাপর আর কী? আবার পাহাড় থেকে নামল বরফ-গলা জলের ঘূর্ণি-হাজার-হাজার বুনো মোষের মতো ডাক ছাড়তে ছাড়তে ছুটে এল, আর অত পরিশ্রম আর খরচের সাঁকোটা, প্রায় চোখের পলকেই উধাও!
দেশের লোক চটে লাল হয়ে গেল। তারা দল বেঁধে, পতাকা-টতাকা নিয়ে শহরের মেয়রের বাড়ির সামনে এসে দারুণ চ্যাঁচামেচি করতে লাগল; হয় সাঁকোটা বানিয়ে দাও, নইলে গদি ছেড়ে দাও। মেয়রের মন খুব খারাপ হয়ে গেল। গদি না-হয় ছেড়েই দেব, কিন্তু এ কী কাণ্ড! একটা নদীর ওপরে কিছুতেই পুল বাঁধতে পারা গেল না। এ-অপমান কখনও সহ্য হয়?
অনেক রাত হয়ে গেছে, সারা শহর ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু মেয়রের চোখে আর ঘুম নেই। রাত জেগে ঠায় টেবিলের সামনে বসে আছেন। সামনে কাগজপত্র, তাতে নতুন পুল তৈরির হিসেব। ইস–এতগুলো টাকা। একেই বলে জলে যাওয়া, জলই নিয়ে গেল।
নদীর আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল দূর থেকে, মেয়রের মনে হল নদীটা তাঁকে ঠাট্টা করছে। রাগে দাঁত কড়মড় করতে করতে মেয়র বললেন, এ-নদীকে জব্দ করতে পারে–না, ভগবানও নয়, একমাত্র শয়তান। আঃ–শয়তান এসে যদি সাঁকোটা বেঁধে দিত।
বলবার অপেক্ষামাত্র। সঙ্গে সঙ্গে দরজা ঠেলে মেয়রের চাকর এসে ঢুকল।
হুজুর, শ্রীশয়তান এসেছেন দেখা করতে।
মেয়র ভয়ানক চমকে বললে, কে এসেছে?
নাম বললেন–শ্রীশয়তান।
শয়তান! মাঝরাত্তিরের এই থমথমে নির্জনতায় একবারের জন্যে মেয়রের হাত-পা ভয়ে হিম হয়ে গেল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, আচ্ছা, পাঠিয়ে দাও ভেতরে।
চাকর চলে গেল এবং শয়তান এসে ঢুকল ঘরে। চেহারা দেখে মনে হয়, পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশের মতো বয়েস হবে। উঁচু চোয়াল, থুতনিতে ছাগল-দাড়ি, লম্বা মুখ, বাজপাখির ঠোঁটের মতো নাক। কোটরের ভেতরে চোখ দুটো দুটুকরো আংরার মতো জ্বলছে। অনেকটা জার্মানদের মতো তার পোশাক, পরনে লাল টকটকে প্যান্টুলুন, গায়ে একটা লম্বা কালো কোট–আগুনরঙা তার উঁচু কলার। সাকাসের ক্লাউনরা যেমন পরে–তেমনি একটা চুড়োওলা কালো টুপি তার মাথায় তার ওপরে রক্তলাল একটা পাখির পালক থেকে-থেকে দুলে উঠছে। পায়ে তার দুটো গোল-গোল জুতো শয়তানের পায়ের পাতা ছাগলের মতো বলে সে অন্য জুতো পরতে পারে না।
মেয়র কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে চেয়ে রইলেন শয়তানের দিকে। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে, বেশ খাতির করে, শয়তানকে সামনের চেয়ারটাতে বসালেন।
তারপর বন্ধু–একটু মিটমিট করে হেসে, মিঠে গলায় শয়তান বললে, শেষ পর্যন্ত বুঝি আমাকেই দরকার পড়ল তোমাদের।
মেয়র খুব বিনীত হয়ে বললেন, আপনি না হলে আমাদের তো আর গতি দেখছি না।
ওই হতচ্ছাড়া পুলটার জন্যে তাই না?
আজ্ঞে, আপনি তো অন্তর্যামী, সবই জানেন।
পুলটা বুঝি খুবই দরকার?
আজ্ঞে, নইলে যে আমরা নদী পার হতে পারছি না কিছুতেই।
শয়তান বললে, হুম।
একটু চুপ করে থেকে, হাত কচলে মেয়র বললেন, তা দেখুন শয়তান মশাই, আপনি তো অতি মহৎ, দয়া করে ওই সাঁকোটা যদি আমাদের তৈরি করে দিতেন–
মুচকি হেসে শয়তান বললে, আমিও ওই প্রস্তাব নিয়েই তোমার কাছে এসেছি।
তাহলে কীভাবে কাজটা
পারিশ্রমিক পেলেই করে দেব।–শয়তান তার জ্বলন্ত চোখ দুটো মেলে মেয়রের মুখের দিকে চেয়ে রইল। তার দৃষ্টিতে শয়তানী দুর্বুদ্ধি ঠিকরে পড়ছিল।
মেয়র একটু কুঁকড়ে গিয়ে বললেন, সে তো বটেই–সে তো বটেই। পারিশ্রমিক তো দিতেই হবে।
চেয়ারে নড়ে-চড়ে, পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে শয়তান বললে, আমি যেরকম পুল তৈরি করে দেব, তা হবে সবার সেরা। এমনটি আর কেই কখনও দেখেনি।
তাতে আমারও কোনও সন্দেহ নেই মাথা নেড়ে জবাব দিলেন মেয়র। তারপর আস্তে-আস্তে বললেন, এর আগের সাঁকোটা তৈরি করতে আমাদের ছহাজার মোহর খরচ হয়েছিল। আমরা এবার তার দ্বিগুণ পর্যন্ত খরচা করতে পারি কিন্তু তার বেশি আপনাকে আমরা দিতে পারব না।
মোহর-সোনা! শয়তান হেসে উঠল : তোমাদের সোনা দিয়ে আমি কী করব? আমি তো যত ইচ্ছে ওসব তৈরি করতে পারি। দেখবে?
ঘরের ভেতরে ফায়ার-প্লেসে ঝাঁ ঝাঁ করে আগুন জ্বলছিল। টক করে উঠে পড়ল শয়তান, তারপর ফায়ার-প্লেসের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে গনগনে রাঙা একটা কয়লা তুলে নিলে। যেন রুটির দোকান থেকে একখানা কেক তুলে নিয়েছে–ভাবখানা এইরকম।
সেইটে মুঠো করে এনে সে মেয়রকে বললে, হাত পাতো।
মেয়র উসখুস করতে লাগলেন।
শয়তান বললে, কিছু ভয় নেই,–হাত পাতোই না।
অগত্যা মেয়র হাত পাতলেন।
কিন্তু এ কী। শয়তান তাঁর হাতে যা দিলে–সে তো জ্বলন্ত কাঠকয়লা নয়। সেটা যে মস্ত একটা খাঁটি সোনা! আর কী কনকনে ঠাণ্ডা সেটা। যেন এই মুহূর্তে সেটাকে খনি থেকে তুলে এনেছে কেউ।
