এত করে যে টাক পরিষ্কার করে দিলাম, তার কোনও কৃতজ্ঞতা আছে নাকি? হলধরদা যাচ্ছেতাই রকমের ভেংচি কেটে বললে, থাম-থাম, ওস্তাদি করিসনি। তুই-ই তো গোলমাল করে দিলি–তাইতেই বেসামাল হয়ে কোমরে কুঁদোর ঘা লেগে গেল। কিন্তু হাতের টিপ দেখেছিস তো? মাকাল দুটোকে ঠিক নামিয়েছি!
–তা নামিয়েছ। আর পড়েওছে ঠিক তাক-মাফিক। আমার নাকে আর তোমার টাকে।
খুব হয়েছে। চল এখন। পাখি না মেরে আজ কিছুতেই ফিরছি না! তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বাহাদুরির হাসি হাসল : আরে, আমি কি আর জানিনে যে ও-দুটো মাকাল? হাতের টিপ কীরকম, সেইটেই দেখিয়ে দিলাম তোকে।
আমার নাকটা ব্যথা করছিল। ক্ষুণ্ণ হয়ে বললাম, তা বটে, তা বটে।
আবার খানিক দূর এগোতেই আমি দেখতে পেলাম–একটা ঘাসঝোপের পাশে একজোড়া পাখি চরছে। তিতির–নির্ঘাত তিতির।
আর তখুনি ধাক্কা দিলাম হলধরদাকে।
কিন্তু হলধরদা যে এমন পলকা তা কে জানত! ধাক্কা খেয়েই বোঁ করে সামনের দিকে ছুটল। তিতির-টিতির সব টপকে, একেবারে ঘাস-ঝোপটায় গিয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
উঠে দাঁড়িয়েই হলধরদা চেরা গলায় সিংহনাদ করলে–প্যালা!
আমি তখন কাছে এগিয়ে এসেছি। বললাম, কী আদেশ সেনাপতি?
–থাম, আর মস্করা করতে হবে না। কী আক্কেলে অমন ধরে ধাক্কা দিলি ইস্টুপিড কোথাকার
বাঃ, তুমিই তো পাখি দেখলে ধাক্কা দিতে বলেছিলে। আমি দেখলাম একজোড়া তিতির
তাই আমাকে ভেবেছিলি বুঝি গুলতির গুলি? ভেবেছিলি, একেবারে সোজা ঠেলে পাখির গায়ে ফেলে দিবি? ইস্টুপিড গাধা! তোকে সঙ্গে এনেই ভুল হয়েছে! চলে যা এখান থেকে, আমি আর তোর মুখদর্শনও করতে চাইনে!
–এবার মাপ করো হলধরদা। আমি হাতজোড় করলাম।
–আর চ্যাঁচাবি না?
–না।
–আর চিমটি কাটবি না?
কক্ষনো না।
–পাঞ্জাব মেলের ইঞ্জিনের মতো পেছন থেকে ধাক্কা দিবি না?
ছিঃ ছিঃ–আবার!
–বেশ, কথা রইল। শুধু সঙ্গে থাকবি আর কিছু করতে হবে না।
–একেবারে কিছুই না?
–না–না। হলধরদা চেঁচিয়ে উঠল : এক নম্বরের ভণ্ডুলরাম তুই। যা বলব, ঠিক উলটোটি করে বসে থাকবি। তোকে কিছু করতে হবে না, শুধু পাখি পড়লেই কুড়িয়ে নিবি।
–আচ্ছা, আচ্ছা তাই হবে–মাথা নেড়ে আমি সম্মতি জানিয়ে দিলাম।
.
হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে।
এতক্ষণ শিকার কিছু হয়নি। সত্যি বলছি, আমি চাঁচাইনি, কিচ্ছু করিনি–একেবারে মুখ বুজে পেছনে পেছনে চলে এসেছি। তবু হতচ্ছাড়া পাখিগুলো যে কী করে টের পেয়েছে, ওরাই জানে। আমাদের দেখার সঙ্গে সঙ্গেই হাওয়া। একটা ডাহুক একটু সময় দিয়েছিল, কিন্তু হলধরদা-ওই যে ওই যে বলে লাফিয়ে ওঠায় সেটা পালিয়ে গেল।
হলধরদা বলেছিল, যখন তুই সঙ্গে এসেছিস, তখনই জানি আজকের শিকারের নামে লবডঙ্কা।
আমি বলেছিলাম, একবার আমার হাতে যদি বন্দুকটা দিতে
ইঃ, আম্বা দ্যাখো না? আমার মতো বড় শিকারিই জেরবার হয়ে গেল, আর এই পুঁটিরাম এসেছেন শিকার করতে!
হলধরদা একেবারে দমিয়ে দিয়েছিল আমাকে।
শেষে এসে গেলাম নদীর ধারে।
হলধরদা নিজেই দেখল এবার জলের ধারে একজোড়া বক।
বক মারব প্যালা?
বক মেরে কী হবে? কেউ তো খায় না।
–আরে, পালক ছাড়িয়ে নিয়ে গেলে বকও যা, বুনো হাঁসও তাই। না হয়, তোকেই দিয়ে দেব।
আহা, কী দয়া রে! আমাকে বক দেখাচ্ছেন! দু-একটা ঘুঘু হরিয়াল মেরে দিলেও নয় বোঝা যেত, বক দান করে আর দরকার নেই।
আমি ব্যাজার হয়ে বললাম, আচ্ছা, আচ্ছা, বকের ব্যবস্থা পরে হবে। আগে মারো তো দেখি।
-আরে, মারা আর শক্ত কী! ওরা তো মরেই রয়েছে। বলে হলধরদা বললে, আমার কোমরটা জাপটে ধর দেখি প্যালা।
–আবার কোমর জাপটাব কেন?
বলা তো যায় না বন্দুকের মর্জি! এক ধাক্কায় যদি
তার মানে আমাকে সুষ্ঠু ওড়াতে চাও? ওসবে আমি নেই হলধরদা! বলে আমি সরে দাঁড়ালাম।
–মাইরি প্যালা, লক্ষ্মী ভাইটি, এবারটি কথা শোন। তোর মনের ব্যথা আমি বুঝেছি। যদি একটা বকও মারতে পারি, তাহলে তোকে একবার আমি বন্দুকটা ছুঁড়তে দেব। দিব্যি গেলে বলছি–হলধরদার স্বর করুণ হয়ে এল।
–ঠিক বলছ?
–ঠিক বলছি।
–মা কালীর দিব্যি?
মা কালীর দিব্যি।
আমি হলধরদার কোমর সাপটে ধরলাম, প্রাণপণে।
হলধরদা বন্দুক বাগাল। বললে, জয় মা রক্ষাকালী, জোড়া বক দিস মা
দ্রুম্! তারপরেই ধপাস আর ঝপাস।
আবার মোক্ষম ঘা মেরেছে বন্দুকের কুঁদো। হলধরদা ক্যাঁক করে উঠল, তারপরে আমাকে নিয়ে সোজা ডিগবাজি খেয়ে পড়ল একেবারে নদীর মধ্যে।
যেমন কনকনে ঠাণ্ডা জল–তেমনি স্রোত। প্রায় কুড়ি হাত সাঁতরে উঠতে হল ডাঙায়। আমি আবার বেশ খানিক জল গিলেও খেয়েছি, একটু হলেই মহাপ্রাণটি বেরিয়ে যেত।
ডাঙায় উঠে দশ মিনিট ঠকঠক করে কাঁপতে লাগলাম দুজনে। তারপর এদিক-ওদিক তাকিয়ে আমি বললাম, হলধরদা, তোমার বন্দুক?
ও হতচ্ছাড়াকে নদীতেই বিসর্জন দিলাম! উঃ, পাঁজরায় এমন লেগেছে যে সাতদিনে সে ব্যথা সারলে হয়। তার ওপর যা ঠাণ্ডা নিমোনিয়ায় না পড়লেই বাঁচি!
মাথার ওপরে উড়ন্ত বকজোড়া ক্যাঁ ক্যাঁ করে উঠল।
শয়তানের সাঁকো
একদিকে একটি ভারি সুন্দর শহর, আর একদিকে গ্রাম, মাঠ, বন-জঙ্গল। সব মিলে চমৎকার। কিন্তু মুস্কিল হচ্ছে এই যে, শহরের লোক গাঁয়ে আসতে পারে না–গাঁয়ের লোকের শহরে যাওয়ার জো নেই। মাঝখানে একটা দারুণ বাধা।
কিসের বাধা? মাঝখান দিয়ে বয়ে যাচ্ছে দুর্দান্ত এক পাহাড়ে নদী। এমন কিছু চওড়া তা নয়, কিন্তু যেমন সে গভীর, তেমনি প্রবল তার স্রোত। জায়গাটা হচ্ছে সুইটজারল্যান্ড। একদম পাহাড়ের দেশ–পাথরে-পাথরে ঘা দিয়ে ফেনিয়ে-ফেনিয়ে ঝড়ের বেগে বয়ে চলেছে নদী। তার গর্জন শুনলে কানে তালা ধরে যায়, কিছুক্ষণ তার দিকে চেয়ে থাকলে মাথা ঘুরতে থাকে।
