ইস, কী বোম্বাই চালটাই দিলে। বলতেও যাচ্ছিলাম সে কথা, কিন্তু বুদ্ধি করে সামলে নিলাম। খামকা চটিয়ে লাভ কী? বন্দুকটা একবার হাতে পাওয়ার আশা এখনও ছাড়িনি।
হলধরদা বললে, নেঃ রাস্তার মধ্যে আর বকিসনি। সঙ্গে যাবি তো চল। কিন্তু আগেই সাবধান করে দিচ্ছি–যদি পাখি উড়িয়ে দিস
তা হলে বন্দুকের ঘায়ে আমাকে সুদ্ধ উড়িয়ে দিয়ো–আমিই বলে দিলাম শেষটা।
আমবাগানের মধ্যে দিয়ে টিপি-টিপি পায়ে দুজনে চলেছি। বন্দুক বাগিয়ে হলধরদা পাখি খুঁজছে। আর আমি যথাসাধ্য ওকে সাহায্য করতে চেষ্টা করছি।
হঠাৎ আমি আনন্দে চেঁচিয়ে উঠলাম : হলধরদা, ওই যে একজোড়া ঘুঘু!
কই, কোথায়? বলে আরও চেঁচিয়ে উঠল হলধরদা!
ব্যস, আর দেখতে হল না। সেই চিৎকারেই ঘুঘু দুটো উড়ে পালাল। হলধরদা রুখে দাঁড়াল আমার দিকে।
–চ্যাঁচালি যে?
–চ্যাঁচালাম কই? তোমাকে তো পাখি দেখালাম।
–তাই বলে চ্যাঁচাবি? অমন গাধার মতো ডাক ছাড়বি?
বাঃ রে, তুমিও তো ষাঁড়ের মতো চেঁচিয়ে উঠলে। তাই তো পালিয়ে গেল।
–এঃ, ভারি ভুল হয়ে গেছে। হলধরদা টাকটা চুলকে নিলে; তোরই দোষ। তুই চেঁচিয়ে উঠেই আমাকে এমন ঘেবড়ে দিলি যে কেমন সব গোলমাল হয়ে গেল। শোন–এর পরে পাখি দেখলে আর চ্যাঁচাবি না।
-তবে কী করব?
–এই, একটা খোঁচা-টোঁচা, কিংবা একটা চিমটি–বুঝেছিস তো?
বিলক্ষণ! এ বুঝতে আর বাকি থাকে। আমি পটলডাঙার প্যালারাম, চিমটি কাকে বলে টেনিদার দৌলতে তা ভালোই বুঝি। সানন্দে মাথা নাড়লাম।
আরও খানিকটা এগিয়ে হলধরদা বললেন : এঃ, আবার ভুল হয়ে যাচ্ছে। এভাবে তো হাঁটা চলবে না। হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হবে।
বলো কী! চারদিকে কাঁটা, বিছুটি–তার মধ্যে হামাগুড়ি দিতে হবে?
–তুই শিকার করতে এসেছিস, না মোগলাই পরোটা খেতে এসেছিস? হলধরদা ভেংচি কাটল; অত আরাম চলবে না। নে–হামা দে। এইটেই নিয়ম। আমি অনেক শিকারিকে হামাগুড়ি দিয়ে যেতে দেখেছি।
–শিকার সামনে না থাকলেও হামা দিতে হবে?
হ্যাঁ, দিতে হবে। বেশি বকিসনি প্যালা, যা বলছি তাই কর।
ইঃ, এ আবার কী ফ্যাচাং রে বাপু! আর সেই আমবাগানে হামা দেওয়া কি চারটিখানি কথা! তিন হাত না-যেতেই হাঁটুর ছাল যাবার জো। কেটে পড়া দরকার কি না ভাবছি, তার আগেই লাফিয়ে উঠল হলধরদা : উরে-বাপ-গেছি গেছি!
বলে বন্দুকটা নামিয়ে প্রাণপণে পা চুলকোতে লাগল।
কী হল?
বিছুটি। ইস কী জ্বলছে রে! দাঁতমুখ খিঁচিয়ে এমনভাবে পা চুলকে চলল যে মনে হল ছাল-টাল সব তুলে ফেলবে।
–তাহলে আর হামা দিয়ে দরকার নেই বোধহয়? আমি জানতে চাইলাম।
না—না–না! হলধরদা মুখ সিঁটকে বললে, ওসব আনাড়ি শিকারির জন্যে। ভালো শিকারিরা বুক চিতিয়েই হাঁটে। বলে বন্দুক তুলে নিয়ে হাঁটতে শুরু করলে। অবশ্য সবটা বুক চিতিয়ে নয়, মাঝে মাঝে থেমে দাঁড়িয়ে পা চুলকে নিতে হচ্ছিল।
একটু পরেই সামনে একটা জলা। সেই জলার দিকে যেই আমার চোখ পড়েছে, অমনি আমি হলধরদার পিঠে কটাং করে চিমটি দিয়েছি একটা।
–উরেঃ বাপস! বলে হলধরদা লাফিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে জলা থেকে তিনটে পাখি উড়ে পালাল একসঙ্গে।
চোখ পাকিয়ে হলধরদা আমাকে বললে, এটা কী হল–আঁ? বলি, এটা কী হল?
–কেন, কী করেছি? গো-বেচারার মতো আমি জানতে চাইলাম।
কী করেছি? হলধরদা দাঁত খিঁচিয়ে বললে, অমন করে রাম-চিমটি দিলি যে? পিঠের মাংস প্রায় তুলে নিয়েছিস এক খাবলা! উঃ উঃস্-সস! একে পায়ের জ্বলুনিতে মরছি, তার ওপরে–
বললাম, আমার কী দোষ? পাখি দেখলে তুমি চিমটি দিতে বলেছিলে। আমি দেখলাম, জলায় তিনটে জলপিপি বসে আছে–
-তাই বলে অত জোরে চিমটি কাটবি?
–আচ্ছা, এবার থেকে আস্তে কাটব।
–থাক, হয়েছে। চিমটি কেটে আর দরকার নেই তোমার। এবার একটা ধাক্কা দিবি বুঝেছিস তো?
বুঝেছি।
জলা পার হয়ে একটা জাম-জারুল-গামারের বন। চারদিকে ছায়া-ছায়া ঠাণ্ডা। সেখানে ঢুকেই হলধরদা দেখি সোজা মাথার ওপর বন্দুক তাক করছে।
পাখি পেলে বুঝি? আমি চেঁচাতে যাচ্ছিলাম, হলধরদা আরও জোরে চেঁচিয়ে বললে, চুপ কর, বলছি! গাছের ওপরে দুটো লাল পাখি দেখা যাচ্ছে।
লাল পাখি দুটো ভালো–এত চেঁচানোতেও পালাল না। তাকিয়ে দেখে আমার কেমন সন্দেহ হল। সে কথা বলতেও যাচ্ছি, এমন সময় : ধ্রুম ধ্রাস্!
দ্রুম্ হল বন্দুক–আর ধ্রাস–হলধরদা। অর্থাৎ গুলি ছুঁড়েই কুঁদোর ঘা খেয়ে পড়ে গেল মাটিতে।
-এঃ–এঃ—
কিন্তু তার আগেই লাল পাখি দুটো পড়েছে। একটা আমার নাকে আর একটা হলধরদার টাকে। টিপ আছে হলধরদার!
কিন্তু রাম রাম, কী বিচ্ছিরি পাখি! পড়েই ফটাস করে ফাটল। কী সব বদগন্ধওয়ালা কালো কালো জিনিস আমার নাকে-মুখে ঢুকে গেল, আর হলধরদার টাকের যে বাহার খুলল সে আর কী বলব!
পাখি নয়–দুটো টুকটুকে পাকা মাকাল। গাছের অনেক ওপরে ভালো করে দেখা যাচ্ছিল না, তাই খানিকক্ষণ আমরা দুজনেই চুপচাপ। আমি শোকে মুহ্যমান আর হলধরদা কাঁকাল চেপে ধরে বসে আছে–টাকটা পর্যন্ত মুছতে পারছে না। হলধরদার বন্দুকই ওঁকে একখানা মোক্ষম কুঁদোর ঘা বসিয়েছে।
প্রায় পাঁচ মিনিট পরে হলধরদা উঠে দাঁড়াল। অবস্থা দেখে দয়া হল আমার। কয়েকটা শুকনো পাতা দিয়ে টাকটা সাফ করে দিলাম।
–যাত্রাটাই খারাপ।–না হলধরদা? দুটো মাকাল শিকার করলে, তার ওপরে কুঁদোর ঘা! ভাগ্যিস ধাক্কাটা ওপুর দিক থেকে এসেছিল, নইলে এতক্ষণে হয়তো তোমাকে গঙ্গার ওপারে নিয়ে ফেলত।
