আসলে আমার খটকা ধরিয়েছিল পোস্টমর্টেম রিপোর্টের একটি কথা।
অস্বাভাবিক–অমানুষিক শক্তিতে ছুরিটা চোখের মধ্যে বিঁধিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
অস্বাভাবিক–আনুষিক শক্তি। প্রোফেসর ওয়াই অবশ্যই খুব সবল স্বাস্থ্যবান পুরুষ, কিন্তু অমানুষিক শক্তি। কথাটা ক্রমাগত পাক খেতে লাগল ঘরের ভেতরে।
আমি ব্যালিস্টিক একসপার্ট–অর্থাৎ গোলাগুলি-বিশারদদের ডাকলুম।
আচ্ছা, মেরু অঞ্চলের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় বন্দুকের টোটা ফেঁপে যায় তো?
তাঁরা বললেন, স্বাভাবিক।
সেই টোটা বন্দুকে ভরতে তখন তো অসুবিধে হয়?
তা হতেই পারে।
আচ্ছা বলুন–এ-অবস্থায় শিকারি কী করবেন?
একটা কিছু দিয়ে টোটাটাকে ঠেলে ভেতরে দেবার চেষ্টা করবেন।
হান্টিং নাইফের হাতল ব্যবহার করতে পারে লোকে?
কেন পারবে না?–একজন বললেন, সেটা কোমরেই থাকে, আর তার কথাই মনে পড়বে সকলের আগে।
তা হলে–আমি জিজ্ঞেস করলুম, ধরুন যদি হাষ্টিং নাইফটা এমন হয় তার হাতলটা যেমন-তেমন করে তৈরি, তার পেছনে এক টুকরো লোহার ডগা বেরিয়ে রয়েছে? আর টোটাটাকে যদি জোরে ঠেলে দেওয়া যায়, তা হলে সেটা ট্রিগারের পিনের মতো কাজ করতে পারে?
তাঁরা বললেন, নিশ্চয়।
মনে করুন–আমি আবার জিজ্ঞেস করলুম, সে-ক্ষেত্রে একজন ছুরির বাঁট দিয়ে টোটাটাকে জোরে ঠেলে দিলে। লোহার ডগাটা ট্রিগার পিন হয়ে যেই কাট্রিজে ঘা মারল, অমনি গুলি বেরিয়ে গেল। তখন বন্দুকটা তো গুলি ছোটবার বেগে পেছনে এসে ধাক্কা মারবে?
হ্যাঁ, তাই নিয়ম। আগ্নেয়াস্ত্র মাত্রেই ব্যাকপুশ দেবে।
খুব জোরে?
স্বাভাবিক।
তা হলে ছুরির ফলাটা তো তখন উলটো দিকে রয়েছে। বন্দুকটা যেই হাতে ধাক্কা দিলে, অমনি ছুরিটা ফলাটা তীরবেগে গিয়ে চোখে বিঁধতে পারে?
নিশ্চয় পারে। যদি অবশ্য সেটা চোখ বরাবর থাকে।
অস্বাভাবিক–অমানুষিক জোরে বিঁধে যেতে পারে?
বন্দুকটা চোখের কাছে থাকলে তাই সম্ভব।
ধন্যবাদ, আর আমার কিছু জানবার নেই।
তা হলে এই আমার কেস। হত্যা নয়, বিশুদ্ধ অ্যাকসিডেন্ট। ওয়াই বলেছেন, গুলির আওয়াজ শোনবার আগে একবার যখন তিনি এদিকে তাকিয়েছিলেন, তিনি দেখেছিলেন, অধ্যাপক একস্ যেন তাঁর বন্দুকটা লোড করবার চেষ্টা করছেন। অতএব দুই আর দুয়ে চার।
পরম উল্লাসে খবরটা জানালুম আমার ওপরওলাকে। তিনি একটু হাসলেন। বললেন, তোমার থিয়োরি বেশ ভালো। কিন্তু একটা মস্ত ফাঁক রয়ে গেল যে ওর ভেতরে।
আমি তাঁর দিকে চেয়ে রইলাম।
তোমার থিয়োরি যদি সত্যি হয়, তা হলে প্রোফেসর একস্ ডান হাতে ছুরি আর বাঁ হাতে বন্দুক ধরবেন। আর সেক্ষেত্রে বন্দুকের ব্যাক পুশে ছোরাটা ডান চোখেই বিঁধে যাবে। কিন্তু ওটা বিধেছে বাঁ চোখে, সেটা খেয়াল রেখো।
সব মাটি। গেল আমার সাধের থিয়োরি।
আমি বিভ্রান্তের মতো বেরোলুম। কোনও থই পেলুম না। তারপর হঠাৎ মনে হল, প্রোফেসর একস তো ন্যাটাও হতে পারেন! অর্থাৎ ডান হাতের বদলে বাঁ হাত ব্যবহারের অভ্যাস তো থাকতে পারে তাঁর?
আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বে ছুটলুম তাঁর বাড়িতে। গেলুম তাঁর সহকর্মীদের কাছে।
অনুমান নির্ভুল। প্রোফেসর একস্ ন্যাটাই ছিলেন। বাঁ হাতই তিনি ব্যবহার করতেন।
কিন্তু জট কেটেও কাটে না।
অভিযানে প্রোফেসর একস-এর যে জিনিসপত্রের তালিকা পাওয়া যাচ্ছে-অর্থাৎ যা-যা তিনি সঙ্গে নিয়েছিলেন, তার প্রত্যেকটার বিবরণ পাচ্ছি, কিন্তু ছুরিটার তো কোনও সন্ধান নেই। কটি পেনসিল নিয়েছেন তারও খবর আছে–ছুরিটার উল্লেখ পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না!
তা হলে কোথা থেকে এটা এল
এমন হতে পারে যে, যাত্রার শেষ মুহূর্তে ওটা কিনে থাকবেন। কিন্তু কোথায়? শহরের কোনও দোকানে আমি ওধরনের হান্টিং নাইফের কোনও সন্ধান পেলুম না।
শেষে কি আমার ঘাটে এসে নৌকো ডুববে? আমি কি তখন জোর করে বলতে পারব, ওঁকে খুন করার জন্যে ওটাকে মাডার উইপন হিসেবে সঙ্গে নিয়ে যাননি প্রোফেসর ওয়াই?
সুতরাং আমি বেরিয়ে পড়লুম শেষ চেষ্টায়।
যে-পথ দিয়ে ওঁরা এগিয়ে গেছেন, তার প্রতিটি শহরে আমি ওই রকম একটি ছুরির দোকান খুঁজতে লাগলুম। হাজার হাজার হান্টিং নাইফ আমি দেখলুম, দেখিয়ে দেখিয়ে হয়রান হয়ে গেল দোকানদারেরা–কিন্তু ঠিক ওই জাতের ছুরি কোথাও পেলুম না।
এবার এসেছি সর্বশেষ শহরে। এখান থেকেই ওঁরা মেরু অঞ্চলে রওনা হয়ে গেছেন। কিন্তু না–এখানেও ও-ছুরির সন্ধান মিলল না।
হতাশ হয়ে যেদিন ফিরে আসব, সেদিন চলছিলুম, শহরের একটা পুরনো অঞ্চল দিয়ে। শ্রীহীন ছোট ছোট দোকান দুধারে, কেনা-বেচাও খুব কম। তার মধ্যে হঠাৎ ওই তো! ওই ছোট্ট দোকানটিতে ঠিক ওই ধরনের ছুরি ঝুলছে দু-তিনটে ওই জিনিস।
এক বুড়ো তার মালিক। সেই ওগুলো তৈরি করে।
হাতে নিয়ে দেখলুম, যেমন-তেমন কাঠের বাঁটে তৈরি সব সাদামাটা ছুরি। আর প্রায় প্রত্যেকটার পেছনেই একটু করে লোহার মুখ বেরিয়ে রয়েছে।
বুড়ো বললে, শিকারের সিজনে ওগুলো অনেক বিক্রি করি আমি।
আচ্ছা–অমুক মাসে, বুড়ো এক প্রফেসর কি এসেছিলেন দোকানে? তিনি কি কিনেছিলেন একটা? এই রকম চেহারা, এই রকম গোঁফ
দাঁড়ান–দাঁড়ান। প্রোফেসর একটু খিটখিটে, ভুরু কুঁচকে রয়েছেন, এই তো? দাঁড়ান-খাতাটা খুলি।
খাতায় পাওয়া গেল নাম। প্রোফেসর একস।
এই হল কেস। আদালতের রায় বললে, এটা একটা আকস্মিক দুর্ঘটনা।
