প্রোফেসর ওয়াইয়ের মৃত্যুর আয়োজন তৈরিই ছিল। কেউ তাঁর সাক্ষী ছিল না, তাঁর কথা বিশ্বাস করবার মতো কেউ ছিলেন না, বরং বাড়তির মধ্যে ছিল একস-এর চিঠিগুলি আর ওয়াইয়ের নিজের সেই মারাত্মক ডায়েরি।
কিন্তু নিরপরাধের মুক্তির সূত্রও থাকে। সে-সূত্রও ছিল পোস্টমর্টেম রিপোর্টের মধ্যে : অস্বাভাবিক, অমানুষিক শক্তিতে ছোরাটা চোখের মধ্যে বিঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে।
একটি জানালা খুলতে
ঘুম থেকে উঠে ঘনশ্যাম ঘোড়ুই আবিষ্কার করল, জানালাটা খোলা যাচ্ছে না। জানালায় নতুন রং করা হয়েছিল, তার ওপর কাল রাত্তিতে গেছে ঝমঝম বৃষ্টি। সেই বৃষ্টিতে জানালার কাঠ কেঁপে উঠেছে তার কাঁচা রং–স্রেফ বজ্র আঁটুনি যাকে বলে।
প্রথমে জয় গুরু বলে ছিটকিনি ধরে টানতে লাগল, কিছুই হল না। তারপর জয় মা কালী বলে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে হেঁচকা মারতে লাগল–ফল যথা পূর্বং। লাভের ভেতর পাঁকাটির মতো আঙুলগুলো খট খট করতে লাগল, হাতের তেলো লাল হয়ে ফোঁসকা পড়বার জো হল। গা দিয়ে কালঘাম ছুটে বেরুল। হাল ছেড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ বসে বসে হাঁপাতে লাগল ঘনশ্যাম।
আচ্ছা প্যাঁচে পড়া গেল এই সকালবেলায়। অথচ ঘরে এই একটি মাত্র জানালা খুলতে পারলে আলো বাতাস সব বন্ধ, তায় আবার বাইরে থমথমে মেঘ জমাট বেঁধে আছে।
বাড়িটা দোতলা। ঘনশ্যাম ঘোড়ই ঝোলা গুড় আর চিটে গুড়ের কারবারী, একতলায় তার দোকান গুদাম এইসব। দোতলায় এই একটি ঘর, তাতে তার শয়ন পর্ব চলে। কয়েকটা চিটে গুড়ের হাঁড়িও সাজানো আছে একদিকে। রান্নাবান্না, সময়মতো একলা বসে হিসেব-পত্তর মেলানো, সবই চলে ওই ঘরের ভেতর। অতএব সবেধন নীলমণি জানালাটাকে খুলতে না পারলে সারাদিন লণ্ঠন জ্বেলে রাখতে হবে। তাতে খামকা একরাশ কেরোসিন বরবাদ।
ঘনশ্যাম জবরদস্ত কৃপণ। স্ত্রী নেই, খুব সম্ভব কিপটেমির জ্বালায় সে বেচারা না খেয়ে মরেছে। একটা মাত্র জোয়ান ছেলে–সে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যোগ দিয়েছে মিলিটারিতে। সেজন্য ঘনশ্যামের কোনও দুঃখ নেই। অনেক খরচা বেঁচে গেছে, স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে সে। বাড়িতে একা। কর্মচারী বলতে আছে একজন মাত্র-জলধর জানা। কিন্তু সে থাকে মাইল দেড়েক দূরে। বেলা দশটা নাগাদ দোকানে আসবে। তার মানে আরও তিন ঘণ্টা ঘনশ্যামকে একা থাকতে হবে এবং তিন ঘণ্টা ধরে জানালাটাকে কিছুতেই বন্ধ রাখা যায় না।
কাজেই বাধ্য হয়ে পালোয়ান মতো কাউকে ডাকা দরকার। একটা কুলিটুলি হলেই সুবিধা। কিন্তু যাকেই ডাকা যায়–কম করে অন্তত চার আনা পয়সাও তাকে বকশিশ দিতে হবে। ভাবতেই ঘনশ্যামের মন খারাপ হয়ে গেল।
গুটি গুটি ব্যাজার মুখে রাস্তায় বেরুল ঘনশ্যাম। আর বেরুতেই সঙ্গে সঙ্গে খুশির হাসিতে তোবড়ানো মুখ ভরে উঠল তার। বরাত একেই বলে।
একটু দূরেই গান গাইতে গাইতে আসছে গঙ্গারাম। গঙ্গারাম হালদার। তার বিকট বাজখাই গানের তাড়ায় উর্বশ্বাসে গোটা তিনেক কুকুর ছুটে পালাল।
গঙ্গারামের মাথা মোটা, লেখাপড়া বেশি দূর এগোয়নি। বাপের অবস্থা তার ভালো, জমিজমা আছে। ছেলের মগজ নিরেট দেখে ধর্মের নামে ছেড়ে দিয়েছে তাকে।
লেখাপড়া নাই করুক, ডন-বৈঠক করে গঙ্গারাম শরীর বাগিয়েছে একখানা। তিনটে বাঘে তাকে খেয়ে শেষ করতে পারবে না। গলার আওয়াজে তার মেঘ ডাকে। পাড়ায় শখের যাত্রাটাত্রা হলে সে তাতে ভীম সাজে। পার্ট-টার্ট বিশেষ করতে হয় না, গদা ঘুরিয়ে গোটাকয়েক গর্জন করলেই আসরসুদ্ধ লোকের পিলে চমকে যায়।
ঘনশ্যাম গঙ্গারামকে দুচক্ষে দেখতে পারে না। কিন্তু আজ গঙ্গারামকে দেখবামাত্র তার প্রাণ-মন জুড়িয়ে গেল! ঝোলা গুড়ের চাইতেও মিঠে সুরে ডাকল : বাছা গঙ্গারাম!
গঙ্গারাম বললে, কী বলছেন ঘনু জ্যাঠা?
–আমার ঘরের জানালাটা শক্ত হয়ে এঁটে বসেছে, বাবা, কিছুতেই খোলা যাচ্ছে না। একটু যদি টেনে খুলে দাও
সঙ্গে সঙ্গে গঙ্গারাম উৎসাহিত হয়ে উঠল; এ আর শক্ত কথা কী জ্যাঠা, এখুনি খুলে দিচ্ছি। জানালা তো জানালা, তোমার বাড়ির সব দরজা কবজাসুদ্ধ টেনে খুলে বের করে দেব।
না-না-না–ঘনশ্যাম আঁতকে উঠল : দরজা-টরজা সব ঠিক আছে, তোমায় কিছু করতে হবে না। শুধু জানালাটা খুলে দিলেই হবে।
–এ তো এক মিনিটের কাজ। চলুন।
কিন্তুদেখা গেল, জানালা অত সহজেই খোলবার পাত্র নয়। দাঁত কিড়মিড় করে মারো জোয়ান হেঁইয়ো। বলে ডাকাত-পড়া হাঁক ছেড়ে পনেরো মিনিট সবরকম কসরত করে গঙ্গারামও ঘোল খেয়ে গেল। ঝপাৎ করে বসে পড়ল মেজের উপর, ফোঁস ফোঁস করে হাঁপাতে লাগল।
–অনেক জানালা দেখেছি মশাই, কিন্তু এমন বিদঘুঁটে বিচ্ছিরি জানালা তো কখনও দেখিনি।
-বাবা গঙ্গারাম, তুমিও পারলে না।–ঘনশ্যাম কাঁদো কাঁদো হয়ে গেল : তা হলে কি ও জানালাটা আর কোনওদিন খোলা যাবে না? চিরদিনই বন্ধ হয়েই থাকবে?
গঙ্গারামের আত্মসম্মানে ঘা লাগল।
বন্ধ থাকবে–থাকলেই হল? ইয়ার্কি নাকি? জানালা না খুলে যদি আর বাড়ি ফিরি তা হলে আমার নাম গঙ্গারামই নয়। গঙ্গারামই গোঁ গোঁ করতে লাগল। তারপর মিনিটখানেক চোখ পাকিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল : আচ্ছা, এবার–এগেন!
বলেই কাঠের চেয়ারটা হড়হড়িয়ে টেনে নিয়ে গেল। বললে–জানালার মাথার দিকটা হাতে পাচ্ছি না। ওইখানেই আটকে আছে মনে হচ্ছে। এবার মাথাটা ধরে টেনে দেখব।
