গৌরী! গৌরী!
আর্তস্বরে নৃপেন রায় চেঁচিয়ে উঠলেন। গৌরীর জবাব এল না, এল হাসির শব্দ। কাচের জানলার মধ্যে দিয়ে সে ব্যাপারটা দেখছে। আর একটা নতুন খেলা, একটা নতুন আনন্দ! নেশা!
প্রচন্ড বেগে ছোবল মারল সাপটা। আটত্রিশ বোরের রিভলবারটা ড্রয়ার থেকে বার করবার আর সময় নেই। শেষ চেষ্টায় সাপকে আঁকড়ে ধরতে গেলেন নৃপেন রায়, পারলেন না। মণিবন্ধনের ওপর দংশনের তীব্র জ্বালা অনুভব করতে করতে দেখলেন কাচের জানলার হাততালি দিয়ে দিয়ে হেসে উঠছে গৌরী। সে প্রাণ পেয়ে উঠেছে, কোথাও কিছু বাকি নেই তার; আর শঙ্খচূড় সাপের মতো তারও জান্তব চোখ আচ্ছন্ন হয়ে গেছে আদিম হিংসার নীল আলোয়।
একটি খুনের ঘটনা
গোয়েন্দা বা অপরাধ কাহিনীর সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, ঘটনার আশপাশে যারা তয়েছে, তাদের প্রত্যেককেই সন্দেহের আওতার মধ্যে রাখা হয়। কিন্তু চারদিকের সাক্ষ্য প্রমাণে নিশ্চিতভাবে যাকে অপরাধী বলে মনে হয়, তাকে যদি নিরপরাধ ধরে নিয়ে, তার অনুকূলে তদন্ত শুরু করা হয়, তা হলে কী রকমটা দাঁড়ায়?
সোভিয়েত দেশে তদন্তের প্রণালী আজকাল এই। ওখানকার একজন ইন্সপেক্টরের জবানবন্দিতে একটা ঘটনা শোনাই। গল্পটা–না এটা গল্প নয়, সম্পূর্ণ সত্য কাহিনী–একটু সংক্ষেপ করে তোমাদের বলছি।
মেরু অঞ্চলে গবেষণার জন্যে গিয়েছিলেন দুজন অধ্যাপক। এদের একজন অল্পবয়সী, আর একজন বুড়োমানুষ। দুজনেই নামজাদা বিজ্ঞানী, দুরন্ত পণ্ডিত, কিন্তু সম্পর্কটা একেবারে সাপে-নেউলে।
পণ্ডিতে পণ্ডিতে যা হয়। এর মত উনি মানেন না। এঁর থিয়োরির উনি প্রতিবাদ করেন। কিন্তু মতভেদ এমন একটা স্তরে পৌঁছেছিল যে ইনি ওঁর নাম শুনলে একেবারে জ্বলে যেতেন। অথচ, অবস্থাচক্রে দুজনকে একই সঙ্গে পাঠানো হল গবেষণা করতে।
সেই ধু-ধু তুষারের দেশে দুই বৈজ্ঞানিক একসঙ্গে তাঁবু ফেলে থাকেন, গবেষণা করেন। আর একজন সহকারী আছেন এঁদের সাহায্য করেন। তিনি দেখেন, রাতদিন দুই পণ্ডিতে সমানে তর্কাতর্কি খেয়োখেয়ি চলছে।
বুড়ো বৈজ্ঞানিক-ধরা যাক প্রোফেসর একস, একটা চিঠিতে লিখছেন : আমার সঙ্গে এই বানরটাকে কেন যে পাঠানো হল। ওকে আমি এক মুহূর্ত সহ্য করতে পারি না–দেখলেই আমার পিত্তিসুদ্ধ জ্বালা করে।
আর ছোকরা বৈজ্ঞানিক–প্রোফেসর ওয়াই–তাঁর ডায়েরিতে লেখেন : বুড়ো ক্রমশই সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সব সময়ে ওর একগুয়েমি। মধ্যে-মধ্যে আগুন ধরে যায় আমার মাথায়। একদিন নিশ্চয় আমি ওকে খুন করব।
অবস্থা যখন এই রকম, তখন একদিন খবর এল, প্রোফেসর একস্ খুন হয়েছেন।
ব্যাপারটা কীরকম?
দুই বৈজ্ঞানিক এবং তাঁদের সহকারী একসঙ্গে বেরিয়েছিলেন হাঁস শিকারে। একটা জলার একধারে দাঁড়িয়েছিলেন একস– কিছু দূরে ওয়াই হাঁস খুঁজছিলেন। কী একটা জিনিস আনতে সহকারী চলে গিয়েছিলেন তাঁবুতে।
সহকারী যখন ফিরে আসেন, তখন একটা বন্দুকের আওয়াজ তাঁর কানে যায়। তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই, শিকারে বন্দুকের আওয়াজ হবেই।
কিন্তু ফিরে এসে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন তিনি।
প্রোফেসর একস্ পড়ে আছেন মাটিতে। হাতের বন্দুকটাও পড়ে রয়েছে তাঁর পাশে। তাঁর বাঁ চোখে শিকারের ছুরি-অর্থাৎ হান্টিং নাইফটা একেবারে বাঁট পর্যন্ত ঢোকানো। চোখের ভেতর দিয়ে সে-ছুরির ফলা একেবারে মস্তিষ্ক পর্যন্ত চলে গেছে। মৃত্যু হয়েছে তৎক্ষণাৎ।
আর তাঁর পাশে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে প্রফেসর ওয়াই।
কী করে হল?
শুকনো মুখে প্রোফেসর ওয়াই বললেন, কিছুই জানি না। আমি ওদিকে হাঁস তাক করছিলুম। হঠাৎ বন্দুকের আওয়াজে এদিকে ফিরে দেখি, প্রোফেসর একস্ মাটিতে পড়ে আছেন। এসে দেখি, এই কাণ্ড।
সেই নির্জন তুষারের দেশে এই দুটি প্রাণী ছাড়া আর কেউ ছিল না। আর এ তো হত্যাকাণ্ড! দুজনের ভেতরে যে বিশ্রী সম্পর্ক ছিল, তাতে এমন কাজ আর কে করতে পারে প্রোফেসর ওয়াই ছাড়া?
অতএব একদিন প্রোফেসর ওয়াই এসে আমাদের অফিসে উপস্থিত হলেন।
বললুম, প্রোফেসর, আপনি যা জানেন তা বলুন।
নতুন কথা তিনি কিছুই বললেন না। আমি বন্দুকের আওয়াজ শুনে ফিরে দেখি, উনি পড়ে আছেন। চোখের ভেতরে ছোরা বেঁধানো। আর আমি কিছুই জানি না।
প্রোফেসর ওয়াই শীর্ণ মুখে হাসলেন। বললেন, জানি, কেউ বিশ্বাস করবে না। আমি তৈরি হয়েই এসেছি সেজন্যে। পড়ুন আমার ডায়েরি।
ডায়েরিটা এগিয়ে দিলেন আমার দিকে। পাতায় পাতায় সেই এক কথা। “অসহ্য–বুড়োটা অসহ্য। কী করে এই পাগলের হাত থেকে নিস্তার পাই? আজ খাবার টেবিলে–আঃ, লোকটাকে খুন করতে পারলে আমার শান্তি হয়”। পড়েই মনে হবে, কোনও সন্দেহ নেই, বিশুদ্ধ, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।
আচ্ছা মানুষ এই প্রোফেসর। নিজের মৃত্যুবাণ যেন তুলে দিচ্ছেন আমার হাতে।
আমি চুপ করে রইলুম। প্রোফেসর বললেন, আমি বুঝতে পারছি আমার কী হবে। আমার আর কোনও ভাবনা নেই। আপনি অনুগ্রহ করে কেবল এই চিঠিটা আমার স্ত্রীকে দিয়ে দেবেন।
আমি বললুম, চিঠির দরকার নেই। আপনি বাড়ি যান।
তার মানে? ছেড়ে দিচ্ছেন আমাকে?–প্রোফেসর যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না।
বললুম, বিনা প্রমাণে আপনাকে গ্রেপ্তার করতে পারি না। আপাতত আপনার নামে আমাদের কোনও ওয়ারেন্ট নেই। আপনি যান।
