আমি ঠিক তেমনি তাকিয়েই রইলুম। বেশ বুঝতে পারছিলুম, মুখটা হাঁ হয়ে যাচ্ছে আস্তে-আস্তে। মুচকে হেসে ভোম্বলদা বললে, তাই কায়দা করে তোর কাছ থেকে দেওঘর-ভ্রমণ শুনে নিলুম। বেশ মজা করে ট্যাক্সিতে বেড়ানোও গেল খানিকটা। তুই দেখিস প্যালা—‘এসে’তে এবার অন্তত বারো মেরে দেব। বমপাস টাউনবিলাসী টাউন–আতার পায়েস–ক্ষীরের প্যাঁড়া–ধারোয়া নদীর জল, চিকচিকে মাছ, নন্দন পাহাড়, ত্রিকূটের বানর, কিচ্ছুটি বাদ যাবে না। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ–আর, এই নে তোর রিয়োয়ার্ড–এই বলে, আমার হাঁ করা মুখের ভেতরে একটা লেবেনচুস গুঁজে দিয়ে ছিটকে চলে গেল সামনে থেকে আর তিড়িং করে নীল রঙের দোতলা বাসটায় লাফিয়ে উঠল।
রোমাঞ্চকর বন্দুক
হলধরদা নাক-টাক কুঁচকে আমাকে বলল, কেন পেছনে ঘুরঘুর করে বেড়াচ্ছিস প্যালা! এসব বন্দুক ছোঁড়া তোর কাজ নয়। রীতিমতো বুকের পাটা চাই–গায়ের জোর চাই। ওই পালাজ্বরের পিলে নিয়ে ধাষ্টামো করতে চেষ্টা করিসনি প্যালা–মারা যাবি, স্রেফ বেঘোরে মারা যাবি।
হলধরদার লেকচার শুনে আমার গা জ্বলে গেল। ইস–নিজে কী একখানা গামা পালোয়ান রে। রোগা ডিগডিগে শরীর–ঘাড়টা সব সময়ে ঝুঁকে রয়েছে সামনের দিকে। সম্পত্তির মধ্যে খরগোশের মতো দুটো খাড়া কান–তাদের একটার ওপর আবার জড়ুল–যেন মাছি বসে আছে। গলায় সর্বজ্বরহর মাদুলি দুলছে, সেটার রং কালো, মনে হয় একটা পকেট-ডিকশনারি ঝুলিয়ে রেখেছে। আমার তো তবু পালাজ্বর; ম্যালেরিয়া জ্বর, ডেঙ্গু জ্বর কী নেই হলধরদার?
ইচ্ছে করলে আমি হলধরদাকে এক্ষুনি ল্যাং মেরে ফেলে দিতে পারি। নিশ্চয়ই পারি। কিন্তু তা হলে হলধরদার বন্দুকটা আর হাতে পাওয়া যাবে না। কাজেই গায়ের ঝাল গায়ে মেরে বললাম, সে তো বটেই। তোমার মতো জোয়ান লোকের হাতেই তো বন্দুক মানায়। রোজ সকালে তুমি পাঁচশো করে ডন-বৈঠক দাও, আধসের করে ছোলা খাও–তোমার নাম শুনলে ভীম-ভবানী পর্যন্ত দৌড়ে পালায়…
শুনে, হলধরদা কিছুক্ষণ কটকট করে আমার দিয়ে চেয়ে রইল।
–ইয়ার্কি দিচ্ছিস নাকি?
বললাম, সর্বনাশ, একে তুমি সাক্ষাৎ হলধরদা, তায় তোমার হাতে বন্দুক। তোমার সঙ্গে ইয়ার্কি দিয়ে কি শেষে পৈতৃক প্রাণটা খোয়াব?
হলধরদা বললে, হঁ! তারপর হনহন করে আমবাগানের দিকে হাঁটতে শুরু করে দিলে।
আমিও সঙ্গ ছাড়ি না। গুটিগুটি পায়ে পেছনে চলেছি তো চলেইছি। একটা বন্দুক কিনে কী ডাঁটই হয়েছে হলধরদার–আমাদের আর মানুষ বলেই গ্রাহ্য করে না। অথচ লোকটা কী অকৃতজ্ঞ দ্যাখো একবার। এই সেদিনও ঠাকুরমার ঘর থেকে আমসত্ত্ব আর আচার চুরি করে এনে ওকে খাইয়েছি, কথা ছিল বন্দুক কিনলেই আমাকে একবার ছুঁড়তে দেবে। কিন্তু নাকটাকে এখন সোজা আকাশের দিকে তুলে হাঁটছে–আমাদের যেন চিনতেই পারছে না।
হলধরদা পেছন ফিরে তাকাল।
–ও কি, আবার সঙ্গে আসছিস যে?
আমি কান চুলকে বললাম, না না, এমনিই। মানে, তুমি যখন পাখি-টাখি মারবে, তখন সেগুলো বয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে একজন লোকও চাই তো! সেইজন্যেই সঙ্গে যাচ্ছি।
–গোলমাল করবি না?
–না।
–পাখি উড়িয়ে দিবি না?
রামচন্দ্র! পাখি ওড়ালে তুমি আমার কান উড়িয়ে দিয়ো।
–শিকারের ভাগ চাইবি নাকি?
ছিঃ ছিঃ! তুমি মারবে পাখি–তাই দেখেই আমার স্বর্গীয় আনন্দ! তুচ্ছ ভাগের কথা কেন তুলছ হলধরদা? মনে মনে বললাম, তুমি যা পাখি মারবে সে তো আমি জানিই! সব বাসায় গিয়ে মরে থাকবে।
হলধরদার বোধহয় এতক্ষণে আমার ওপর একটুখানি করুণা হল।
–ইয়ে, কথাটা কী জানিস? ছেলে তুই নেহাত খারাপ নোস–সে আমি জানি। একবার তোকে বন্দুক ছুঁড়তে দিতেও আমার আপত্তি ছিল না। কিন্তু তোর তো ওই পালাজ্বরের পিলে হঠাৎ ধাক্কা খেয়ে যদি উড়ে যাস–
কীসের ধাক্কা? কোথায় উড়ে যাব?
–এ, তুই একটা ছাগল। কিছু জানিসনে। বন্দুক ছোড়বার সময় পেছন দিকে একটা ভয়ঙ্কর ধাক্কা লাগে। সে ধাক্কায় যারা রোগা-পটকা তারা যে কে কোথায় ছিটকে পড়ে কেউ বলতে পারে না। বলে ডিগডিগে পালোয়ান হলধরদা সগর্বে নিজের বন্দুকের দিকে তাকাল।
–তাই নাকি?
-হেঁ হেঁ–তবে আর বলছি কী! সেবার গোয়ালন্দে বুঝলি, একটা রোগা-পটকা সায়েব বন্দুক নিয়ে চখাচখি মারতে গিয়েছিল। যেই ধ্রাম করে গুলি ছুঁড়েছে, তার পরেই কী হল বল তো?
–তুমিই বলো। আমি তো কখনও গোয়ালন্দে যাইনি।
–যাসনি? তা হলে তোর বেঁচে থাকাই মিথ্যে। ঢাকার ইস্টিমারও দেখিসনি? সে এক পেল্লায় ব্যাপার। তোদের কলকাতার চাঁদপাল ঘাটের জাহাজগুলো তার কাছে একেবারেই তুচ্ছ।
–তা হোক তুচ্ছ।–আমি অধৈর্য হয়ে বললাম, ধ্রাম করে গুলি ছোঁড়ার পরে কী হল তাই বলো।
–হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই বলছি। গুলি ছুঁড়েছে, ধোঁয়া বেরিয়েছে সবই হয়েছে। কিন্তু সায়েবের আর পাত্তা নেই। বন্দুক, টুপি, সব পড়ে রয়েছে, শুধু সায়েবই নেই। নেই তো নেই–কোত্থাও নেই। একেবারে বেমালুম ভ্যানিশ!
ভ্যানিশ! নিজের গুলিতে নিজেই উড়ে গেল বুঝি?
–থাম না–কেন বাজে বকছিস? সায়েব তো নেই। চারদিকে হইচই। থানা, পুলিশ, টেলিগ্রাম, ফৌজ–সে এক কাণ্ড! ওদিকে মেমসাহেবের ঘন ঘন ফিট হচ্ছে। শেষে সেই সায়েবের পাত্তা পাওয়া গেল পদ্মার ওপারে। বালুচরের ওপর দাঁতকপাটি লেগে পড়ে রয়েছে। তিন দিন পরে তার জ্ঞান আসে। বন্দুকের এক ধাক্কাতেই পদ্মা পেরিয়ে গেল–নৌকোয় চড়লে না, স্টিমারে চড়লে না, কিছু না! এরই নাম বন্দুক ছোড়া বুঝলি? বলে হলধরদা আমার মুখের দিকে তাকাল, খাড়া নাক কান দুটো পর্যন্ত নড়ে উঠল তার।
