জনতা নিঃশব্দ এবং নির্বাক। কৃষ্ণপ্রসাদ বললে, ছি ছি সেন, করলে কী!
সেন তখন রোগীর ওপরে ঝুঁকে পড়েছে নির্বিকার মুখে। শান্ত গলায় জবাব দিলে, যা করা উচিত, তাই করেছি। শুয়োরের বাচ্ছাটা পেশেন্টকে মেরে ফেলবার উপক্রম করেছিল, তার ওপরে আবার লম্বাই-চওড়াই! চৌধুরি, এক কাজ করো, কালই ওই স্কাউন্ট্রেলটাকে হ্যাণ্ড ওভার করবার বন্দোবস্ত করে দিয়ো। রেগুলার মার্ডারার! কত লোককে এইভাবে মেরে ফেলেছে কে জানে।
কিন্তু সেন ঠিক সময়মতোই এসে পড়েছিল। একটা ইঞ্জেকশনেই রোগী স্বাভাবিক হয়ে উঠল আস্তে আস্তে, হিক্কার প্রকোপটা কমে গেল ক্রমশ। উঠে দাঁড়িয়ে একটি সিগারেট ধরিয়ে ডাক্তার বললে, অল রাইট, ক্রাইসিস কেটে গেছে। বাই দি বাই, সে-জোচ্চোরটা গেল কোথায়?
ডাক্তারের লাথি খেয়ে অন্ধকার উঠানে ছিটকে পড়েছিল গুণিন। কিন্তু সেখানে সে নেই, কোন ফাঁকে সে উঠে গেছে কেউ টেরও পায়নি।
রাত ঝমঝম করছে। একফালি অনুজ্জ্বল চাঁদ উঠেছে আকাশে, তার আলোয় দেখা যাচ্ছে মাঠের ওপারে সাদা পাখির মতো তাঁবুগুলো ঘুমন্ত হয়ে আছে। একটু আগেই জোরালো আলো জ্বলছিল ওখানে, আসছিল কুলিদের দুর্বোধ্য গান আর ঢোলের কলরব। কিন্তু এখন নীরব হয়ে গেছে সমস্ত, ঝিমিয়ে পড়েছে যেন গভীর একটা অবসাদের মধ্যে। তার সামনে সাদা একটা সাপের মতো পড়ে রয়েছে নতুন পথ—রাজপথ। ওই পথ, ওই সাপটার বিষনিশ্বাস অনুভব করছে অভিরাম। তার সর্বাঙ্গ পুড়ে যাচ্ছে, যেন জ্বলে যাচ্ছে সমস্ত।
বুকের ভেতরে তখনও টনটন করে একটা ব্যথা চমক দিয়ে যাচ্ছে, জোর লাথি মেরেছে ডাক্তার। গুণিন বিছানা ছেড়ে উঠে বসল। পাশে মড়ার মতো অঘোরে ঘুমুচ্ছে পদ্ম।
অভিরাম উঠে আলো জ্বালাল। ঘরের এক কোনা থেকে বার করলে লাল কাপড়ের একটা পুটুলি। অসহ্য উত্তেজনায় তার হাত কাঁপছে, তার চোখে তীক্ষ্ণআর শানিত হয়ে উঠেছে হত্যাকারীর দৃষ্টি। শুধু এক জন মানুষকে সে খুন করবে না—শুধু ওই ডাক্তারকেই নয় এই পাপকে, এই লাঞ্ছনা আর অপমানের হেতুকে ঝাড়ে-মূলে উচ্ছন্ন করবে সে।
একটা কালো বোতলের মধ্যে কতগুলো সাদা গুঁড়ো সে চোখের সামনে তুলে ধরল। কৃষ্ণপ্রসাদ কল্পনা করতে পারে না, ডাক্তারের ভাববারও ক্ষমতা নেই—ওই বোতলটার মধ্যে বন্দি হয়ে আছে দেশব্যাপী মহামারি। ওই বোতলের সাদা গুঁড়োগুলো আর কিছু নয়— বসন্তের বীজ, শুকনো গুটির মামড়ি। এগুলো ওরা সংগ্রহ করে ওষুধে লাগাবার জন্যে আর সময় বিশেষে প্রতিহিংসা চরিতার্থ করবার জন্যে। অবিশ্বাসীকে কঠিন শাস্তি দেবার জন্য গুণিনেরা বহু বার ওই মৃত্যুবিষ বর্ষণ করেছে তার বাড়িতে, উড়িয়ে দিয়েছে হাওয়ায়, মিশিয়ে দিয়েছে কুয়োর জলে। ক-দিনের মধ্যে পাওয়া গেছে হাতেনাতে প্রত্যক্ষ ফল। বহুদিন পরে ওই মারণাস্ত্র প্রয়োগ করবার প্রয়োজন এল আবার। বোতলের কারাগারে যে মৃত্যুরাক্ষস বন্দি হয়ে আছে, এক বার ছাড়া পেলে সে আর ক্ষমা করবে না—নিশেষে গ্রাস করে নেবে সমস্ত। ওই ডাক্তার, ওই কৃষ্ণপ্রসাদ, ওই কুলিদের উপনিবেশ দু-দিনের মধ্যেই মৃত্যুর কলরবের মধ্যে তলিয়ে যাবে সমস্ত।
নিঃশব্দে ঝাঁপ বন্ধ করে দিয়ে অভিরাম বাইরে বেরিয়ে এল। ম্লান জ্যোৎস্নায় পাড়ার কুকুরগুলো গুণিনের একটা ছায়ামূর্তি দেখে আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, পরমুহূর্তেই থেমে গেল আবার। সন্ধ্যা বেলা কারা যেন শুয়োর পুড়িয়েছিল, এখনও পোড়া মাংস আর পোড়া কাঠের গন্ধ বাতাসে সমাকুল হয়ে আছে। বড়ো একটা যজ্ঞডুমুরের ঝুপসি গাছ থেকে একটা কাক বোধ হয় স্বপ্ন দেখেই জড়িত কণ্ঠে ডেকে উঠল। রাত্রে কাকের ডাক অত্যন্ত দুর্লক্ষণ। কা— কা— কা—। গুণিনের মনে হল, যেন বলছে, খা—খা–খা—
অন্ধকার শীতলার থানের দিকে এগিয়ে চলল অভিরাম। ঝুরিনামা অশ্বথ গাছের পাতায় প্রেতাত্মার দীর্ঘশ্বাস। বাইরের জ্যোৎস্নার আক্রমণে পলাতক তমিস্রা যেন এখানে এসে ঘনীভূত আশ্রয় নিয়েছে। শীতলার থানের ওপর গুচ্ছে গুচ্ছে জোনাকি জ্বলছে—যেন রাক্ষুসে দেবতা সহস্র সহস্র চোখের আগুন শানিত করছে সমস্ত পৃথিবীর ওপরে ছড়িয়ে দেবার জন্যে।
মাঠের ওপরে দেখা যাচ্ছে নতুন রাস্তা-জ্যোৎস্নায় রহস্যাতুর রাজপথ। দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশকে বাঁচাবার জন্যে রাজকীয় প্রতিশ্রুতি। সিভিল সাপ্লাইয়ের শুভ বুদ্ধিতে গৌরী সেনের টাকার সদাব্রত। তার ওপরে তাঁবুর সমারোহ, কৃষ্ণপ্রসাদের উপনিবেশ।
শীতলার থানে একটা প্রণাম করলে গুণিন। কল্পনা করে নিলে বিস্ফোটক-ভূষিতা দেবীর করালীমূর্তি। সারা গায়ের ক্ষতচিহ্ন থেকে রক্ত আর পুঁজ গড়িয়ে পড়ছে। এক হাতে মারণশূর্প—তার বাতাসে মহামারির বিষ উড়ে যাচ্ছে দেশে দেশে। গর্দভাসীনা দেবীর প্রসারিত জিহ্বা থেকে রক্ত পড়ছে গড়িয়ে।
গায়ের লোমগুলো রুদ্ধ উত্তেজনায় কাঁটার মতো খাড়া হয়ে উঠেছে। ম্লান জ্যোৎস্নায় দীর্ঘ ছায়া ফেলে ফেলে অভিরাম অদৃশ্য হয়ে গেল।
তার পরের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত।
শহরের থেকে বন্দোবস্ত বা ডাক্তার আসবার আগেই কৃষ্ণপ্রসাদের কলোনিতে বসন্ত শুরু হল। কাকতালীয়ই হয়তো। অতএব…
ভীত কৃষ্ণপ্রসাদ বললে, স্ট্রাইক দি টেন্ট।
নতুন পথ অসমাপ্ত রেখেই কৃষ্ণপ্রসাদের দলবল পিছিয়ে গেল দশ মাইল দূরে। বিলীয়মান গোরুর গাড়ির সারির দিকে তাকিয়ে পিশাচের মতো হাসল অভিরাম। তার জয় হয়েছে। দেবী তার সহায়, জয় তার নিশ্চিত।
