ডালা-কুলো বেচে আর ভূত ঝেড়ে তো সংসার চলে না। যা আকাল পড়েছে! আমিও যদি ওখানে গিয়ে কাজ করি, তাহলে অন্তত একটা করে টাকা…
অভিরাম তিরের মতো খাড়া হয়ে দাঁড়াল।
খবরদার, খবরদার পদ্ম। ওকথা আর এক বার মুখে আনবি তো সোজা খুন হয়ে যাবি। গুণিনের বংশ আমরা। মা শীতলার দয়া আমাদের ওপরে। ঘরে না খেয়ে মরে থাকব সেও ভালো কিন্তু ওসবের মধ্যে আমরা নেই। গোলামি করি না আমরা, ছোটো কাজ করি না।
চাঁড়ালের ঘরের সুন্দরী বউ পদ্মা ঠোঁট ওলটাল। স্বাস্থ্যপুষ্ট কালো শরীরটা যেন নদীর জলের মতো ছলছলিয়ে উঠল চাঞ্চল্যে এবং অবিশ্বাসে।
তোমার মান নিয়েই তুমি গেলে। সবাই যখন কাজ গুছিয়ে নিলে, তখন…
পদ্মাকে মারবার জন্যে একটা ব্যাঘ্রমুষ্টি তুললে অভিরাম। আর সেই মুহূর্তেই বাইরে থেকে ডাক পড়ল, গুণিন–গুণিন?
কে?
অপরাধী গলায় উত্তর এল, আমি হিরালাল।
একটা ঘোমটা টেনে ঘরের মধ্যে সরে গেল পদ্মা, আর কেরোসিনের অনুজ্জ্বল আলোর সামনে হিরালাল এসে দাঁড়াল। চোখে দুটো ভীতিতে বিস্ফারিত এবং বিহ্বল।
কী হয়েছে?
এক বার এসো ভাই। আমার বডোমেয়েটার যেন কী হয়েছে। জ্বর নেই জারি নেই, সন্ধে থেকে কেবল তড়পাচ্ছে আর থেকে থেকে চোখ উলটে আসছে, তুমি এক বার চলো। হিরালালের গলা কান্নায় কাঁপছে।
হুঁ, এবার গুণিনকে মনে পড়েছে তাহলে।
রাগ কোরো না ভাই, চলো। তুমি রাগ করলে আমরা কোথায় দাঁড়াই।
একটা বিরাট আত্মপ্রসাদে ভরে উঠল অভিরামের মন। খালি কৃষ্ণপ্রসাদ নয়, তারও দাম আছে, তারও প্রয়োজন আছে। এ তাদের বংশগত অধিকার, মা শীতলার অনুগ্রহে আধিব্যাধি সারাবার দায়িত্ব একমাত্র তাদেরই। পেটের খিদে মেটাবার লোভ দেখিয়ে কৃষ্ণপ্রসাদ গ্রামের লোককে বশীভূত করতে পারে, কিন্তু যে-শত্রুকে চোখে দেখা যায় না তার বেলায়? মা ওলাইচন্ডী আর মা শীতলার যে-সমস্ত অনুচর দৃষ্টির অলক্ষ্যে মৃত্যুবাণ নিয়ে ঘুরছে, তাদের হাত থেকে বিপন্ন মানুষকে রক্ষা করতে পারে কে? অন্ধকার শ্যাওড়া গাছে যাদের আস্তানা কিংবা এলোচুলে ভর সন্ধেতে পুকুর ঘাটে গেলে যাদের নজর পড়বেই—কোনো সরকারি ঠিকাদারের সাধ্য নেই যে মুঠো মুঠো টাকা ছড়িয়ে দিয়ে তাদের বশীভূত করতে পারে।
ছোটো বেতের ঝাঁপিটা তুলে নিয়ে অভিরাম বললে, চলো।
হিরালালের দাওয়ায় তখন লোকারণ্য। ছোটো মেয়েটা পাগলের মতো ছটফট করছে, গড়াচ্ছে, কষ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে ফেনা। অমানুষিক দুটো বড়ো বড়ো চোখ মেলে তাকাচ্ছে আর থেকে থেকে উঠছে প্রচন্ড এক-একটা হিক্কার ধমক। হিরালালের বউ মড়াকান্নার রোল তুলেছে তারস্বরে।
কটমট করে খানিকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল অভিরাম। তারপর সংক্ষেপে বললে, হুঁ, পেতনিতে পেয়েছে।
বাড়িময় কোলাহল, কান্নার রোল আরও প্রবল হয়ে উঠল। গুণিন প্রকান্ড একটা ধমক দিয়ে বললে, চুপ। কিছু সরষের জোগাড় করো।
ভূতঝাড়া শুরু হল। সরষের পর সরষের প্রহার, সর্বাঙ্গে জলের ছিটে, কিন্তু পেতনির নামবার লক্ষণ নেই। মেয়েটা তেমনি করেই দাওয়াময় গড়িয়ে বেড়াচ্ছে। থেকে থেকে এমন এক-একটা হিক্কা উঠছে যে সন্দেহ হয় কখন তার দম আটকে যাবে। অভিরামের কপালে ঘাম জমে উঠতে লাগল। সংশয়ে ভরে যাচ্ছে মন। কিছুতেই কিছু হবার লক্ষণ নয়। সমস্ত বাড়িময় কালো অন্ধকার ঘনিয়েছে, ছোটো আলোকটা মিটমিট করছে, নিবে যাবে এক্ষুনি। আর সেই অস্পষ্ট আলোয় মেয়েটার দুটো ভয়াবহ চোখ দেখে তারই অন্তরাত্মা শিউরে উঠল। কামরূপ-কামিখ্যের ডাকিনীর আদেশ কোনো কাজে লাগছে না, বাঁচানো গেল না মেয়েটাকে।
টর্চের জোরদার আলো পড়ল প্রায়ান্ধকার প্রাঙ্গণে।
জুতোর মচ মচ শব্দ করে এসে ঢুকেছে কৃষ্ণপ্রসাদ। সঙ্গে আরও একটি ভদ্রলোক। কৃষ্ণপ্রসাদ হাসল, তোমার মেয়ের অসুখের খবর শুনে ডাক্তার নিয়ে এলাম হিরালাল। আমারই বন্ধু, এদিকে কাজে এসেছিলেন। সুবিধেই হল তোমার।
হিরালাল দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে বললে, গুণিন ওকে ঝাড়ছিল কিনা হুজুর, তাই…
ডাক্তার তাচ্ছিল্যভরে বললে, হ্যাং ইয়োর গুণিন। ওসব বুজরুকিতে কাজ চলে না, রোগও সারে না। তোমার ওই ঝুলি কাঁথা নিয়ে সরে দাঁড়াও তো বাপু, আমি এক বার দেখি।
বিদ্রোহী ঘোড়ার মতো ঘাড় বাঁকিয়ে অভিরাম বসে রইল। এক তিল নড়ল না।
কৃষ্ণপ্রসাদ টর্চের আলোটা অভিরামের মুখের ওপর ফেলল। একটু সরে বসো তুমি। অনেক তো করলে, কিছু পারলে না দেখতেই পাচ্ছি। এবার ডাক্তারবাবুকে দেখতে দাও।
অভিরাম তবুও নড়ে না। বললে, আমাকে ডেকে এনেছে হিরালাল। আমি ঝাড়ব একে, কোনো ডাক্তার-ফাক্তারের পরোয়া রাখি না আমি।
ননসেন্স! ইডিয়ট! নতুন ডাক্তারের ধৈর্যচ্যুতি হল। রোগীকে মেরে ফেলবে নাকি লোকটা? এদের নামে ক্রিমিনাল কেস করে দেওয়া উচিত।
অভিরামের মাথায় চড়ে গেল রক্ত, আর উদবেলিত সেই রক্তের উচ্ছাস যেন ফেটে বেরিয়ে পড়বার উপক্রম করলে দুটো চোখের মধ্য দিয়ে। একটা অশ্লীল গাল দিয়ে অভিরাম বললে, খবরদার!
মুহূর্তে কোথা থেকে কী হয়ে গেল! ডাক্তার সজোরে জুতোসুদ্ধ একটা প্রকান্ড লাথি বসিয়ে দিলে অভিরামের বুকের ওপরে। ভূত ঝাড়বার সরঞ্জামগুলোতে বিপ্লব ঘটিয়ে তিন হাত দূরে ছিটকে পড়ল অভিরাম। ব্যাপারটা যেন ভোজবাজি, এমন একটা-কিছু যে ঘটতে পারে এ যেন কল্পনার অতীত।
