কিন্তু মহামারির রাক্ষসটা কৃষ্ণপ্রসাদের তাঁবুতেও আর সীমাবদ্ধ রইল না। নির্বিচারে তার ক্ষুধা বিস্তীর্ণ হয়ে এল গ্রামের দিকে। যারা বাইরে থেকে এসেছিল তারা পালিয়ে বাঁচল, কিন্তু যাদের বাইরে যাবার জায়গা নেই—বসন্তের আক্রমণ তাদের ওপরেই ভেঙে পড়ল অনিবার্যভাবে।
এবার কোথায় গেল কৃষ্ণপ্রসাদ, কোথায় গেল কে। অভিরাম ছাড়া আর উপায় নেই কারও। একটি ব্রহ্মাস্ত্রেই সম্রাট নিজের রাজ্যে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত।
বাঁচাও গুণিন, বাঁচাও।
অভিরামের ঠোঁটে ধারালো হাসি। কেন, সরকারিবাবু কোথায় গেল? তাকে ডেকে পাঠাও-না।
রাগ কোরো না ভাই, দয়া করো। তুমি ছাড়া আর কে আছে! এ সময়ে তুমি না এলে…
তারপর একদিন অভিরামের হাসিও বন্ধ হয়ে গেল। বসন্ত হল পদ্মার। লক্ষ্যভেদ করে ব্রহ্মাস্ত্র যে আবার তার বুকের দিকেই ফিরে আসবে একথা তো গুণিনও জানত না।
অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করে মরে গেল পদ্মা। চাঁড়ালের সুন্দরী বউ পদ্মা। অমন অপূর্ব দেহটা তার পচে গেছে, এমন বীভৎস হয়ে গেছে যে সেদিকে তাকানো চলে না। সৌন্দর্যের আবরণের তলা থেকে বীভৎস নরককুন্ড।
এইবার মাটিতে আছড়ে আছড়ে কাঁদলে অভিরাম। কী করলাম, কী করলাম আমি!
কিন্তু সবচাইতে বড়ো আঘাত তখনও তার জন্যে অপেক্ষা করছিল। পদ্মার মৃতদেহ সরাতে গিয়ে বিছানার তলা থেকে বেরিয়ে পড়ল একটা চমৎকার সোনার আংটি। ঠিক এই আংটিটাই কার হাতে দেখেছিল সে? ডাক্তারের না কৃষ্ণপ্রসাদের! তাহলে? তাহলে পদ্মা…
শোক মিলিয়ে গেল, মাথার মধ্যে জ্বলে যেতে লাগল দুঃসহ একটা অগ্নিকুন্ড। তাহলে শেষপর্যন্ত জয় হল কার? চরম অপমান আর চরম পরাজয়ের মধ্যে তাকে ফেলে গেল কে? গ্রামের ঘরে ঘরে মড়াকান্না উঠেছে। অভিরাম কি এই চেয়েছিল? আর পদ্ম? এই সোনার আংটি?
পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল গুণিন। লাল পুঁটলিটার মধ্যে নানা জাতের তীব্র প্রাণঘাতী বিষ সঞ্চিত আছে। অভিরাম হার মানবে না, না কিছুতেই না।
কিন্তু কৃষ্ণপ্রসাদ ভালো লোক।
সরকারি ডাক্তার, স্যানিটারি ইনস্পেকটর আর ভ্যাকসিনেটরের একটা ছোটো দল নিয়ে সে গ্রামের দিকে আসছিল। বারোয়ারিতলার কাছাকাছি আসতেই দলটা থমকে দাঁড়িয়ে গেল এক বার। দিনেদুপুরেই গুণিনের বিষজর্জরিত মৃতদেহটা শেয়ালে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিল সেখানে।
অ্যানাদার ভিকটিম। ডাক্তার বললেন।
রচনার রহস্য
ট্যাক্সিটা যেই বড় রাস্তায় পড়েছে, অমনি দেখি সামনে ভোম্বলদা। হাত বাড়িয়ে বললে, এই দাঁড়া, দাঁড়া একটু। আমিও তোর সঙ্গে যাব।
বলতে যেটুকু দেরি। তারপরেই টুক করে উঠে এল গাড়িতে। ট্যাক্সি চলতে আরম্ভ করল।
আমি আশ্চর্য হয়ে বললুম, তুমি আবার কোথায় যাবে?
কেন, তুই যেখানে যাচ্ছিস। মানে, দেওঘরে।
আরও আশ্চর্য হয়ে গেলাম আমি। রাঙামাসির বিয়েতে আমি যে দেওঘরে যাচ্ছি সে-খবরটা পাড়ায় কারও অজানা নেই, সাতদিন ধরে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে বলে বেড়াচ্ছি সকলকে। এমন কি ভোম্বলদাকেও। কিন্তু সেও যে আজকেই, এই ট্রেনেই, দেওঘরে যাবে–মাত্র এই মুহূর্তেই, আমি সেটা জানতে পারলুম।
বললুম, তুমিও কি রাঙামাসির বিয়েতে যাচ্ছ নাকি?
তোর রাঙামাসির বিয়েতে আমি কেন যেতে যাব? আমার বুঝি ফুলুপিসি থাকতে নেই?
তোমার ফুলুপিসির বিয়ে? দেওঘরেই?
ভোম্বলদা নাক কুঁচকে বললে, কেন, তোর রাঙামাসি ছাড়া দেওঘরে আর বুঝি কারও বিয়ে হতে নেই? আবদার তো দেখছি মন্দ না।
শুনে আমি একটু দমে গেলুম। তারপর খানিকটা ভেবে-চিন্তে বললুম, কিন্তু কই, আগে থাকতে তুমি তো কিছু বলেনি।
আমি কি তোর মতো হাঁদারাম যে একমাস ধরে পাড়ায়-পাড়ায় ফিরিওলার মতো চেঁচিয়ে বেড়াব? স্রেফ চেপে রেখেছিলুম। দ্যাখ না–কেমন সারপ্রাইজ দিলুম তোকে।
আমি আবার মাথা চুলকোতে লাগলুম।
কিন্তু ভোম্বলদা
থামলি কেন, বলে যা।
বিয়েবাড়ি যাচ্ছ–সঙ্গে তো জিনিসপত্র কিচ্ছু দেখছি না।
আমার পিসিবাড়ি তোর মাসিবাড়ির মতো নাকি?–খুব অহঙ্কার করে, নাকটাকে কপালে তুলে দিয়ে ভোম্বলদা বলল, সেখানে কিছু নিয়ে যেতে হয় না। জামা কাপড় বাক্স–স্রেফ কিছু না।
সব রেডি থাকে?
সব–সব। বলতে বলতে ভোম্বলদা টক করে পকেট থেকে একটা লেবেনচুস বের করে খেল।
আমি জুলজুল করে চেয়ে দেখলুম, কিন্তু আমাকে দিলে না।
একটু পরে ভোম্বলদা বললে, তুই আগে কখনও দেওঘরে গেছিস?
বললুম, নিশ্চয় আরও তিনবার। তুমি?
সাতবার।
কই, কখনও তো…।
তোকেই কি যেতে দেখেছি এর আগে? তুই যে চালিয়াতি করে মিথ্যে করে বলছিস না–কেমন করে তা জানব?
ভীষণ রাগ হল আমার।
আমি মিথ্যে কথা বলছি? বেশ, জিজ্ঞেস করো আমাকে।
ভোম্বলদা গম্ভীর হল।
আচ্ছা বেশ, যাচাই করে নিচ্ছি তোকে। আচ্ছা, বল দেখি কী কী পাড়া আছে দেওঘরে?
আমি বললুম, এ আর শক্তটা কী! বমপাস টাউন, উইলিয়মস টাউন, কাস্টোয়ার্স টাউন, বিলাসী টাউন
থাক থাক, এতেই যথেষ্ট হবে।–ভোম্বলদা একবার যেন নিজে নিজে আউড়ে নিলে : বমপাস টাউন, উইলিয়মস টাউন, কাস্টমরুক গে, বিলাসী টাউন–হ্যাঁ, ঠিক আছে।
আমি খুব খুশি হয়ে বললুম, বিশ্বাস হল এবারে?
কী করে বিশ্বাস হবে? ও তো লোকের মুখে-মুখেই শোনা যায়।
চটে বললুম, কক্ষনো না। তুমি আরও জিজ্ঞেস করো না।
আচ্ছা বল তো, দেওঘর জায়গাটা কী রকম?
খুব ভালো। খাসা জায়গা। বাড়িগুলো সব ফাঁকা ফাঁকা, কত গাছপালা, কত পাখি। কেবল বাজারটা একটু ঘিঞ্জি, আর মন্দিরটা।
