ছি ছি, এ কী কুবুদ্ধি তোদের! গায়ে খাটবি, পয়সা পাবি, এতে অপমানের আছে কী? এই জন্যেই-না বাঙালির এমন দুর্দশা। তাই এই ঘরপোড়া দুর্বুদ্ধির জন্যেই তো এত লোক না খেয়ে শুকিয়ে মরল। অথচ পশ্চিম থেকে হিন্দুস্থানি কুলি এসে কীভাবে যে বাঙালির দেশকে লুঠ করে নিয়ে যাচ্ছে…
পাঁচ মিনিট একটা দীর্ঘ টানা বক্তৃতা, উদারা মুদারা এবং তারায়। ঘুরে ফিরে অতি কোমল নিখাদে এসে যখন যুক্তিপূর্ণ ভাষণটা সমাপ্ত হল, দেখা গেল আবেগে কৃষ্ণপ্রসাদের চোখের কোনায় কোনায় জলের বিন্দু দেখা দিয়েছে।
এখনও ভেবে দ্যাখ সবাই। এক বেলা তো পেট পুরে ভাত জুটছে না তোদের। আর কুলিগিরি করে যা মজুরি পাবি তাতে…
অর্ধভুক্ত ক্ষুধিত চোখগুলো লোভে জ্বলজ্বল করে উঠল। দৃষ্টির সামনে ঝলক দিয়ে গেল সোনালি মরীচিকা। সত্যিই তো অন্যায়টা তাদের কোনখানে। জমিতে যদি লাঙল ঠেলতে পারে তাহলে কোদাল মারলে মহাভারত সত্যিই কিছু অশুদ্ধ হয়ে যাবে?
অভিরাম মাথাটা ঝাঁকিয়ে বললে, কিন্তু বাবু…
কিন্তু লোকচরিত্র বোঝে কৃষ্ণপ্রসাদ। অভিরামের সর্বাঙ্গে বিদ্রোহ ঘনিয়েছে—গাঁয়ের লোকের ওপরে তার অপ্রতিহত প্রতিপত্তি, বিদ্বান নতুন লোক এসে সে-অধিকারে হস্তক্ষেপ করবে এটা সে কল্পনাই করতে পারছে না। কিন্তু সে-আধিপত্যটা আধ্যাত্মিক। আধিভৌতিক প্রয়োজনের দাবিটা ঢের ঢের বেশি এবং বাস্তব—এই সহজ কথাটুকু বোঝবার বুদ্ধি কৃষ্ণপ্রসাদের আছে।
ঠোঁটের কোনা দুটো একটু বিস্তৃত করে কৃষ্ণপ্রসাদ তীক্ষ্ণ সর্পিল হাসি হাসলে। অভিরাম ছাড়া আর সমস্ত মানুষগুলির মুখই একাকার হয়ে গেছে। অলৌকিক ভীতি নয়—লৌকিক ক্ষুধা। লোভে এবং দ্বিধায় তারা বিচলিত হয়ে উঠেছে। মুহূর্তের জন্যে কৃষ্ণপ্রসাদ অনুভব করলে অভিরাম তার প্রতিদ্বন্দ্বী, তার ক্ষমতালাভের পথে প্রতিপক্ষ। কিন্তু কৃষ্ণপ্রসাদের হাসিটা প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপে আরও খানিকটা বিস্মৃত হয়ে পড়ল। শেষপর্যন্ত জয় হবে তারই।
পকেট থেকে কালো চামড়ার নোটবই বেরোল। বলো, কে কে রাজি আছ।
এক বার কৃষ্ণপ্রসাদ আর এক বার অভিরামের মুখের দিকে তাকাল সকলে। অভিরামের চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে, শক্ত হয়ে উঠেছে খাড়া চোয়াল। যেন যে নাম লেখাবে, বাঘের মতো তারই ঘাড়ের ওপর ঝাঁপ দিয়ে পড়বে সে।
কিন্তু জয় হল অপদেবতার নয়—সরকারি কন্ট্রাক্টরের। কয়েকটা মুহূর্ত কেটে গেল নিষ্কম্প স্তব্ধতায়। তারপর গলাটা সাফ করে নিয়ে হিরালাল বললে, লিখুন।
অভিরাম নড়ে উঠল। দুটো চোখ থেকে এক ঝলক আগুনবৃষ্টি করলে যেন। তারপর হনহন করে হেঁটে চলে গেল।
এবারে শব্দ করে হেসে উঠল কৃষ্ণপ্রসাদ, লোকটা পাগল নাকি?
গাঁয়ের লোক সে-হাসিতে যোগ দিল না।
গুণিনের চোখের সামনে দিয়েই সরকারি রাস্তা তৈরি হয়ে চলল। সবাই খাটে সেখানে, হিরালাল, মতিলাল, জনক। তিন-চার দিনের মধ্যেই হালচাল বদলে গেছে তাদের। রাতারাতি সব বড়োমানুষ। গাঁয়ের দুঃখ দূর হল এতদিনে। কৃষ্ণপ্রসাদের বক্তৃতায় ফাঁকি নেই। দেশের দুঃখে ঝরে-পড়া তার চোখের জল যে নিঃসন্দেহে আদি এবং অকৃত্রিম, এ সম্পর্কে মনে আর কেউ সন্দেহ পোষণ করেন না।
এক পয়সার বিড়ি জুটত না কোনোকালে, টুকরো বিড়ি কুড়িয়ে নিয়ে ধূমপানের তৃষ্ণাটা নিবারণ করত জনক। সেই এসে হাজির হল এক বাক্স সিগারেট নিয়ে। বললে, নাও গুণিন, একটা সিগারেট নাও। ভালো জিনিস, ঠিকাদারবাবু দিয়েছে।
অসীম বিরক্তিভরে অভিরাম বললে, নাঃ।
না? কেন, আপত্তিটা কীসের? সত্যি ভায়া তুমিই ঠকলে? খালি ভূত ঝাড়লেই কি পেটের ব্যবস্থা হয় আজকাল? চলে এসো আমাদের সঙ্গে, দু-কোপ মাটি তোলো, দিনমজুরি দুটো টাকা তোমার রোখে কে?
একটা চড় মেরে তোর মাথার খুলি উড়িয়ে দেব।
আস্তে আস্তে জনক পিছু হটতে লাগল। ভীরু গলায় বললে, কেন, কেন অন্যায়টা কী বলেছি? সবাই যখন দু-পয়সা করে নিচ্ছে…
দু পয়সা! হঠাৎ রাক্ষসের মতো গলায় গুণিন গর্জে উঠল, নিজের মান-সম্মান বিসর্জন দিয়ে অমন পয়সার মুখে লাথি মারি আমি। ভাবিসনি এ সুখ তোদের সইবে। মা শীতলে জেগেই আছেন—জানলি, ধর্মের গাঁয়ে কখনো অধর্ম তিনি সইবেন না।
জনকের বুকের মধ্যটা কেঁপে গেল, শাপ দিচ্ছে নাকি গুণিন! মন্ত্রসিদ্ধ ভূতসিদ্ধ নোক সে, তার অসাধ্য কুকাজ নেই। একি শুধু কথার কথাই না এমনিভাবে দেশসুদ্ধ লোকের সর্বনাশ করবার মতলব আঁটছে সে! কিন্তু কেন? এমন কী অপরাধ করেছে তারা। ঘরের ভেতর ছটফটিয়ে মরলেও যখন একটি বার কেউ ডেকে জিজ্ঞেস করে না কিংবা এক ফোঁটা জল দেয় না খেতে, তখন গায়েগতরে খেটে দুটো পয়সা রোজগার করলে কার কী বলবার আছে। অথচ কেন এমন করছে গুণিন, কেন সে এমনভাবে হিংস্র হয়ে উঠেছে! জনক কিছু বুঝে উঠতে পারল না।
কিন্তু সর্ষের মধ্যেই যে ভূতে ধরেছে সে-খবর অভিরামের জানা ছিল না।
সন্ধ্যার সময় গুণিনের বউ পদ্মা এসে সামনে দাঁড়াল। বললে, একটা কথা বলব?
কেরোসিনের কুপি জ্বালিয়ে অভিরাম ডালা বুনছিল। বললে, কী বলবি?
গাঁয়ের মেয়েরা তো সবাই রাস্তায় কাজ করতে যাচ্ছে। দু-পয়সা পাচ্ছেও। তাই…
তাই? হাতের ডালাটা নামিয়ে রেখে সন্দিগ্ধ উগ্র চোখে তাকালে অভিরাম। চোয়ালের হাড় দুটো কঠিন হয়ে উঠেছে, মাথার ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুলগুলো নেমে এসেছে কপাল ছাড়িয়ে। অগ্নিগর্ভ স্বরে বললে, তাতে কী হয়েছে!
