ভাবতে পারা যায় রাস্তা তৈরি হবে এই গ্রামের মধ্য দিয়ে? যেখান দিয়ে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে রেলগাড়ি চলে যায়, তার চাকায় চাকায় সর্বদা মুখর সভ্যতার গর্জন, সে এখান থেকে অনেক দূরে। একটা মরা নদীর খেয়া, তিনখানা গ্রাম, ছ-খানা মাঠ, আরও এক ক্রোশ জেলাবোর্ডের পথ। এখানকার মানুষ যেন বাস্তু বেঁধেছে জীবনের তটতীর থেকে বিচ্ছিন্ন একটা দ্বীপের মধ্যে। একটা প্রাইমারি ইশকুল—সেও তিন মাইল দূরে। রাত্রির অন্ধকারে বহুদূর থেকে যেমন মহানগরীর মাথার ওপরে একটা অস্বচ্ছ জ্যোতির্মন্ডল দেখা যায়, এখান থেকেও তেমনি নাগরিক জীবনের একটা অলক্ষ্য জ্যোতি :সংকেত অনুভব করা চলে মাত্র। তবু চৌকিদারি ট্যাক্স আসে তামাকের ওপরে, দেশলাইয়ের ওপরে নতুন খাজনা আসে, শহরের তৈরি লোভের কারখানা থেকে মন্বন্তর আসে। এখানে আমদানি নেই, এ শুধু রপ্তানির দেশ।
এখানে রাস্তা হবে, গ্রামের উন্নতি হবে।
কী রোমাঞ্চকর অনুভূতি! শুধু অভিরাম নয়, অভিরামের মতো দু-চার জন নয়, সমস্ত গ্রামটাই আনন্দিত বিস্ময়ে সজাগ হয়ে উঠল। আর সেই বিস্মিত আনন্দকে তটস্থ করে দিয়ে মাঠের পাশ দিয়ে একরাশ তাঁবু পড়ে গেল। যেন উড়ে এল হাওয়াতে।
পাঁচশো বছর আগে শীতলার থানে মুসলমানদের তলোয়ারের ঘা পড়েছিল, তারপরে আর কোনো জীবনচাঞ্চল্য জাগেনি এখানে। পাঁচশো বছরের মরা গাঙে নতুন করে জোয়ার এল। সেদিন এসেছিল রাষ্ট্রবিপ্লবে, আজ এল মন্বন্তরে।
অশথ গাছের ঠাণ্ডা ছায়ার নীচে দাঁড়িয়ে হিরালাল বাগদি। বললে, কারবারটি এক বার দেখছ গুণিন ভাই?
অভিরাম সন্দিগ্ধ চোখে তাকিয়ে ছিল। বললে, হ্যাঁ।
উঃ, কী পেল্লায় কান্ড করছে রে বাবা! বনজঙ্গল গাছপালা সব লোপাট করে দিয়ে সড়ক বানাচ্ছে। মানুষের নাকি আর ভাতের দুঃখু থাকবে না। এই যদি মনে ছিল রে বাপু, তাহলে ক-টা দিন আগে এলিনে কেন? সব সাবাড় করে দিয়ে…
তখন তো ওদের সময় হয়নি।
ওদের সময় হয় একটু দেরিতে, তাই না? হিরালাল রসিকতার চেষ্টা করলে, সিঁদেল চোরে সব লোপাট করে নিয়ে তিন মাইল ডাঙা পেরিয়ে গেলে চৌকিদারে এসে হাঁক পাড়ে।
অভিরাম জবাব দিলে না, কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। সামনে যা চলছে তা প্রলয়কান্ডই বটে। পাথরের মতো শক্ত টিলা গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। সাফ হয়ে যাচ্ছে জঙ্গল, আদ্যিকালের পচা ডোবাগুলো দেখতে দেখতে ভরাট হয়ে গেল, আর নাকি ম্যালেরিয়া থাকবে না দেশে। শাবল, গাঁইতি, কোদাল। একশো কুলি খাটছে, শব্দ উঠছে ঝপ ঝপ ঝপাস, ঠন ঠন ঠনঠন। কোদালের মুখে মাটির তলা থেকে বাদামি রঙের মানুষের হাড় উঠে আসছে, পাঁচশো বছর আগেকার হাড় কি না কে জানে!
চোখ দুটোকে হঠাৎ সংকুচিত করে আনলে অভিরাম। মোটা মোটা ভ্র-দুটো একসঙ্গে এসে যোগ হয়ে গেল, তার ওপরে রেখা ফুটল একটা অর্ধবৃত্তের আকারে।
লক্ষণ আমার ভালো লাগছে না হিরু।
কেন গুণিন ভাই, কেন?
কী জানি কেন। অভিরাম নিজেও জানে না। হয়তো এই আকস্মিকতাকে ভয়, হয়তো এই নতুনকে সে বিশ্বাস করতে পারছে না। গাঁইতি আর কোদালের মুখে পুরোনো মাটি যেন যন্ত্রণায় কেঁদে উঠছে, যেন অভিশাপ দিচ্ছে। অথবা এ হয়তো ওর রক্তার্জিত সংস্কার। আকাশে-বাতাসে যেসব অশরীরী শক্তি ঘুরে বেড়াচ্ছে, এই সভ্যতা বর্জিত নগণ্য গ্রামে যাদের ছিল একাধিপত্য; রাতদুপুরে যারা অকারণে ঝপ ঝপ সরসর করে প্রকান্ড বট গাছের ডালপালাগুলোকে ঝাঁকিয়ে দিত, ভরা অমাবস্যায় মড়ার মাথা নিয়ে যারা শ্মশানে খটাখট করে গেন্ডুয়া খেলত আর খিলখিল করে হাসত, কিংবা পুরোনো দিঘির ধারে যাদের মুখে লকলক করে আগুন জ্বলে উঠত—তারাই কি প্রেতসিদ্ধ গুণিনের অনুভূতির ওপরে সঞ্চারিত করছে তাদের অলৌকিক প্রতিবাদ?
রহস্যময় মুখখানাকে আরও রহস্যময় করে গুণিন বললে, সে থাক।
ওদিকে রাস্তা তৈরি হয়ে চলেছে। চমৎকার রাস্তা, উঁচু-নীচু অসমতল মাটিকে দীৰ্ণবিদীর্ণ করে দিয়ে সরকারি লরির মসৃণ মনোরম চলবার পথ-রাজপথ। কিন্তু কাজ এগোতে পারছে না। কৃষ্ণপ্রসাদ হিসেব করে দেখলে এভাবে চললে বাঁধা সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে না। ওপরওয়ালা আর কর্তাদের কাছ থেকে তাগিদের পর তাগিদ আসছে। অতএব আরও লোক চাই। ঝড়ের গতিতে কাজ শেষ করো, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পথ তৈরি করে দাও। যুদ্ধ খাদ্যসংকট—এমার্জেন্সি।
কুলির জন্য খবর গেল সদরে, কিন্তু কুলিরও বাজারদর বেড়েছে—বর্মা থেকে আসামফ্রন্ট পর্যন্ত তাদের চাহিদা। আর এই অজগর বিজেবনে লোক পাঠানোর বন্দোবস্ত করাও শক্ত। সুতরাং সদর থেকে পালটা খবর এল, লোকাল রিক্রুট করো।
কৃষ্ণপ্রসাদের স্বর্গীয় আভিজাত্য আর রইল না। খাকি হাফ প্যান্টের নীচে হাঁটু পর্যন্ত জমে উঠল ধুলো। ঘরে ঘরে তাগিদ পড়ল–এসো তোমরা কাজে লেগে যাও সবাই।
সকলের হয়ে এগিয়ে এল অভিরাম।
কুলির কাজ আমরা করব না হুজুর।
বিস্মিত এবং ক্রুদ্ধ হয়ে কৃষ্ণপ্রসাদ বললে, কেন?
আমাদের বাপ পিতামো কখনো মাটিতে কোদাল মারেনি—ছোটো কাজ করেনি। সে পারে ছাতুরা, আমরা পারব না।
ছোটো কাজ! কৃষ্ণপ্রসাদ হেসে উঠল হা-হা করে। এক বেলা খেতে জোটে না, আভিজাত্যের জ্ঞানটা টনটন করছে একেবারে। ঢোঁড়া নয়, হেলে সাপ; কুলোপনা চক্কর নয়, বারকোশপানা। কিন্তু পরক্ষণেই বেদনায় কৃষ্ণপ্রসাদের গলার স্বর যেন ভারী হয়ে গেল।
