অভিরামের বাপ নিধিরাম ছিল এ তল্লাটের সেরা গুণিন। না-জানত এমন মন্ত্র নেই, না পারত এমন ঝাড়ফুক নেই। কুকুরে কামড়েছে, একটুখানি জলপড়ায় সে তা ভালো করে দিত। সাপে ছোবল মেরেছে, পিঠের ওপর পেতলের থালা আটকে দিয়ে তার ওপর মন্ত্রপড়া মাটি ছড়িয়ে সে বিষ নামিয়ে নিত। ভূতে ধরলে তো আর কথাই নেই, নিধিরাম না গেলে কার সাধ্য সে-ভূত নামায়। বাণ মারতে পারত, বাটি চালান করতে পারত, জ্বলন্ত একটা প্রদীপ আকাশে উড়িয়ে দিয়ে অগ্নিকান্ড ঘটিয়ে দিতে পারত দূরের কোনো একটা নিশ্চিন্ত নিদ্রিত গ্রামে।
তা ছাড়া বংশানুক্রমিকভাবে তারা বারোয়ারি শীতলার পূজারি। শুধু পূজারি নয়, দেবীর প্রসাদপুষ্ট। কোনো এক অতীত অনার্য সংস্কৃতির ধারায় অন্তত এখানে ওদের অধিকার অব্যাহত। কোন অনাদিকাল থেকে এরা শীতলার পুজো করে আসছে কেউ বলতে পারে না। ব্রাহ্মণের প্রবেশ নিষেধ। শোনা যায় কিছুদিন আগে তন্ত্রসিদ্ধ এক ব্রাহ্মণ এসেছিলেন গাঁয়ে। চাঁড়ালে দেবী পুজো করে শুনে তিনি খেপে উঠলেন। বললেন, দেবী অশুচি, তাঁকে শোধন করে নিয়ে ব্রাহ্মণকে দিয়ে পুজো করাতে হবে।
গাঁয়ের লোকে নিযেধ করলে, কিন্তু দাম্ভিক তন্ত্রসিদ্ধ সেকথা শুনলেন না। দেবী শোধনের ব্যবস্থা করে পুজোয় বসলেন তিনি। আর পরমুহূর্তেই আশ্চর্যকান্ড। কোথা থেকে প্রকান্ড একটা চড় বাজের মতো শব্দ করে তাঁর গালে এসে পড়ল। অদৃশ্য হাতের সেই চড় খেয়ে ব্রাহ্মণ যে উলটে পড়ে গেলেন, আর উঠলেন না।
সেই থেকে চাঁড়ালেরাই এখানে পুজো করবার কায়েমি অধিকার পেয়েছে। খাতির বেড়েছে তাদের, খ্যাতি বেড়েছে আরও অনেক বেশি। গাঁয়ের উঁচু জাতেরা অসংকোচে অন্ত্যজের দেবীকে পুজো করেন, অন্ত্যজ পূজারির ছোঁয়া প্রসাদ পান। আর বসন্ত চিকিৎসার ব্যাপারে অধিকার তো তাদের একচেটিয়া।
কোথা থেকে একদিন পেতনি নামিয়ে এসে ভরা দুপুরের সময় নিধিরাম ঢক ঢক করে এক ঘটি জল খেল। আর মারাও গেল তার ঘণ্টা খানিক পরেই। দু-চার জন লোক মুখে বললে, সর্দিগর্মি; কিন্তু সকলেই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে নিলে রোজার ঘাড় ভূতেই মটকেছে। শেষপর্যন্ত।
তার ছেলে অভিরাম। বাপের মতো তারও এমনি হঠাৎ মৃত্যু ঘটে গেল। আশ্চর্য হবার কিছু নেই, এ যেন ইতিহাসের সহজ এবং স্বাভাবিক ধারা। কিন্তু তারও আগে আরও একটু গল্প আছে।
বাংলা দেশের ওপর দিয়ে মহামন্বন্তর বয়ে গেল। যারা যাওয়ার তারা তো মরে বাঁচল, কিন্তু যারা রয়ে গেল তাদের দুর্গতির আর সীমা রইল না। শ্মশান বাংলার গ্রামে গ্রামে শ্মশানের প্রেতের মতো ঘুরে বেড়াতে লাগল মানুষ। এক মুঠো কাঁকর-মেশানো ভাত সম্বল, এক ফালি ছেঁড়া ন্যাকড়া সম্বল। রাতারাতি যেন সবাই মায়াপ্রপঞ্চময় সংসারটাকে চিনে ফেলেছে দেহে মনে, বেশে বাসে অনাসক্ত বৈরাগ্য। চোখের দৃষ্টি অর্থহীন, যেন বাইরের অবান্তর পৃথিবীটার ফাঁকিটা ধরে ফেলে ব্ৰহ্মলাভের জন্যে একান্তভাবে অন্তর্মুখী হয়ে গেছে।
শাস্ত্রে বলেছে সবই যখন নলিনীদলগতজলমিব—তখন একটি মাত্র ভরসা আছে, সেটি হচ্ছে সাধুসঙ্গ এবং তার দ্বারাই ভবার্ণব পার হওয়া যায়। এবং ঈশ্বর করুণাময়, সাধুসঙ্গ তিনি পাঠালেন।
দুর্ভিক্ষ যখন শেষ হয়ে গেল তখন দেশের লোককে দুর্ভিক্ষের হাত থেকে বাঁচাবার জন্যে সরকারি ধানের গোলা বসতে লাগল এখানে-ওখানে। এল লাইসেন্সপ্রাপ্ত সরকারি এজেন্টের দল—মহাজনের করাল গ্রাস থেকে দেশকে বাঁচাবার মহৎ ব্রত নিয়েছে তারা। তার সঙ্গে এল সিভিল সাপ্লাই ইন্সপেক্টর, এল বোট অফিসার, এল এনফোর্সমেন্ট—কে এল এবং কে এল না।
এখান থেকে বারো মাইল দূরে ধান-চালের মস্তবড়ো একটা গঞ্জ। তার পাশ দিয়ে যে নদী, বর্ষার সময় ছাড়া তাতে নৌকো চলে না। হাঁটুজলের ওপর যে-পরিমাণে কচুরির স্কুপ জমে ওঠে, তাতে বরং মোটর চালিয়ে নেওয়া যায়, কিন্তু নৌকোর প্রশ্ন অবান্তর। অতএব…
অতএব রাস্তা তৈরি করতে হবে।
সে-কাজ নিলে কৃষ্ণপ্রসাদ। গৌরী সেনের টাকা—অফুরন্ত এবং অকৃপণ। এক বার টেণ্ডার নেওয়াতে পারলে আর ভাবনা নেই। পরবর্তী পথটুকু মসৃণ—তৈলাক্ত।
ধানের আল আর মজা দিঘির পাশ দিয়ে কৃষ্ণপ্রসাদ সাইকেল চালিয়ে এল। বারোয়ারি অশথতলায় দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরাল। ভারি ভালো লাগছে ঠাণ্ডা ছায়া আর ঠাণ্ডা বাতাসটা।
আপনি, হুজুর? মস্ত একটা প্রণাম জানিয়ে সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করলে অভিরাম।
আমি? বাঁ-হাতটাকে হাফ প্যান্টের পকেটে পুরে কৃষ্ণপ্রসাদ সিগারেটের ধোঁয়া উড়তে লাগল। বললে, সরকারি লোক। রাস্তা করতে হবে এখানে, আঠারো মাইল দূরের রাস্তা। সরকারি লরি যাবে, গাড়ি যাবে—বুঝেছ?
আজ্ঞে রাস্তা?
নিশ্চয়। মুখস্থ করা লিবুর মতো কৃষ্ণপ্রসাদ বলে গেল, দেশের ভালোর জন্যেই। চালের ইজি সাপ্লাই হবে, গ্রামের উন্নতি হবে, ভবিষ্যতে দুর্ভিক্ষের পথ বন্ধ হবে। একেবারে পাকাঁপাকি বন্দোবস্ত।
অভিরাম বিস্মিতমুখে তাকিয়ে রইল। কৃষ্ণপ্রসাদ যেন আকাশ থেকে কথা বলছে। দেশটাকে দুর্ভিক্ষের হাত থেকে নিস্তার দেবার জন্য স্বর্গ থেকে মর্ত্যভূমিতে অবতীর্ণ হয়েছে হাফ প্যান্টপরা সাইকেলধারী একটি দেবতা। অশথতলায় পাথরের শীতলা নিদ্রিত হয়েই আছেন, কিন্তু ইনি যেমন জাগ্রত তেমনি মুখর।
